- সংঘর্ষের ভয়ে কেন্দ্রে যেতে অনীহা
- সর্বোচ্চ নিরাপত্তার দাবি ইসির
- নেই নারীবান্ধব ভোটকেন্দ্র
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী ভোটারের নিরাপত্তা এবং নির্বিঘেœ ভোটাধিকার প্রয়োগের নিশ্চয়তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। নির্বাচন সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নারী ভোটারদের লক্ষ্য করে হুমকি ও ভয়ভীতি ছড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের জেলা থেকেই এ ধরনের হুমকি, সহিংসতার আশঙ্কা ও ভয়ভীতি ছড়ানোর খবর বেশি আসছে। তাই ভোটকেন্দ্রে নারীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কাছে দাবি জানায় সচেতন মহল।
ইতোমধ্যে ভোটের প্রচারণায় নারী কর্মীদের ওপর প্রতিপক্ষের হামলার অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় গত তিন সপ্তাহে নারীদের ওপর হামলার ৭০টিরও বেশি ঘটনার সংবাদ পাওয়া গেছে, যার একটি বড় অংশ ইলেকশন কমিশনে অভিযোগ আকারে জমা পড়েছে। নির্বাচন কমিশন আপাতত আশ্বাস দিলেও নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে কি ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তা ভোটের দিন পরিলক্ষিত হবে।
গত ৯ জানুয়ারি ভোলার লালমোহন উপজেলার রায়চাঁদ বাজার এলাকায় নির্বাচন প্রচারণার অংশ হিসেবে নারী কর্মীরা বাড়ি বাড়ি ভোটার সংযোগ কার্যক্রম চালানোর সময় মৌখিক হয়রানি ও বাধার মুখে পড়েন। পরে স্থানীয় বাজার এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে সংঘর্ষ শুরু হয়। ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও শারীরিক হামলায় অন্তত ১৫ জন আহত হন। এ ছাড়াও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশজুরে অনেক ঘটনায় ঘটেছে।
ঢাকা-১০ আসনের ভোটার ফরিদা আক্তার বলেন, ভোটকেন্দ্রের ভেতরে সমস্যা না হলেও বাইরে পরিস্থিতি খারাপ হলে নারীরা ঢুকতেই ভয় পায়। নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে ভোট দিতে যাব। এই কারণে পরিবার থেকেও অনেক সময় আমাদের ভোট দেয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হয় না। তবে সিসি ক্যামেরা আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি থাকলে অন্তত নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে।
পারভিন আহমেদ নামের এক নারী ভোটার বলেন, ভোটের দিন কেন্দ্রের বাইরে বিশৃঙ্খলা, ভিড় বা সংঘর্ষের আশঙ্কায় ভোটকেন্দ্রে যেতে দ্বিধা কাজ করছে। কেন্দ্রে ঝামেলা হলে নারীদের নিরাপদে থাকা কঠিন। তবে কেন্দ্রে যদি সত্যিই সিসি ক্যামেরা থাকে এবং সেনাবাহিনী র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয় থাকে, তাহলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। নিরাপদ পরিবেশ হলে নারী ভোটারদের উপস্থিতিও বাড়বে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিতে মোট প্রায় ৯ লাখ ৩৯ হাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। এর মধ্যে নারী সদস্যদের অংশগ্রহণও রয়েছে উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে আনসার বাহিনীর নারী সদস্যের সংখ্যা থাকবে বেশি। ভোটের দিন প্রতিটি সাধারণ ভোটকেন্দ্রে ১০ জন আনসার সদস্যের মধ্যে চারজন নারী আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।
সে হিসাবে সারাদেশে ৪২ হাজার ৭৬৬টি ভোটকেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, শুধু লাঠিধারী আনসার হিসেবেই প্রায় এক লাখ ৭১ হাজার এর বেশি নারী সদস্য মোতায়েন থাকবেন। আর পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর মধ্যে মোট এক লাখ ৫০ হাজার পুলিশ সদস্যের একটি বড় অংশ নারী পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য হিসেবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এবং মোবাইল টিমে দায়িত্ব পালন করবেন।
অপর দিকে এক লাখের বেশি সংখ্যক সেনাসদস্য ও ৩৭ হাজার বিজিবি সদস্য স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করবে। তাদের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী সদস্য মাঠ পর্যায়ে ও কন্ট্রোল রুমে দায়িত্ব পালন করবেন। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে পাঁচজন সশস্ত্র সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে। তার মধ্যে দুইজন পুলিশ ও তিনজন আনসার। এর আগে একজন স্বশস্ত্র পুলিশ দায়িত্ব পালন করত। তবে এবার এ সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। তবু নারীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা থেকেই যায়।
