আলম শামস
কুষ্টিয়া জেলার গড়াই নদীর তীরে অবস্থিত হাটশ হরিপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৮ জানুয়ারি ১৯১৭ জন্মগ্রহণ করেন কবি ও গীতিকার আজিজুর রহমান। দুই হাজারেরও অধিক গানের রচয়িতা গীতিকার আজিজুর রহমান ১৯৬৪ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত দৈনিক পয়গামের সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন এবং তিনি ঢাকা বেতারের নিজস্ব শিল্পী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১৯৭৯ সালে মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় সম্মান একুশে পদক লাভ করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে ডাইনোসরের রাজ্যে (১৯৬২), জীবজন্তুর কথা (১৯৬২), ছুটির দিনে (১৯৬৩), এই দেশ এই মাটি (১৯৭০), উপলক্ষের গান (১৯৭০) পাঠক মহলে ব্যাপক সমাদৃত হয়।
এ দেশের কাব্য এবং সংগীত রচনায় অবিস্মরণীয় নাম আজিজুর রহমান। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এ মানুষটি কবিতা দিয়ে লেখালেখি শুরু করলেও জীবনে অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন গান লিখে। বাঙালি মুসলমান গীতিকারদের মধ্যে গানের সংখ্যায় কবি নজরুলের পরই তার স্থান। সেই সঙ্গীত প্রিয় কবি ও গীতিকার আজিজুর রহমানের স্বপ্নের সব নাড়ি কুষ্টিয়ার হাটশ হরিপুরের মাটিতে পোঁতা। দীর্ঘদিন আগের কিছু স্মৃতি, কিছু চিহ্ন তার বাস্তুভিটায় আজ খুঁজে পাওয়া বড়ই দুষ্কর। তার বাস্তুভিটায় সরকারি উদ্যোগে অডিটোরিয়াম, লাইব্রেরি ও মিউজিয়াম নির্মাণের প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা থাকলেও মাজারের ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন ব্যতীত কোনো প্রকল্প আজও বাস্তবায়ন হয়নি। এলাকাবাসী মনে করেন সরকারের গ্রহণকৃত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে এ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য সহজেই কবির জীবনকর্ম ও সঠিক ইতিহাস জানার পাশাপাশি তাকে নিয়ে গবেষণার অপার সুযোগ সৃষ্টি হবে। সরকারি এ উদ্যোগকে কেন্দ্র করে সেখানে গড়ে উঠতে পারে সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র।
কিশোর আজিজুর রহমান মাত্র ১০-১২ বছর বয়সে পিতাকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন। সহায়সম্পত্তি দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে দিতে হলো তাকে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলেও প্রবল ইচ্ছা ও অনুসন্ধিৎসু মানসিকতার কারণে বিভিন্ন বিষয়ক পুস্তকাদি স্বগৃহে পাঠ করে তিনি একজন স্বশিক্ষিত ব্যক্তিতে পরিণত হন। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সমাজ সেবায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি একাধারে কুষ্টিয়া হাটশ হরিপুর ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান, কুষ্টিয়া (নদীয়া) ফুড কমিটির সেক্রেটারি, বেঞ্চ অ্যান্ড কোর্ট ডিভিশনের চেয়ারম্যান, কুষ্টিয়া জেলা বোর্ড ও ডিস্ট্রিক্ট অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্যের পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন। ছাত্রাবস্থায় মুসলিম ছাত্র আন্দোলনেও ভূমিকা রেখেছেন এবং প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সদস্য মনোনীত হয়েছিলেন। তিনি ৩শ’ র অধিক কবিতা রচনা করেছেন। তার মধ্যে নৈশনগরী, মহানগরী, সান্ধ্যশহর, ফেরিওয়ালা, ফুটপাত, তের শ পঞ্চাশ, সোয়ারীঘাটের সন্ধ্যা, বুড়িগঙ্গার তীরে, পহেলা আষাঢ়, ঢাকাই রজনী, মোয়াজ্জিন, পরানপিয়া উল্লেখযোগ্য। এসব কবিতা এক সময় নবযুগ, নবশক্তি, আনন্দবাজার পত্রিকা, শনিবারের চিঠি, সওগাত, মোহাম্মাদী, আজাদ, বুলবুল পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হতো। ১৯৫৪ সালে তিনি ঢাকা বেতারে প্রথমে অনিয়মিত এবং পরে নিয়মিতভাবে যোগ দেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ বেতারে চাকরিতে বহাল ছিলেন। