নিজস্ব প্রতিবেদক
- একই পরিবারের ৪ জনসহ শনাক্ত ৫ বাংলাদেশী
- অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন, লাশ দেশে ফেরাতে তৎপরতা
বুধবার রাত ২টার দিকে মধ্য কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি পাঁচতলা হোটেলে যখন আগুন লাগে, তখন ভবনটির অধিকাংশ অতিথিই গভীর ঘুমে। মুহূর্তেই ঘন ধোঁয়ায় ভরে যায় করিডোর ও সিঁড়ি। অন্ধকারের মধ্যে পথ খুঁজতে গিয়ে আটকা পড়েন অনেকেই। দমকলের চারটি ইঞ্জিন ঘটনাস্থলে পৌঁছে কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও প্রাণ হারান ৯ জন- তাদের মধ্যে চার বছরের এক শিশুও রয়েছে। আহত হয়েছেন আরো ছয়জন; উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ৬০ জনকে।
প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাতের কথা বলা হলেও কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। সরু বহির্গমনপথ ও অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের কারণে ধোঁয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কলকাতার ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকায় এর আগেও অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ফলে তদন্তের পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে- ঘুমন্ত অতিথিদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা যে হোটেলের, সেটিই কিভাবে প্রাণঘাতী ফাঁদে পরিণত হলো?
এদিকে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে আটজন বাংলাদেশের ও একজন ভারতীয় নাগরিক বলে জানিয়েছে কলকাতা পুলিশ। তারা চিকিৎসার উদ্দেশ্যে কলকাতায় গিয়েছিলেন। অন্য দিকে, নিহত ৯ জনের মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশী নাগরিককে শনাক্ত করা গেছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। তাদের মধ্যে একই পরিবারের চারজন রয়েছেন। তারা হলেন- সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত (৩৭), তার স্ত্রী আফসানা শিম্মিন (২৫), তাদের দুই বছরের শিশুসন্তান স্বর্ণাশীষ দত্ত এবং শ্বশুর মো: আকরাম আলী (৬৪)। দেবাশীষ দৈনিক আজকের পত্রিকা ও চ্যানেল নাইনের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি এবং স্থানীয় দৈনিক আজকের আলোর নির্বাহী সম্পাদক। গত ৩ আগস্ট তারা প্রথমে বেঙ্গালুরুতে অবস্থান করেন এবং ঘটনার আগের দিন মঙ্গলবার কলকাতায় এসে ওই হোটেলে ওঠেন। নিহত অপর বাংলাদেশী হলেন, ঢাকার সাভারের আমিনবাজার (বেগুনবাড়ি) এলাকার বাসিন্দা আহমেদ বাবু। এ ছাড়া সন্দীপ পাসওয়ান (১৯) নামে ওই হোটেলের এক কর্মচারীর পরিচয় পাওয়া গেছে। তার বাড়ি ঝাড়খণ্ডের গিরিডি জেলায়। নিহত বাকি চার বাংলাদেশীর পরিচয় এখনো শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। আহত ছয় বাংলাদেশী নাগরিককে প্রাথমিক চিকিৎসার পর হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে।
অগ্নিসুরক্ষা বিধি ও ভবনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন
কলকাতার নিউমার্কেট এলাকাটি বাংলাদেশী পর্যটকদের কাছে কেনাকাটা ও স্বল্প খরচে আবাসিক সুবিধার কারণে অত্যন্ত পরিচিত, যা স্থানীয়ভাবে ‘মিনি বাংলাদেশ’ নামেও অভিহিত। এই দুর্ঘটনার পর এলাকার হোটেলগুলোর অগ্নিসুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বেশ কিছু গুরুতর প্রশ্ন উঠে এসেছে। আগুন লাগা ভবনটিতে কোনো জরুরি বহিরাগমন ব্যবস্থা ছিল না। পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ও নিরাপদ চলাচলের ফায়ার এস্কেপ পথ অনুপস্থিত ছিল। ঘিঞ্জি এলাকায় অবস্থিত ভবনটির নকশা, আবাসিক হোটেল হিসেবে চালনার বৈধতা এবং বৈদ্যুতিক নিরাপত্তার নিয়মিত পরীক্ষা করা হতো কি না তা নিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ইতোমধ্যেই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। আগুনের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটকে প্রাথমিক সন্দেহ করা হলেও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না।
কনস্যুলার পদক্ষেপ ও প্রশাসনিক সহায়তা
ঘটনার পরপরই কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশ উপহাইকমিশন তৎপর ভূমিকা গ্রহণ করেছে। উপহাইকমিশনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন। দুর্ঘটনাকবলিতদের তথ্য ও সহায়তার জন্য একটি ২৪ ঘণ্টার হেল্পলাইন চালু করা হয়েছে। নিহতদের লাশ দ্রুত এবং প্রক্রিয়াগত জটিলতা এড়িয়ে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আহতদের চিকিৎসা ও পরিবারের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়ে একই পরিবারের চারজনসহ বাংলাদেশীদের এই মর্মান্তিক মৃত্যু দেশে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। একই সাথে বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কনস্যুলার সহায়তা জোরদার ও সীমান্ত এলাকার স্বল্প খরচের হোটেলগুলোর মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।



