অবৈধ সিগারেটের রমরমা ব্যবসা দেশজুড়ে

বিভিন্ন স্থানে চলছে অবৈধ সিগারেটের রমরমা ব্যবসা। শুধু শহর নয়, প্রত্যন্ত অঞ্চলেও হাত বাড়ালেই মিলছে কর ফাঁকি দিয়ে আমদানি করা বিদেশী সিগারেট। পাশাপাশি বাজারে ঢুকছে দেশের ভেতর অবৈধভাবে উৎপাদিত সিগারেটও। ঢাকাসহ কয়েকটি জেলায় অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব সিগারেটের বিস্তার গত এক বছরে কমেনি; বরং বিক্রির পরিমাণ আরো বেড়েছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition
  • শহর থেকে গ্রাম-হাত বাড়ালেই মিলছে অবৈধ সিগারেট
  • গত এক বছরে বিক্রির পরিমাণ কমেনি বরং বেড়েছে
  • বছরে ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার : গবেষণা
  • কাস্টমস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান জোরদার
  • ২০২৫ সালে ২৬১ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা শনাক্ত

দেশের বিভিন্ন স্থানে চলছে অবৈধ সিগারেটের রমরমা ব্যবসা। শুধু শহর নয়, প্রত্যন্ত অঞ্চলেও হাত বাড়ালেই মিলছে কর ফাঁকি দিয়ে আমদানি করা বিদেশী সিগারেট। পাশাপাশি বাজারে ঢুকছে দেশের ভেতর অবৈধভাবে উৎপাদিত সিগারেটও। ঢাকাসহ কয়েকটি জেলায় অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব সিগারেটের বিস্তার গত এক বছরে কমেনি; বরং বিক্রির পরিমাণ আরো বেড়েছে।

রাজধানীর ফুটপাথ থেকে মুদি দোকান

গুলশান, বনানী, নিউমার্কেট, ফার্মগেট, উত্তরা, গুলিস্তান, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, মালিবাগসহ রাজধানীর প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রকাশ্যেই বিদেশী সিগারেট বিক্রি হচ্ছে। মুদি দোকান থেকে শুরু করে ফুটপাথের ফেরিওয়ালার হাতেও মিলছে এসব সিগারেট।

মালিবাগের পাইকারি বিক্রেতা মো: রাকিব বলেন, ২০২৪ সালে প্রতি মাসে তার দুই থেকে আড়াই লাখ টাকার বিদেশী সিগারেট বিক্রি হতো। ২০২৫ সালে তা আরো ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে ‘ওরিস’ ব্র্যান্ডের সিগারেট।

এসব সিগারেট বৈধ চ্যানেলে আসে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অর্ডার দিলে বিক্রয় প্রতিনিধি এসে দিয়ে যান। এগুলো বৈধ নাকি অবৈধ পথে আসে, সে বিষয়ে আমরা কিছু জানি না।’

গুলশান এলাকায় ফেরি করে সিগারেট বিক্রি করেন আরিফুল। তার কাছে বিভিন্ন বিদেশী ব্র্যান্ডের সিগারেট পাওয়া যায়। এসব সিগারেট কী পরিমাণ বিক্রি হয় জানতে চাইলে আরিফুল বলেন, ‘মাসে ১৫-২০ হাজার টাকার বিক্রি করি। সব ধরনের বিদেশী সিগারেটই বিক্রি হয়। কম বয়সী লোকজনই এগুলো বেশি কিনে।’

চট্টগ্রামেও একই চিত্র

চট্টগ্রাম শহরেও অবৈধ বিদেশী সিগারেটের দাপট বাড়ছে। কাজির দেউড়ি এলাকার খুচরা বিক্রেতা আবদুল করিম জানান, ওরিস ও মন্ড ব্র্যান্ডের সিগারেটই বেশি বিক্রি হয়। আতুরার ডিপো এলাকার ব্যবসায়ী আবদুর রহমান বলেন, তিনি মাসে প্রায় ৬০ হাজার টাকার দেশী-বিদেশী সিগারেট বিক্রি করেন এবং ২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় বিক্রি বেড়েছে।

চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারের ‘সিগারেট গলি’ ঘুরে দেখা যায়, বিদেশী ব্র্যান্ডের ওরিস প্রতি কার্টন ২৪০০-২৪২০ টাকা এবং মন্ড ১৬০০-১৬৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সিগারেটের উৎস জানতে চাইলে বিক্রেতারা মুখ খুলতে চাননি। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, কয়েকটি চক্র অবৈধ পথে আনা বিদেশী সিগারেট চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে সরবরাহ করছে।

গ্রামেও অবাধ সরবরাহ

কুমিল্লার প্রত্যন্ত অঞ্চলেও অবৈধ বিদেশী সিগারেট সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। গ্রামের মুদি দোকানগুলোতে দেদার এই সিগারেট বিক্রি হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে পাইকারি বিক্রেতা আবদুল মালেক বলেন, ‘এটার পেছনে একটা সিন্ডিকেট আছে। তারা আমাদেরকে বিক্রি করা ছাড়া কোনো কথা বলতে নিষেধ করেছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদেশী সিগারেটের একজন ডিলার বলেন, ‘কুমিল্লার গোমতি নদী দিয়ে ভারত থেকে বিদেশী সিগারেট আনা হয়। কলার ভেলার নিচে বিশেষ পদ্ধতিতে সিগারেট বেঁধে সীমান্ত এলাকা দিয়ে এই সিগারেট কুমিল্লায় ঢুকে। আমরা চকবাজারসহ বেশ কিছু মার্কেটে এই সিগারেট দিয়ে থাকি।’

বন্ধ কারখানা, গোপন উৎপাদন!

বিভিন্ন অভিযানে বেশ কিছু অবৈধ সিগারেট কারখানা বন্ধ করা হলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, দু-একটি কারখানা এখনো গোপনে অন্য ব্র্যান্ডের সিগারেট উৎপাদন করছে।

২০২১ সালে গাজীপুরের কৌলটিয়ায় ভার্গো টোব্যাকো কারখানায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সিগারেট ও ব্যান্ডরোল জব্দ করেন ভ্যাট গোয়েন্দারা। এরপর কারখানাটির উৎপাদন বন্ধ হয়। কিন্তু স্থানীয়দের ভাষ্য, মাঝেমধ্যে সেখানে অন্য কোম্পানির জন্য সিগারেট তৈরি হয়। কারখানায় সিগারেট তৈরির কাঁচামালও মজুদ রাখা হয়েছে, যাতে কোনো কোম্পানি অর্ডার করলে তাদের ব্র্যান্ডের সিগারেট তৈরি করা যায়।

কিশোরগঞ্জের ভৈরবে তারা ইন্টারন্যাশনাল টোব্যাকো ও কুলিয়ারচরে হেরিটেজ টোব্যাকোর কারখানা অবস্থিত। তাদের সিগারেট ব্র্যান্ডের মধ্যে রয়েছে- সান গোল্ড, স্মার্ট ব্ল্যাক, পিকক ফিল্টার, সানমার, হিরো, ক্লাসিক ইত্যাদি। ২০২৪ সালে সেপ্টেম্বরে কারখানা দু’টিতে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৩২ কোটি টাকার নকল সিগারেট ও স্ট্যাম্প জব্দ করে যৌথ বাহিনী। তখন কারখানা দু’টি বন্ধ করে দেয়া হয়।

তবে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, কারাখানা দু’টির ভেতরে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। তারা জানতে পেরেছেন, গোপনে কারখানা আবার চালু হয়েছে। এই কারখানাগুলোর সিগারেট স্থানীয় বাজারে বিক্রি হয় না। রাতের আঁধারে কারখানা থেকে গাড়ি বের হয়। গাড়িগুলো কোথায় যায় কেউ জানে না।

এ দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পর কক্সবাজারের চকরিয়ার বিজয় ইন্টারন্যাশনাল টোব্যাকো কারখানা, চট্টগ্রামের ইন্টারন্যাশনাল টোব্যাকো কারখানা বন্ধ আছে। এ ছাড়া কুমিল্লার নাঙ্গলকোট, লাকসামের দিকে কয়েকটি অবৈধ সিগারেটের কারখানাও অভিযানের পর বন্ধ আছে বলে জানা গেছে।

বড় ক্ষতির মুখে রাজস্ব

বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনসাইড মেট্রিক্সের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের বাজারের প্রায় ১৩.১ শতাংশ সিগারেট অবৈধ, যা আগের বছরের তুলনায় ৩১ শতাংশ বেড়েছে। প্রতি মাসে প্রায় ৮৩ কোটি ২০ লাখ শলাকা অবৈধ সিগারেট দেশের বাজারে প্রবেশ করছে। এর ফলে বছরে প্রায় চার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।

