ইবিএল চেয়ারম্যানের অর্থপাচার অনুসন্ধানে নেমেছে আর্থিক গোয়েন্দারা

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

ইস্টার্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান শওকত আলীর ‘লুটের সাম্রাজ্য’, নাফিজ-আরাফাত সিন্ডিকেট ও গোপন নথির অনুসন্ধানে নেমেছে আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটসহ একাধিক সংস্থা। এবার আন্তর্জাতিক ‘গ্রে লিস্টেড’ রাষ্ট্রব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে হাজার কোটি টাকা পাচার, নিষিদ্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজ আমদানি, শ্রমিক মৃত্যুর পরও দায় এড়ানো এবং ব্যাংকিং খাতে ক্ষমতার অপব্যবহার- সবমিলিয়ে উঠে এসেছে একটি সঙ্ঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের ভয়াবহ চিত্র।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এই সিন্ডিকেটে শওকত আলীর সাথে যুক্ত রয়েছেন চৌধুরী নাফজি সরাফাত এবং সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত। ব্যাংক ঋণ, শেয়ার হস্তান্তর ও করপোরেট মালিকানা ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে চলে ‘কুইড প্রো কো’ বা পারস্পরিক সুবিধাভিত্তিক লেনদেন।

সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস : অর্থপাচারের নিরাপদ রুট : তদন্তের সাথে সম্পৃক্ত একটি সূত্র জানিয়েছে, শওকত আলী সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের দ্বৈত নাগরিকত্বকে একটি মানিলন্ডারিং হাব হিসেবে ব্যবহার করেছেন। দেশটি আন্তর্জাতিক অপরাধী ও দুর্নীতিবাজদের কাছে পরিচিত দু’টি কারণে- সিটিজেনশিপ বাই ইনভেস্টমেন্ট কর্মসূচি ও ফ্ল্যাগ অব কনভিনিয়েন্স (ঋঙঈ) সুবিধা। অর্থনৈতিক নজরদারি দুর্বল হওয়ায় সেন্ট কিটস দীর্ঘ দিন ধরে কার্যত একটি ‘গ্রে লিস্টেড’ অঞ্চল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

জানা গেছে, শওকত আলী ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসহ বিভিন্ন অফশোর জুরিসডিকশনে একাধিক শেল কোম্পানি খুলেছেন। এগুলোর মাধ্যমে-এলসি খুলে জাহাজের প্রকৃত দামের কয়েক গুণ বেশি মূল্য দেখানো হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার বিদেশে পাচার করা হয়েছে। প্রকৃত মালিকানা গোপন থাকায় অর্থ বিদেশী আদালতের নজর এড়িয়ে গেছে। এই কালো টাকা পরবর্তী সময়ে ব্যবহার হয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ ও বিষাক্ত জাহাজ কেনার কাজে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পাচারকৃত অর্থে শওকত আলীর মালিকানাধীন এস এন করপোরেশন আন্তর্জাতিক আইন ও হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে বাংলাদেশকে পরিণত করেছে বিষাক্ত জাহাজের কবরস্থানে। ২০১৯ সালে হাইকোর্ট (রিট পিটিশন নং ৮৪৬৬/২০১৭) স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেয়-সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস, কমোরোস, সিয়েরা লিওনসহ ব্লø্যাক বা গ্রে লিস্টেড রাষ্ট্রের পতাকাবাহী জাহাজ বাংলাদেশে আমদানি ও বিচিং নিষিদ্ধ। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত ছয় বছরে শওকত আলী অন্তত ২০টি নিষিদ্ধ পতাকাবাহী জাহাজ আমদানি করেছেন।

ক্যাশ বায়ার ও ট্র্যাকিং গায়েব

২০২৪ সালের এপ্রিলে আমদানি করা ‘এমটি সুবর্ণ স্বরাজ্য’ ছিল এই সিন্ডিকেটের অন্যতম উদাহরণ। প্রকৃত মালিক : শিপিং করপোরেশন অব ইন্ডিয়া। ক্রয় করা হয় দুবাইভিত্তিক ক্যাশ বায়ার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। জাহাজটি ভারতীয় পানিসীমা অতিক্রমের সময় রহস্যজনকভাবে এআইএস ট্র্যাকিং বন্ধ হয়ে যায়। উদ্দেশ্য ছিল, ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজটি গোপনে এস এন করপোরেশনের ইয়ার্ডে এনে কাটা।

ইবিএল ও ব্যাংকিং খাতে ক্ষমতার অপব্যবহার

জাহাজ ব্যবসার আড়ালে শওকত আলী ইবিএলের চেয়ারম্যান পদ ব্যবহার করে ব্যাংকিং খাতে নজিরবিহীন লুটপাট চালিয়েছেন। ২০২৪ সালের ৩ মার্চ ইবিএল বোর্ড নাফজি সরাফাতের প্রতিষ্ঠান ‘স্ট্র্যাটেজিক ফাইন্যান্স’-এর ঋণ শর্ত শিথিল করে। একই দিনে সিডনেট কমিউনিকেশনের তিন লাখ শেয়ার শওকত আলীর কোম্পানিতে হস্তান্তর করা হয়। এই সিডনেটের শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ আরাফাত ও তার স্ত্রী।

এ দিকে ইস্টার্ন ব্যাংক থেকে ২২০ কোটি টাকার ঋণ দেয়া হয় চৌধুরী নাফিজ শারাফাতের ‘ফ্রন্টিয়ার টাওয়ার্স বাংলাদেশ’-কে, যার মালিকানা তদন্তে বের হয়ে আসে জেড এন এন্টারপ্রাইজ লিমিটিড, যার মূল মালিক হিসেবে শওকত আলী ও তার স্ত্রীর নাম উঠে আসে। এছাড়া, ন্যাশনল টি কোম্পানি- এর ৭৫০ টাকা বাজারমূল্যের শেয়ার চৌধুরী নাফিজ শারাফাত ও শেখ হাসিনার চাচা শেখ কবির সিন্ডিকেট শওকত আলীর সন্তানদের দেয় মাত্র ১১৯ টাকায়। ফলে রাষ্ট্রের শেয়ার ৪১ শতাংশ থেকে নেমে আসে ১৬.৫ শতাংশে।

প্রসঙ্গত, ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের (ইবিএল) চেয়ারম্যান মো: শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিদেশী পাসপোর্ট ব্যবহার, অর্থপাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় শুরু হওয়া এই তদন্তে তার নিজের পাশাপাশি স্ত্রী, সন্তান ও নিকটাত্মীয়দের পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, দেশ-বিদেশে সম্পদ, ব্যবসা, শেয়ারহোল্ডিং এবং বিদেশে বিনিয়োগসংক্রান্ত বিস্তৃত নথি তলব করা হয়েছে।