রাজশাহীর রেশমে ফিরছে গৌরব চীনের বাজারে বাড়ছে সম্ভাবনা

দুই দেশের যৌথ সম্মেলন

Printed Edition
রাজশাহীর রেশম কারখানা পরিদর্শনে বাংলাদেশী ও চীনা কর্মকর্তারা : নয়া দিগন্ত
রাজশাহীর রেশম কারখানা পরিদর্শনে বাংলাদেশী ও চীনা কর্মকর্তারা : নয়া দিগন্ত

রাজশাহী ব্যুরো

ঐতিহ্য, সৌন্দর্য ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে একসময় দেশ-বিদেশে ব্যাপক পরিচিতি ছিল রাজশাহীর রেশমের। সময়ের সাথে নানা সঙ্কট, উৎপাদন হ্রাস ও বাজারের সীমাবদ্ধতায় সেই শিল্পে ভাটা পড়ে। তবে গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন উদ্যোগে আবারো ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী রেশম শিল্পে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রেশমের বাজার চীনে বাংলাদেশী রেশমের প্রবেশাধিকার তৈরি হলে এ শিল্পের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।

এই সম্ভাবনাকে সামনে রেখে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতার আওতায় রাজশাহীতে রেশম চাষ, গবেষণা ও উন্নয়ন বিষয়ক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সম্মেলন কক্ষে চীন-বাংলাদেশ রেশম গবেষণা কেন্দ্রের উদ্যোগে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন- বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো: শরিফুল আলম এমপি। সম্মেলনের আগে তিনি বাংলাদেশ রেশম কারখানা ও রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট পরিদর্শন করেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী রেশম শিল্পকে আধুনিকায়ন করে এর হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে সরকার মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি রেশম চাষের পদ্ধতি উন্নয়ন, তুঁত চাষ সম্প্রসারণ এবং রেশম সুতার গুণগত মান বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘রাজশাহীর রেশম কেবল একটি শিল্প নয়, এটি দেশের ঐতিহ্য ও গর্বের অংশ। সরকার আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে।’

চীনের বাজারকে বাংলাদেশের রেশম শিল্পের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের অন্যতম বড় রেশম উৎপাদক ও ভোক্তা দেশ চীনে বাংলাদেশী রেশমের আলাদা বাজার তৈরি করা গেলে এর সুফল সরাসরি রাজশাহীর রেশম চাষি, তাঁতি ও উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এজন্য মানসম্মত রেশম সুতা ও কাপড় উৎপাদনের পাশাপাশি আধুনিক নকশা, প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং ও বিপণন কৌশলের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চীনের বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হলে শুধু রেশম কাপড়ের রফতানি বাড়বে না, এ শিল্পকে ঘিরে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনও বাড়তে পারে। একই সাথে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে রেশম চাষি, তাঁতি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আয় বৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

রাজশাহীর রেশম শিল্পের সাথে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী জানান, ১৯৭৭ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ‘রাজশাহী সিল্ক বোর্ড’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এ শিল্পের বিকাশে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে রেশম শিল্পকে আরো আধুনিক, টেকসই ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার উপযোগী করার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, চীনের সাথে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণা বিনিময় বাড়ানো গেলে রাজশাহীর রেশম শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে আরো প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে। শুধু ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর না করে আধুনিক ফ্যাশন, নকশা ও বাজারের চাহিদার সাথে সমন্বয় ঘটাতে পারলে ‘রাজশাহী সিল্ক’কে একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডে পরিণত করার সুযোগ রয়েছে।

সম্মেলনে বিশেষ অতিথি ছিলেন- রাজশাহী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদ, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, ঝেজিয়াং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ফ্যাশন ডিজাইন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক ও ভাইস ডিন অধ্যাপক জু কিউজি এবং চীন-বাংলাদেশ রেশম গবেষণা কেন্দ্রের প্রকল্প উদ্যোক্তা ও প্রধান সমন্বয়কারী অধ্যাপক নুসরাত জাহান নিপা। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক মো: তৌফিক আল মাহমুদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মো: শাখাওয়াত হোসেন।