এ দিকে সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো: আবদুর রহমান খান এক সেমিনারে জানান, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তামাকের কর বাড়িয়ে ৮৩ শতাংশ পর্যন্ত করা হয়। এতে বাড়তি ১০ হাজার টাকা রাজস্ব আদায়ের আশা করা হয়েছিল। কিন্তু সিগারেটের চোরাচালান এবং অবৈধ স্থানীয় উৎপাদনের কারণে এ খাতে রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুসারে বাড়েনি বরং কমেছে।

নজরদারি ও অভিযান

অবৈধ সিগারেটের আমদানি ও সরবরাহ বন্ধে সাম্প্রতিক সময়ে নজরদারি বাড়িয়েছে কাস্টমস, ভ্যাট কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে সারা দেশে ৬৮টি অভিযানে চার কোটি ৫১ লাখ ৪৩ হাজার ৫২০ শলাকা অবৈধ সিগারেট ও ৩৯ লাখ ৭৫ হাজার ৫০০ ব্যান্ডরোল জব্দ করা হয়েছে। এসব সিগারেট বাজারে এলে প্রায় ২৬১ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি হতো। এর আগে ২০২৪ সালে মোট ৩০টি অভিযান চালানো হয়। এসব অভিযানে এক কোটি ১৭ লাখ ১৫ হাজার ৩৩০ শলাকা অবৈধ সিগারেট ও তিন কোটি ৪৯ লাখ ৯ হাজার ৮০০ ব্যান্ডরোল জব্দ করা হয়। এসব সিগারেট বাজারে এলে ৪৩ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি হতো।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টমসের ডেপুটি কমিশনার তারেক মাহমুদ বলেন, সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দরে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সিগারেট জব্দ করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের কেউ এর সাথে জড়িত কি না সেটি খতিয়ে দেখতে অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা টিম কাজ করছে বলেও জানান তিনি।

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের (সিএমপি) মুখপাত্র আমিনুর রশিদ বলেন, ‘সিগারেটসহ সব ধরনের চোরাই বা অবৈধ পণ্যের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। এ বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। খবর পেলেই আমরা অভিযান চালাই এবং সবসময় সতর্ক আছি।’

বাস্তবসম্মত নীতি প্রণয়নের পরামর্শ

বিশ্লেষকদের মতে, একক খাত হিসেবে তামাক থেকেই সর্বোচ্চ রাজস্ব পেয়ে থাকে সরকার। কিন্তু বাস্তবতা বিবেচনা না করেই তামাকের ওপর কর বাড়ানোসহ এ সম্পর্কিত নিয়ম-কানুন কঠোর করায় অবৈধ বাজার আরো বিস্তৃত হচ্ছে। এতে সঙ্কটের মুখে পড়ছে সিগারেটের বৈধ উৎপাদন ও বাজার। যার প্রভাব পড়ছে সরকারের রাজস্ব আদায়ে।

এনবিআরের সাবেক সদস্য ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘তামাক রাজস্বের ওপর বাংলাদেশ অন্য অনেক দেশের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরশীল। কিন্তু এখানে আইন প্রয়োগের সক্ষমতা কম। যদি নিয়ম-কানুন বাস্তব সক্ষমতার চেয়ে দ্রুত ও কঠোরভাবে চালু করা হয় এবং তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা না যায়, তাহলে সরকার একই সাথে রাজস্ব, আস্থা ও বাজারের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। তাই নিয়ম-কানুন হতে হবে বাস্তবসম্মত এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, সব নিবন্ধিত তামাক কোম্পানিকে বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) অধীনে নিয়ে আসা উচিত। এতে এলটিইউ তাদের করের তথ্যগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে ও সরাসরি দেখভাল করতে পারবে। ফলে অবৈধ সিগারেট ও কর ফাঁকি কমবে। এ ছাড়া ট্যাক্স স্ট্যাম্প ব্যবস্থা পুনর্গঠন জরুরি। স্ট্যাম্প ইস্যু, ব্যবহার ও কর আদায়ের তথ্য মিলিয়ে সিগারেটের অবৈধ বাজার নিয়ন্ত্রণ ও কর ফাঁকি রোধ করা সম্ভব।