মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের চলমান অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে দেশটিতে ‘বিজয়’ অর্জনের ঘোষণা দিলেও, বিশ্লেষকদের মতে তেহরানের বিরুদ্ধে কোনো সহজ জয় পাওয়ার পথ ওয়াশিংটনের সামনে খোলা নেই। গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে ইরান। একদিকে অভ্যন্তরীণ নজিরবিহীন বিক্ষোভ, অন্য দিকে ধসে পড়া অর্থনীতি ও আঞ্চলিক মিত্রদের পতনের মুখে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে লিপ্ত ইসলামী প্রজাতন্ত্রটি।
ট্রাম্পের হুমকি ও দোদুল্যমান অবস্থান চলতি বছরের ২ জানুয়ারি ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘোষণা করেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতা চালায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘উদ্ধারে’ আসবে। তিনি মার্কিন বাহিনীকে ‘লকড অ্যান্ড লোড’ বা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত বলে দাবি করেন। তবে গত দুই সপ্তাহে কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হওয়া এবং দেশজুড়ে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের পর ট্রাম্পের কণ্ঠে কিছুটা সুর নরম হতে দেখা গেছে। গত বৃহস্পতিবার ইরান ৮০০ জনের মৃত্যুদণ্ড বাতিল করায় ট্রাম্প তাদের প্রতি ‘শ্রদ্ধা’ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, যা বড় ধরনের সামরিক হামলা থেকে আপাতত পিছু হটার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানের কৌশল ও পাল্টা আঘাতের ঝুঁকি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, ভেনিজুয়েলার মতো ইরানের শাসন ব্যবস্থা এক ধাক্কায় ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়। স্টিমসন সেন্টারের গবেষক বারবারা সøাভিন বলেন, ‘যেকোনো সামরিক বিকল্পই ভয়াবহ হতে পারে।’ ইরান যদি মনে করে তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, তবে তারা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্রদের ওপর আত্মঘাতী পাল্টা আঘাত হানতে পারে। ২০২০ সালে জেনারেল কাসেম সোলেইমানি হত্যার পর ইরানের প্রতিক্রিয়া ছিল মূলত প্রতীকী, কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকার বা শীর্ষ নেতাদের ওপর হামলা হলে ইরান পুরো অঞ্চলকে যুদ্ধের আগুনে জ্বালিয়ে দেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
একঘরে তেহরান : ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ যখন বিপন্ন বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান বর্তমানে তার ৪৭ বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। কয়েক দশক ধরে গড়ে তোলা তাদের আঞ্চলিক বলয় বা ‘অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স’ আজ প্রায় ধ্বংসের মুখে। গাজা ও লেবাননে ইসরাইলি অভিযানের ফলে হামাস ও হিজবুল্লাহ চরমভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন তেহরানের জন্য বড় এক কৌশলগত পরাজয়। এ ছাড়া গত জুন মাসে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং পরমাণু স্থাপনাগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
অর্থনৈতিক ধস ও অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ইরানের মুদ্রাস্ফীতি বর্তমানে ৭০ শতাংশ ছাড়িয়েছে এবং মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মান সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই অর্থনৈতিক হাহাকার থেকেই গত ডিসেম্বরের শেষে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে বিক্ষোভের সূচনা হয়, যা দ্রুতই সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, গত কয়েক সপ্তাহে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রায় দুই হাজার ৬০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
কূটনীতি নাকি আত্মসমর্পণ? ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ সম্প্রতি কূটনীতির আশা প্রকাশ করে চারটি শর্ত দিয়েছেন : ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কমিয়ে আনা এবং আঞ্চলিক ছায়াশক্তিদের সমর্থন বন্ধ করা। তবে ট্রাম্পের এই প্রস্তাবকে বিশ্লেষকরা ‘কূটনীতি’ নয় বরং ‘আত্মসমর্পণ’ হিসেবে দেখছেন। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অনুসারীরাও মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়ানোর ঘোর বিরোধী।
মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্য এখন পরবর্তী কয়েক মাসের ঘটনাবলির ওপর নির্ভর করছে। ট্রাম্প কি কোনো চুক্তির মাধ্যমে একে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ হিসেবে দাবি করবেন, নাকি তেহরানের ওপর সামরিক শক্তির প্রয়োগ করে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগোবেন- তা নিয়েই এখন পুরো বিশ্বের নজর।
ইরান তেহরানগামী পথে বিপুল অস্ত্র জব্দ
