নয়া দিগন্ত ডেস্ক
জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার দাবি : যুদ্ধ ও সামরিক আগ্রাসনের নিন্দা : বৈশ্বিক শাসনে গ্লোবাল সাউথের অধিকতর প্রতিনিধিত্ব চায় জোট
ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে সদস্য দেশগুলোর সর্বসম্মতিতে ‘নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র’ গৃহীত হয়েছে। ঘোষণাপত্রে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দাবি জানানো হয়েছে। বিশেষ করে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদসহ বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার আহ্বান জানিয়েছে এই জোট।
একই সাথে বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ ও সামরিক আগ্রাসনের কঠোর সমালোচনা করে আন্তর্জাতিক জলসীমায় নাবিকদের নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নির্বিঘœ রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ডলারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ব্রিকস সদস্যদের মধ্যে নিজস্ব জাতীয় মুদ্রায় দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণের ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
গতকাল শনিবার নয়াদিল্লিতে শীর্ষ সম্মেলনের সমাপনী পর্বে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যৌথ ঘোষণাপত্রটি উন্মোচন করেন। সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংসহ ব্রিকসের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন।
বিশ্বব্যবস্থায় পরিবর্তনের বার্তা
সমাপনী বক্তব্যে নরেন্দ্র মোদি বলেন, পরিবর্তনশীল বিশ্বকে পুরনো কাঠামোর প্রতিষ্ঠান দিয়ে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। বিশ্ব প্রতিনিধিত্ব, দায়িত্বশীলতা এবং নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এখন অপরিহার্য।
তার বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পায় গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধিত্ব। মোদি বলেন, ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি পরিচালনার নীতিমালা তৈরিতে উন্নয়নশীল বিশ্বের সমান অংশীদারত্ব থাকা প্রয়োজন। এর মধ্য দিয়ে ব্রিকসের আলোচনায় শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতা নয়, বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবিও সামনে এসেছে।
ডলার থেকে বের হওয়ার প্রচেষ্টা
নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের আধিপত্য কমানোর উদ্যোগ। ঘোষণায় ব্রিকস সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানোর ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এর তাৎপর্য কেবল মুদ্রা ব্যবহারের পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতিগুলো দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক ব্যবস্থায় ডলারের অতিরিক্ত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বাড়লে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ডলারের প্রয়োজনীয়তা কিছুটা কমতে পারে।
তবে এর বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সদস্য দেশগুলোর মুদ্রার বিনিময় হার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আর্থিক বাজারের গভীরতা এবং পারস্পরিক লেনদেনের ভারসাম্য- সবই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ঘোষণাপত্রের রাজনৈতিক ঐকমত্যকে কার্যকর বিকল্প আর্থিক কাঠামোয় রূপ দিতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন হবে।
যুদ্ধের নিন্দা, নিরাপদ নৌচলাচলে গুরুত্ব
মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সঙ্ঘাতের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিও ঘোষণাপত্রে গুরুত্ব পেয়েছে।
বিশ্ববাণিজ্যের বড় একটি অংশ সমুদ্রপথনির্ভর। কোনো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে যুদ্ধ বা সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলো নয়, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি, খাদ্য, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়ে। তাই আন্তর্জাতিক জলসীমার নিরাপত্তার প্রশ্নটি ব্রিকসের অর্থনৈতিক স্বার্থের সাথেও সরাসরি যুক্ত।
জাতিসঙ্ঘ সংস্কারের দাবি
নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদসহ আন্তর্জাতিক বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত সংস্কারের দাবি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