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও আজিজুর রহমানের কিছু পরিচয় আছে। অধুনালুপ্ত দৈনিক পয়গম পত্রিকায় ১৯৬৪ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত সাহিত্য বিভাগের সম্পাদক ছিলেন তিনি। ঢাকা থেকে প্রকাশিত কিশোর মাসিক ‘আলপনী’রও সম্পাদক ছিলেন তিনি। কবি আজিজুর রহমানই প্রথম তার জন্মস্থান কুষ্টিয়া জেলার ইতিহাস রচনায় উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কুষ্টিয়া ইতিহাসের বহু মূল্যবান তথ্য তিনি অক্লান্তপরিশ্রম করে বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে ঘুরে সংগ্রহ করেছিলেন; কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় তিনি কুষ্টিয়ার ইতিহাস রচনা সম্পন্ন করে যেতে পারেননি। গীতিকার হিসেবে কবি আজিজুর রহমান এ দেশের এক বিরল প্রতিভা ছিলেন। ঢাকার প্রায় প্রখ্যাত সুরকাররা যেমন আজিজুর রহমানের গানে সুর দিয়েছেন তেমনি তার গানও গেয়েছেন খ্যাতনামা প্রায় সব শিল্পীই। চলচ্চিত্রের জন্য তিনি অসংখ্য গান রচনা করেছেন। রাজধানীর বুকে, হারানো দিন, অশ্রন্তুক প্রভৃতি ছায়াছবিতে তিনি গান রচনা করেছেন। প্রধানত গানের ফসলেই তার শিল্পের গোলা ভরেছে। তার বিখ্যাত গানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- কারো মনে তুমি দিও না আঘাত/সে আঘাত লাগে কাবার ঘরে, তোমার নামে তসবিহ খোদা/লুকিয়ে যেন রাখি, পলাশ ঢাকা কোকিল ডাকা/আমার এদেশ ভাইরে, রক্ত রঙিন উজ্জ্বল দিন/বৃক্ষ শিখায় জ্বলছে, তারা ভরা রাতে তোমার কথা যে/মনে পড়ে বেদনায়, মনরে এই ভবের নাট্যশালায়/মানুষ চেনা দায়, আমি রূপনগরের রাজকন্যা/রূপের জাদু এনেছি, এই সুন্দর পৃথিবীতে/আমি এসেছিনু কিছু নিতে, এই রাত বলে ওগো তুমি আমার/ওই চাঁদ বলে ওগো তুমি আমার, দেখ ভেবে তুই মন/আপন চেয়ে পর ভালো তোর/এই রাজধানীর বুকে/কত জীবনের আশা ভেঙে যায়। এ ছাড়া ‘ডাইনোসরের রাজ্যে’ ‘জীবজন্তুর কথা’ ‘আবহাওয়ার পয়লা কেতাব’ তার উল্লেখযোগ্য অনুবাদ গ্রন্থ। তার প্রকাশিত আরো কিছু গ্রন্থ হচ্ছে ‘আজাদীর বীর সেনানী : কুমারখালীর কাজী মিয়াজান’, পাঁচমিশালী গানের সঙ্কলন ‘উপলক্ষের গান’, দেশাত্মবোধক নিজস্ব গানের সঙ্কলন ‘এই মাটি এই মন’, ‘ছুটির দিনে’। ব্যক্তিগত জীবনে সৌজন্য, ভদ্রতা ও আতিথেয়তায় তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী মানুষ। তার সান্নিধ্যে ও সংস্পর্শে যারা এসেছেন তারা এ কথা অকপটে স্বীকার করবেন। বই পুস্তকাদি সংগ্রহ করা তার জীবনের নেশা ছিল। তার গ্রন্থাগারে প্রায় ১০ হাজার বই ও পত্রপত্রিকার সংগ্রহ রয়েছে। ১৯৩১ সালে কবি আজিজুর রহমান বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার ফুল হরিগ্রামের আজহার সিকদারের কন্যা ফজিলাতুন্নেসাকে বিয়ে করেন। তিনি ৩ ছেলে ৪ মেয়ের জনক। কবি আজিজুর রহমান আরো অনেকের মতো আমাদের সমাজের ভাগ্যহীন সাহিত্য শিল্পী। জীবনের শেষ দিনগুলোতে নানা দুশ্চিন্তা, আর্থিক অনটন ও রোগব্যাধিতে জর্জরিত ছিলেন তিনি। অর্থ সঙ্কটের কারণে চিকিৎসা পর্যন্ত করাতে পারেননি। গ্যাংগ্রিন রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। তার জীবনে দুঃখ, কষ্ট ও আর্থিক সঙ্কটে একজন ব্যক্তি সবসময়ই এগিয়ে এসেছিলেন তিনি হলেন কবি ও গীতিকার সাবির আহমেদ চৌধুরী। ঢাকার মুহাম্মদপুরের বাড়ি থেকে যখন তাকে উচ্ছেদ করা হয় তখন সাবির আহমেদ চৌধুরী তার বাসার একটি এয়ারকুলারযুক্ত রুম কবি আজিজুর রহমানের থাকার জন্য ছেড়ে দেন। কবি আজিজুর রহমান তার জীবদ্দশায় যা রচনা করেছেন তার অধিকাংশই অগ্রন্থিত এবং আজও অনেক কিছুই অপ্রকাশিত রয়েছে যা আমাদের জন্য দুঃখজনক। এগুলো এখনো যদি প্রকাশের ব্যবস্থা করা হয় তাহলে তার প্রতি সামান্য শ্রদ্ধা সম্মান প্রদর্শন করা হবে মাত্র। বিশিষ্ট কবি, গীতিকার ও রেডিও ব্যক্তিত্ব আজিজুর রহমান এমন কিছু হৃদয়স্পর্শ করা গান রচনা করেছেন যার কারণে তিনি সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে অমর হয়ে থাকবেন। পূর্ববাংলায় যে ক’জন গীতিকার বাংলা গান রচনা করে সফল হয়েছেন তাদের মধ্যে কবি আজিজুর রহমান অন্যতম। তবে এ দেশের মানুষ হিসেবে আমরা তাকে যথাযথ মূল্যায়ন করিনি। তিনি গ্যাংগ্রিন রোগে আক্রান্ত হয়ে পিজি হাসপাতালে ১৯৭৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কবির ইচ্ছানুযায়ী তার গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার হাটশ হরিপুরে তাকে দাফন করা হয়।



