দুর্নীতির কালো ছায়ায় ঢেকে যাওয়া কৃষিখাতের একটি মেগা প্রকল্প মাঝপথে ঝুলিয়ে রেখে একই খাতে নতুন করে আরো বড় প্রকল্প নেয়ার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। কৃষির আধুনিকায়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে তিন হাজার ২০ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয়া হলেও বাস্তবে সে উদ্যোগ অনিয়ম ও দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ‘সমন্বিত কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ নামের ওই প্রকল্পে শত শত কোটি টাকা লোপাটের প্রমাণ সামনে আসার পরও নামকাওয়াস্তে সাবেক একজন পিডিসহ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়। অনিয়মে জড়িয়েপড়াদের তালিকায় নাম আসা সংশ্লিষ্ট কৃষিযন্ত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে যেমন আড়াল করা হয়েছে, তেমনি রাঘববোয়াল রাজনীতিবিদ আমলাদেরও সুরক্ষার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। দুর্নীতিগ্রস্ত প্রকল্পটি মাঝপথে রেখে প্রায় তিন হাজার ৬৯০ কোটি টাকার আরেকটি মেগা প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেন বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো সাবেক সচিব এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। তার পথই অনুসরণ করছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ে তারই অনুসারী কিছু কর্মকর্তা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
কৃষকের ভাগ্যোন্নয়ন এবং শ্রম সঙ্কট নিরসনের লক্ষ্য সামনে রেখে বিগত সরকারের আমলে শুরু হওয়া প্রকল্পটি সময়ের ব্যবধানে এক ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র উন্মোচন করেছে। নথিপত্রে হাজার হাজার কৃষিযন্ত্র ক্রয় ও বিতরণের তথ্য থাকলেও বাস্তবে তার বড় অংশের অস্তিত্ব নেই। তদন্তে উঠে এসেছে, মাত্র ১৩টি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ৮৫০টি কম্বাইন হারভেস্টারের বিপরীতে একাধিকবার বিল উত্তোলন করেছে। আরো বিস্ময়কর হলো, ৯৭১টি যন্ত্রের জন্য ভর্তুকি নেয়া হলেও সেগুলোর কোনো বাস্তব অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এ জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারের অন্তত ৫১৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ অনিয়মের নেপথ্যে সাবেক কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক সচিব ওয়াহিদা আক্তার এবং তাদের ঘনিষ্ঠ একটি প্রভাবশালী চক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের প্রথম পরিচালক বেনজীর আলমসহ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হলেও প্রকৃত সুবিধাভোগী হিসেবে চিহ্নিত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। বাংলামার্ক করপোরেশন, এসকিউ ট্রেডিং, চিটাগাং বিল্ডার্স, আদী এন্টারপ্রাইজ, মেটাল এগ্রিটেক ও এসিআই মোটরসের মতো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
দুর্নীতির এ চিত্র সামনে আসার পর স্বাভাবিকভাবে যেখানে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার কথা, সেখানে উল্টো প্রকল্পটি বন্ধ করার পাঁয়তারা চলছে বিগত অন্তর্বর্তকালীন সরকারের সময় থেকে। গত ১২ মার্চ পরিকল্পনা কমিশনের এক সভায় প্রকল্পটি বন্ধের সুপারিশ করা হয়। নির্ধারিত সময়ের সাত মাস পর সংশোধনী প্রস্তাব জমা পড়ায় একে ‘বিধি বহির্ভূত’ দেখানো হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এ বিলম্ব ছিল পরিকল্পিত। সাবেক সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ানের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে সংশোধনী প্রস্তাব আটকে রেখে প্রকল্পটিকে অচল করে তোলার চেষ্টা করেছেন, যাতে দুর্নীতির তদন্ত এড়ানো যায়।
প্রকল্পটি বন্ধের এই প্রক্রিয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর। প্রায় ১০০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী গত সাত মাস ধরে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না, যা তাদের মানবেতর অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে। অন্য দিকে বিতর্কিত ৯টি প্রতিষ্ঠান এখনো প্রায় ১০ কোটি ৫৮ লাখ টাকার বকেয়া বিল আদায়ের জন্য তদবির চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে, বসে নেই কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিগত সময়ের সিন্ডিকেট। এরই মধ্যে নতুন করে ‘টেকসই কৃষির জন্য কৃষি প্রকৌশল প্রযুক্তি সম্প্রসারণ’ নামে তিন হাজার ৬৯০ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প নেয়ার উদ্যোগ সামনে এনেছেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব চলমান প্রকল্প বাদ দিয়ে নতুন প্রকল্প দ্রুত মাঠে আনার বিষয়ে তৎপর বলে জানা যায়। প্রস্তাবিত প্রকল্পটি যদিও এখনো কৃষি মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপনের অনুমোদন পর্যায়ে আসেনি, তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়- প্রকল্পটি উপস্থাপনের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট উইংয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। প্রকল্পের সারসংক্ষেপ থেকে জানা যায়, চলতি ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। একজন কৃষি প্রকৌশলী এই প্রকল্পটির ডিপিপির সারসংক্ষেপ তৈরি করেছেন। প্রকেল্পর আওতায় ১০ হাজার কম্বাইন হারভেস্টার, ৩ হাজার রাইস ট্রান্সপ্লান্টার এবং তিন হাজার রিপার বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন প্রকল্পে সারা দেশে সমানভাবে ৫০ শতাংশ ভর্তুকির প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যেখানে পূর্ববর্তী প্রকল্পে সমতলে ৫০ শতাংশ এবং হাওরাঞ্চলে ৭০ শতাংশ ভর্তুকি দেয়া হতো।
নতুন প্রকল্পে ড্রোন প্রযুক্তি, আইওটি-ভিত্তিক সেচ ব্যবস্থা, সোলার ড্রিপ সেচসহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি যন্ত্রপাতি পরীক্ষণ ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র শক্তিশালী করা, ফার্মসেড নির্মাণ এবং সেচ অবকাঠামো উন্নয়নের কথাও বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে কৃষিতে ৪৫.৪ শতাংশ শ্রমিক নিয়োজিত থাকলেও গত তিন দশকে এ হার ৬৫ শতাংশ থেকে কমে এসেছে। উৎপাদন ব্যয়ের ৫৮ থেকে ৬২ শতাংশই শ্রম খাতে ব্যয় হওয়ায় কৃষকের জন্য ব্যয়ভার দিন দিন বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যান্ত্রিকীকরণ হলে উৎপাদন ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে, শ্রম ব্যয় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কমতে পারে এবং শস্য অপচয় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে।
তবে, এমন বাস্তবতায় চলমান প্রকল্প বন্ধ করে নতুন প্রকল্প আনা সমাধান নয় বলে মনে করেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের বর্তমান সচিব রফিকুল ই মোহামেদ। তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, লুটপাট করা অর্থ ফেরত আনতে হবে এবং দায়ীদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। রাঘববোয়াল যারাই থাকুক তাদের চিহ্নিত করতে হবে। চলমান প্রকল্প বন্ধ হবে নাকি চালিয়ে নেয়া হবে- এ বিষয়ে কিছুদিনের মধ্যে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানান কৃষিসচিব।