ব্রিকসের সদস্য ও অংশীদার রাষ্ট্রগুলোর অনেকেরই অভিযোগ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা প্রতিফলিত করে না। বিশেষ করে আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। এ অবস্থায় জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে সংস্কারের দাবি ব্রিকসের বৃহত্তর রাজনৈতিক অবস্থানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর লক্ষ্য হচ্ছে বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির প্রভাব বাড়ানো।
প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও বার্তা
প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ নিয়েও ব্রিকসের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মোদির বক্তব্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রযুক্তি নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণের বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে। এটি ভবিষ্যৎ বিশ্ব-অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, ডেটা, ডিজিটাল অর্থনীতি ও নতুন প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ যদি কেবল কয়েকটি উন্নত দেশের হাতে থাকে, তাহলে উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রযুক্তিগত নির্ভরতা আরো বাড়তে পারে। ব্রিকস সেই কাঠামোর পরিবর্তনের দাবিও সামনে আনছে।
ঘোষণার পর বাস্তবায়নই বড় পরীক্ষা
নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রকে ব্রিকসের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে দেখা হলেও এর প্রকৃত গুরুত্ব নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর।
জাতীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়াতে হলে কার্যকর পেমেন্ট ব্যবস্থা প্রয়োজন। জাতিসঙ্ঘ সংস্কারের দাবি বাস্তবায়নে বৃহৎ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমর্থন প্রয়োজন। আর যুদ্ধ ও সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবস্থানকে কার্যকর করতে হলে সদস্য দেশগুলোর নিজেদের মধ্যকার কৌশলগত মতপার্থক্যও সমন্বয় করতে হবে।
নরেন্দ্র মোদি তাই ঘোষণাপত্রকে কেবল রাজনৈতিক বিবৃতি হিসেবে না রেখে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। তার বক্তব্যের সারকথা- ঐকমত্য তৈরি হয়েছে; এখন সেই ঐকমত্যকে বাস্তব কর্মসূচিতে রূপান্তর করাই মূল চ্যালেঞ্জ।
ফলে নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রকে শুধু একটি শীর্ষ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব কম করে দেখা হবে। ডলারনির্ভরতার বিকল্প অনুসন্ধান, জাতিসঙ্ঘের সংস্কার, গ্লোবাল সাউথের অধিকতর প্রতিনিধিত্ব এবং আন্তর্জাতিক সঙ্ঘাতের প্রশ্নে অভিন্ন অবস্থান- এই চারটি ক্ষেত্রে ব্রিকস যে দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা সামনে আনছে, ঘোষণাপত্রে তারই রাজনৈতিক রূপরেখা প্রতিফলিত হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ কোনো পক্ষের ‘অভিন্ন স্বার্থ’ পূরণ করে না : শি জিনপিং
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ কোনো পক্ষের ‘অভিন্ন স্বার্থ’ পূরণ করে না-ব্রিকসের মঞ্চে এমন মন্তব্য করে চীন কার্যত যুদ্ধের বদলে কূটনীতি ও বহুপক্ষীয়তার পক্ষে নিজের অবস্থান আবারো স্পষ্ট করল। গতকাল শনিবার ভারতের নয়াদিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এ বক্তব্য দেন বলে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।
শি জিনপিংয়ের এ বক্তব্যকে নিছক শান্তির আহ্বান হিসেবে দেখলে এর ভূরাজনৈতিক তাৎপর্যের একটি বড় অংশ অনালোচিত থেকে যায়। কারণ, নয়াদিল্লির এবারের ব্রিকস সম্মেলন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোকে নাড়িয়ে দিয়েছে এবং একই সাথে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও কৌশলগত প্রতিযোগিতাও নতুন মাত্রা পেয়েছে।
ফলে ব্রিকসের মঞ্চে শির বক্তব্য মূলত একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে এনেছে-উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর এ জোট কি কেবল অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্লাটফর্ম থাকবে, নাকি বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার একটি কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠবে?
