ভারতের লাগাতার হুঙ্কারে সীমান্তে তৎপরতা জোরদার

বাংলাদেশ নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য ও মিথ্যাচার

বর্তমানে কোনো দেশ সরাসরি আক্রমণ করে না বা করতে চায় না। তবে ভারত কোনো দিনও আমাদের ওপর আক্রমণ করবে না এ কথা বলা যাবে না। তাই আমাদের দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্ত রাখতে হবে। আমাদের প্রস্তুতও থাকতে হবে।

এস এম মিন্টু
Printed Edition

সম্প্রতি ভারতের বিজেপি নেতা টি রাজা সিংসহ কয়েকজন নেতা বাংলাদেশে সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর প্রতি আচরণ সম্পর্কে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। টি রাজা সিং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সরাসরি হস্তক্ষেপের জন্য ১৫ মিনিটের জন্য সীমান্ত খুলে দেয়ার অনুরোধ করেছেন। এমনকি তিনি বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার প্রতি অসম্মান দেখান এবং ছিঁড়ে ফেলেন। তিনি হঙ্কার দিয়ে বলেন, যারা ভারতের বিরোধিতা করবে তাদেরও একই পরিণতি হবে। একই সাথে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, গাজাকে ইসরাইল যেভাবে শিক্ষা দিয়েছে, বাংলাদেশকেও সেভাবেই শিক্ষা দেয়া উচিত। ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির এই নেতার মন্তব্যের পর বিভিন্ন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) রোকন উদ্দিন গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, ভারতের মিডিয়া মিসইনফরমেশন, রাজনৈতিক দলেন নেতা এবং কংগ্রেস ও বিজেপি নেতাদের বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব বিরোধী কথা বলেছে। তারা অনেক সময় বলেছে, আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে তারা ভুল করেছে। আমাদের দেশকে নিয়ে যাবে। তা ছাড়া চট্টগ্রামকে তারা নিয়ে যাবে। এই ধরনের নানান কথা বলেছে তারা। বর্তমানে কোনো দেশ সরাসরি আক্রমণ করে না বা করতে চায় না। তবে ভারত কোনো দিনও আমাদের ওপর আক্রমণ করবে না এ কথা বলা যাবে না। তাই আমাদের দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্ত রাখতে হবে। আমাদের প্রস্তুতও থাকতে হবে। তবে এই ধরনের কথাবার্তায় আমাদের বিভ্রান্ত হয়ে লাভ নাই। ভারতের কিছু কর্মকাণ্ডে দেখা যাচ্ছে, তারা আগের চেয়ে কিছুটা নরম হয়ে আসছে। কারণ তারা বুঝতে পেরেছে, বাংলাদেশকে তাদের দরকার। তারা হয়তো বুঝতে পেরেছে, বাংলাদেশ ভারত ছাড়া চলতে পারবে কিন্তু ভারত বাংলাদেশ ছাড়া চলতে পারবে না। আমাদের তিন দিকে ওদের সীমান্ত। তাদের সেভেন সিস্টার্স আমাদের পাশেই। তাই তারা আমাদের সাথে মিলেমিশে না থাকলে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিছু দিন আগে ত্রিপুরার রাজা, বিজেপির নেতারা বিভিন্ন ধরনের কথা বলেছে। তারা মূলত মিডিয়ার সামনে আসার জন্য এসব করেছে। তথ্য সন্ত্রাস অর্থাৎ ভুল তথ্য প্রচার করা শুরু থেকেই ভারতে দেখা যাচ্ছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করার জন্য ও ভাবমর্যাদা নষ্ট করার জন্য তারা এই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাই এগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। আমরা কারো সাথে যুদ্ধে যেতে চাই না। কিন্তু আমাদের ওপর যদি কেউ যুদ্ধ চাপিয়ে দেয় তাহলে আমাদের উচিত জবাব দেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

সীমান্তে কড়াকড়ি প্রসঙ্গে বিজিবির একাধিক ব্যাটালিয়েনের অধিনায়ক নয়া দিগন্তকে বলেন, আমাদের সীমানাপ্রাচীরের ভেতর কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলার সুযোগ নেই। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এ ব্যপারে তৎপর রয়েছে। ওই কর্মকর্তারা বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিজিবির সব ব্যাটালিয়ন প্রস্তুত রয়েছে।

শুভেন্দু অধিকারী বিজেপির নেতাকর্মী এবং একাধিক হিন্দু ধর্মগুরুকে সাথে নিয়ে কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনের সামনে গত শনিবার মিছিল করেন। বাংলাদেশের দুই হিন্দু ব্যক্তি দীপু দাস ও অমৃত মণ্ডল খুন হওয়ার প্রতিবাদে এই মিছিল করা হয়। মিছিল চলাকালীন শুভেন্দু অধিকারী বলেন, সবক শেখানো উচিত। যেমন ইসরাইল গাজায় শিখিয়েছে, সেভাবেই। আমাদের দেশের ১০০ কোটি মানুষ হিন্দু। দেশ হিন্দুদের স্বার্থে চলছে। শিক্ষা দেয়া দরকার। যেমন অপারেশন সিন্দুরে পাকিস্তানকে আমরা শিক্ষা দিয়েছিলাম।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেস এই মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছে। এক্সে (আগের টুইটার) একটি পোস্টে তৃণমূল লেখে, ‘বিজেপি ঘৃণা আর অসহিষ্ণুতাকে শিল্পে পরিণত করেছে। তাদের বিষাক্ত মুখপাত্র শুভেন্দু অধিকারী আবার ফ্যাসিবাদী মানসিকতা দেখালেন। তিনি প্রকাশ্যে গণহত্যার ডাক দিয়েছেন। গাজায় ইসরাইল যা করেছে, সেইভাবে মুসলিমদের শিক্ষা দেয়ার কথা বলেছেন, যা সাম্প্রদায়িক উসকানিও বটে।’

বাংলাদেশের সীমান্ত নিয়ে কাজ করা একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সাথে কথা হলে তারা নয়া দিগন্তকে বলেন, ভারত ২৪-এর ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের সীমান্তের ওপারে বিভিন্ন ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছে। তারা দীর্ঘ সীমান্ত এলাকায় বিএসএফ সদস্য বৃদ্ধি এবং ক্যাম্পও নির্মাণ করেছে। একই সাথে ভারতের সেনাবাহিনীর ক্যাম্পও বৃদ্ধি করা হয়েছে। কিন্তু এসবই তাদের নিজেদের বিষয়। সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করলে শুধু বাংলাদেশ নয়, তারাও বিপদে পড়বে। ওই সূত্র জানায়, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) বাংলাদেশের সীমান্ত লাগোয়া ক্যাম্পগুলোতে পাঁচ থেকে সাতজন করে বৃদ্ধি করা হয়েছে। মূলত তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবৈধভাবে ভারতের মুসলিম নাগরিকদের অবৈধভাবে ঠেলে দিতে সীমান্ত এলাকায় তাদের নিরাপত্তা জোরদার করেছে। এরই মধ্যে অনেক মুসলিম নারী, শিশু ও পুরুষদের অবৈধভাবে গ্রেফতারের পর জেল হাজাতে শাস্তি দিয়ে বাংলাদেশে পুশ ইন করেছে।