প্রেসটিভি জানায়, ইরানে সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন অঞ্চলে। ইরান সরকার অভিযোগ করেছে, এই আন্দোলনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইন্ধন রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এবং হামলার হুমকিও দিয়েছেন। অন্য দিকে ইসরাইল তাদের গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্টদের মাধ্যমে বিক্ষোভে উসকানি দেয়ার কথা স্বীকার করেছে। ফলে আন্দোলন ভয়াবহ রূপ নেয়।
এ অবস্থায় তেহরানে পৌঁছার আগেই বিপুল অস্ত্র জব্দ করেছে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী। তারা জানিয়েছে, প্রায় ৬০ হাজার অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে এবং একই সাথে মোসাদ-প্রশিক্ষিত একটি সন্ত্রাসী চক্র ভেঙে দেয়া হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইরান-ইসরাইল সম্পর্ক আরো উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে এই চক্র প্রাণঘাতী হামলা চালাচ্ছিল বলে দাবি করেছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হওয়া আন্দোলন ধীরে ধীরে বিদেশী মদদপুষ্ট সহিংসতায় রূপ নেয় বলেও তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ইরানের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কমান্ড (ফারাজা) এক বিবৃতিতে জানায়, বুশেহর প্রদেশে দাঙ্গাকারীদের কাছ থেকে ৬০ হাজার অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। ফারাজা জানায়, এসব অস্ত্র তেহরানে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। অভিযানের সময় দু’জন সন্ত্রাসীকেও গ্রেফতার করা হয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
এ দিকে দেশটির গোয়েন্দা বাহিনী একটি ‘বিপজ্জনক ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ শনাক্ত করে এর সদস্যদের গ্রেফতার করেছে বলে নিশ্চিত করেছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, এই গোষ্ঠীর মূল লক্ষ্য ছিল মানুষ হত্যা করা এবং বিক্ষোভকে রক্তক্ষয়ী সহিংসতায় রূপ দেয়া। স্থানীয় বার্তা সংস্থা তাসনিমের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সন্ত্রাসী চক্রটি ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের মাধ্যমে উন্নত নগর যুদ্ধকৌশলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিল। সাম্প্রতিক অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে তারা বহু সন্ত্রাসী অপরাধে জড়িত ছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্ধারিত মূল হোতাদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ও নগর যুদ্ধের সরঞ্জাম পাওয়ার পর চক্রটির সদস্যরা রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে চলাচল করে এবং নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে শত শত মানুষ নিহত ও আহত হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
সন্ত্রাসী চক্রটির তৎপরতার সাথে সম্পর্কিত যেসব ছবি পাওয়া গেছে, তাতে দেখা যায় একে-৪৭ রাইফেল, শটগানসহ নানা ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র ও স্যাটেলাইট ফোনের মতো যোগাযোগ সরঞ্জাম বিতরণ করা হচ্ছিল। এসব সরঞ্জাম ব্যবহার করে প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসীরা ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে বলে দাবি ইরানি কর্তৃপক্ষের। এ ছাড়া চক্রটির সদস্যরা সামরিক ও পুলিশ সদর দফতরে হামলা চালায়, অস্ত্র লুট করে এবং নগরযুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করতে সেগুলো বিতরণ করে, যাতে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়ে। অভিযান চলাকালে বিপুল পরিমাণ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র, গোলাবারুদ ও স্যাটেলাইট যোগাযোগ সরঞ্জাম উদ্ধার ও জব্দ করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে জানানো হয়।
ইরানের কর্মকর্তারা এসব দাঙ্গা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি সরকারের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ সরাসরি মাঠপর্যায়ে জড়িত ছিল, যা সংস্থাটি শিকারও করেছে। এ প্রসঙ্গে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর একটি টুইটের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। তিনি সেখানে লিখেছিলেন, ‘রাস্তায় থাকা প্রতিটি ইরানিকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা। আর তাদের পাশে হাঁটা প্রতিটি মোসাদ এজেন্টকেও।’ এ ছাড়া ফারসি ভাষায় দেয়া একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে মোসাদ দাঙ্গাকারীদের রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়ে বলেছিল, ‘এখনই সময়। একসাথে রাস্তায় বেরিয়ে আসুন।’ পোস্টে আরো বলা হয়, মোসাদ এজেন্টরা দাঙ্গাকারীদের সাথে শুধু দূর থেকে বা কথার মাধ্যমে নয়, মাঠপর্যায়েও রয়েছে।’