‘সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ নয়’
শি জিনপিং ব্রিকস সদস্যদের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সহযোগিতা জোরদারের আহ্বানের পাশাপাশি অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন। বক্তব্যটির ভাষা সাধারণ হলেও এর রাজনৈতিক ইঙ্গিত স্পষ্ট।
চীন দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘সার্বভৌমত্ব’ ও ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার’ নীতিকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ ও একতরফা নিষেধাজ্ঞার সমালোচনায় বেইজিং এ নীতিকে সামনে রাখে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সঙ্ঘাতের প্রেক্ষাপটে শির বক্তব্য তাই ওয়াশিংটনের সামরিক পদক্ষেপের সরাসরি সমালোচনা না করেও তার বিরুদ্ধে একটি নীতিগত অবস্থান তৈরি করে।
চীনের জন্য বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ। ইরান চীনের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অংশীদার এবং মধ্যপ্রাচ্যে বেইজিংয়ের বিস্তৃত কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হলে শুধু তেল ও গ্যাস সরবরাহই ঝুঁঁকির মুখে পড়বে না; বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, সমুদ্রপথ ও চীনের বাণিজ্যিক যোগাযোগও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ব্রিকসের কঠিন পরীক্ষা
এবারের সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এবং আয়োজক ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ সদস্য দেশগুলোর নেতারা অংশ নিচ্ছেন। ফলে ব্রিকসের ভেতরেই এমন কয়েকটি দেশ রয়েছে, যাদের যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের ধরন একেবারেই ভিন্ন।
রাশিয়া ও ইরান সরাসরি পশ্চিমা চাপ ও নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে। চীন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। অন্য দিকে ভারত একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার এবং রাশিয়া ও ইরানের সাথে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক বজায় রেখে চলছে।
এ বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ নিয়ে ব্রিকসের একটি অভিন্ন অবস্থান তৈরি করা সহজ নয়। চীন ও রাশিয়া সঙ্ঘাতের ক্ষেত্রে পশ্চিমা হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করলেও ভারতকে একই মাত্রায় অবস্থান নিতে গেলে তার যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক কৌশলগত সম্পর্কের সাথে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।
এ কারণেই শির বক্তব্যকে ব্রিকসের ঐক্যের একটি পরীক্ষা হিসেবেও দেখা যায়। অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রশ্নে সদস্যদের মধ্যে ঐকমত্য তুলনামূলক সহজ; কিন্তু যুদ্ধ, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক ক্ষমতার রাজনীতিতে সে ঐক্য কতটা কার্যকর-এটাই বড় প্রশ্ন।
অর্থনীতি থেকে ভূরাজনীতিতে
ব্রিকসের মূল শক্তি এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনায়। বিশ্বের বড় উদীয়মান অর্থনীতিগুলোকে এক প্লাটফর্মে এনে পশ্চিমা-নির্ভর বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার বিকল্প তৈরি করার আলোচনা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সঙ্ঘাতের সময়ে এ জোটের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েও প্রত্যাশা বাড়ছে।
শি জিনপিংয়ের বক্তব্য সে প্রত্যাশাকে আরো সামনে এনেছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি যুদ্ধ, সার্বভৌমত্ব, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে ব্রিকসকে একটি যৌথ কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা স্পষ্ট হচ্ছে।
বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সহযোগিতার আহ্বানটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি এখন আর কেবল অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার বিষয় নয়; এটি সামরিক সক্ষমতা, গোয়েন্দা ব্যবস্থা, শিল্প উৎপাদন ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অন্যতম ভিত্তি। ফলে ব্রিকসের এআই সহযোগিতা ভবিষ্যতে পশ্চিমা প্রযুক্তি-নির্ভরতার বিকল্প তৈরির বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে।
সামনে যে প্রশ্ন
তবে ব্রিকসের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো-বক্তব্যের ঐক্যকে বাস্তব কৌশলে রূপ দেয়া। যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান, সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান কিংবা বহুপক্ষীয়তার পক্ষে অবস্থান তখনই কার্যকর হবে, যখন সদস্য দেশগুলো সঙ্কটের সময়ে সমন্বিত কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে পারবে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সে পরীক্ষার প্রথম বড় ক্ষেত্রগুলোর একটি। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সঙ্ঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তেলের বাজার থেকে শুরু করে বৈশ্বিক বাণিজ্যপথ পর্যন্ত এর অভিঘাত পড়বে। একই সাথে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক স্বার্থের সঙ্ঘাতও তীব্র হতে পারে।
শি জিনপিংয়ের ‘অভিন্ন স্বার্থ’ প্রসঙ্গটি তাই বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তার বার্তার অন্তর্নিহিত অর্থ হলো-যুদ্ধ যতই আঞ্চলিক মনে হোক, এর মূল্য শেষ পর্যন্ত সবাইকে দিতে হয়। আর সে বাস্তবতায় চীন চাইছে ব্রিকসকে এমন একটি মঞ্চে পরিণত করতে, যেখানে বৈশ্বিক সঙ্কটের বিষয়ে পশ্চিমা শক্তির বাইরে একটি সমন্বিত কণ্ঠ তৈরি হবে।
নয়াদিল্লির সম্মেলনে সে কণ্ঠ কতটা ঐক্যবদ্ধ হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।