অভিযোগ রয়েছে যে, দেশের বিভিন্ন জায়গায় নারী ভোটারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। কোথায় ভোট দিতে হবে, কাকে ভোট দিতে হবে। এমন নানা ধরনের হস্তক্ষেপ দেখা যাচ্ছে। নারীরা যেন নির্বিঘেœ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, কথা বলতে পারে এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা পায় সেই পরিবেশ সৃষ্টির দায়িত্ব সরকারের। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অবশ্যই সকল শ্রেণী-পেশা ও সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চায় কেউ বঞ্চিত না হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আসন্ন সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ নির্বাচন ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের আশ্বাস দেয়া হলেও এখনো ভোটকেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে শঙ্কা কাটেনি অনেক নারী ভোটারের। এ কারণে নারী ভোটারদের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি একাধিক আসনের ফল নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য মতে, দেশে বর্তমানে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন, যা মোট ভোটারের প্রায় ৪৯.২৬ শতাংশ। অর্থাৎ জনসংখ্যার অর্ধেক এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে কোনো দলের পক্ষেই এককভাবে সরকার গঠন করা গাণিতিকভাবেই অসম্ভব। ফলে এই বিশাল ভোটারের রায় পালটে দিতে পারে ভোটের ফল। এ কারণেই তরুণ ও নারী ভোটারদের প্রতি বিশেষ নজর রাজনৈতিক দলগুলোর। এই ভোটারদের ‘কিংমেকার’ হিসাবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
এ দিকে আসন্ন সংসদ নির্বাচনে নারী ভোটারদের নিরাপত্তার সাথে ভোট নিশ্চিতে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে নারীদের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দেয়া হয়েছে বিশেষ নির্দেশনা। নারীদের জন্য থাকবে আলাদা লাইন এবং বয়স্ক, প্রসূতি ও প্রতিবন্ধীরা পাবেন আগে ভোট দেয়ার সুযোগ।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার গণমাধ্যমকে বলেন, কোনো নারী ভোটারকে পুরুষ কর্মকর্তার সামনে নেকাব বা বোরকা খুলতে বাধ্য করা যাবে না। কোনো পর্দানশিন নারী ভোটার যদি পুরুষ কর্মকর্তার সামনে মুখ দেখাতে অনিচ্ছুক হন, তাহলে নারী পোলিং অফিসারের মাধ্যমে তার পরিচয় যাচাই করা হবে। এতে তাদের পর্দা ভঙ্গ হবে না। তবে কোনো কেন্দ্রে নারী কর্মকর্তা না থাকলে এবং কোনো নারী ভোটার মুখ দেখাতে না চাইলে তাকে ভোট দিতে বাধ্য করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে ভোট না দেয়ার জন্য তার বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থাও নেয়া হবে না।
অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, নির্বাচন কমিশনে নারী, আদিবাসী, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোটারদের নিরাপত্তা ও ভোটাধিকার প্রয়োগ নির্বিঘœ করতে ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেল’ আরো সক্রিয় করা জরুরি। মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নির্বাচনী বিধি মেনে চলার তদারকির দায়িত্বে যারা রয়েছেন, তাদের ১২ ঘণ্টা পরপর পরিস্থিতি এবং নারী ভোটারসহ সব প্রান্তিক অবস্থানে থাকা ভোটারের নিরাপত্তাজনিত শঙ্কা মনিটরের নির্দেশ দিতে হবে। শুধু ভোটের দিনই নয়, নির্বাচনের পরও যাতে নারীরা সহিংসতার শিকার না হন, কারো বাড়িঘর সম্পদ আক্রান্ত না হয়, তার পূর্ণ নিশ্চয়তা দেয়া দরকার।
এই বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যেসব জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারী, জাতিগত ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধীসহ যারা এই পাঁচটি মানদণ্ডের কোনোটাতেই ক্ষমতাবান নয় বা ক্ষমতায়িত নয় তারা প্রচণ্ড ঝুঁকির মধ্যে আছে। বিশেষ করে সরকার, নির্বাচন কমিশন, সরকারের অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলো, প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সেনাবাহিনীর যারা দায়িত্ব পেয়েছেন, তাদের সবার প্রতি আহ্বান, বিশেষ করে সাধারণ ভোটারদের পাশাপাশি এই নারী ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন।



