সংসদীয় আসনের সীমানা নিয়ে উদ্দেশ্যপূর্ণ কারসাজি

বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৯(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনের জন্য নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণের ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত। পাশাপাশি নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ অনুযায়ী প্রশাসনিক সুবিধা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও জনসংখ্যার বণ্টন, এই তিনটি মানদণ্ড অনুসরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

জাতীয় সংসদের নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ নির্বাচন কমিশনের একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব। বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৯(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনের জন্য নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণের ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত। পাশাপাশি নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ অনুযায়ী প্রশাসনিক সুবিধা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও জনসংখ্যার বণ্টন, এই তিনটি মানদণ্ড অনুসরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

তবে জাতীয় নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। কমিশনের অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিগত দেড় দশকে সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ প্রক্রিয়া বারবার রাজনৈতিক প্রভাব, পক্ষপাতিত্ব ও গেরিম্যান্ডারিংয়ের মাধ্যমে বিকৃত করা হয়েছে। এতে জনগণের ভোটাধিকার যেমন ক্ষুণœ হয়েছে, তেমনি নির্বাচনের ফলাফল পূর্বনির্ধারিত করার একটি শক্তিশালী কৌশল হিসেবে সীমানা পুনর্বিন্যাস ব্যবহৃত হয়েছে।

তদন্ত কমিশনের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক স্বাধীনতা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হয়নি। রাজনৈতিক সুবিধা দিতে বিরোধী ভোটার অধ্যুষিত এলাকা বিভক্ত করা হয়েছে এবং গেরিম্যান্ডারিং একটি প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই বাস্তবতা স্বীকার ও সংস্কার ছাড়া ভবিষ্যতে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা কঠিন, এমন সতর্ক বার্তাই দিয়েছে তদন্ত কমিশন।

২০০৮ : সীমানা বদলে নির্বাচনী ফল প্রভাবিত : তদন্ত কমিশনের মতে, ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সীমানা পুনর্বিন্যাস ছিল একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রকল্প। সারা দেশের ৩০০ আসনের মধ্যে প্রায় ১৩৩টি আসনের সীমানা পরিবর্তন করা হয়। লক্ষ্য ছিল বিরোধী দলের ভোটার অধ্যুষিত এলাকাকে বিভক্ত করা এবং আওয়ামী লীগকে কৌশলগত সুবিধা দেয়া।

এর প্রতিফলন দেখা যায় নির্বাচনের ফলাফলে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট মোট ভোটের প্রায় ৫৫.৮৫ শতাংশ পেয়ে সংসদের ২৬২টি আসনে জয়লাভ করে, বিপরীতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ৩৮.২৩ শতাংশ ভোট পেলেও মাত্র ৩৩টি আসনে জয় পায়। তদন্ত কমিশনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভোটের ব্যবধানের তুলনায় আসনের ব্যবধান অস্বাভাবিকভাবে বেশি, যা সীমানা নির্ধারণের কারসাজির স্পষ্ট ইঙ্গিত।

প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘনের উদাহরণ : তদন্তে উঠে এসেছে, সীমানা নির্ধারণের সময় একাধিক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সুবিধা ও ভৌগোলিক সংযোগ সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে চট্টগ্রাম-৭ ও চট্টগ্রাম-৮ আসনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে একটি বিশেষ ব্যক্তিকে সুবিধা দিতে কর্ণফুলী নদী দ্বারা বিভক্ত দুটি ভিন্ন উপজেলার অংশ জোড়া দেয়া হয়। একইভাবে কেরানীগঞ্জ উপজেলাকে একাধিক সংসদীয় আসনে বিভক্ত করে ‘ভোটার সমতা’ ও ‘প্রশাসনিক অখণ্ডতা’ নষ্ট করা হয়েছে- এমন অভিযোগ তদন্ত কমিশনের নথিতে রয়েছে।

সিইজিআইএস নিয়োগ ও অস্বচ্ছ সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া : ২০০৮ সাল থেকে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণে সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস)-কে সরাসরি (ডিরেক্ট প্রকিউরমেন্ট) নিয়োগ দেয়া হয়। তদন্ত কমিশনের মতে, সীমানা নির্ধারণের মতো সংবেদনশীল ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কাজে সিইজিআইএসের নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং তাদের প্রস্তাবিত মানচিত্র গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ নীতিমালা বা বিকল্প বিবেচনার কোনো প্রমাণ নেই।

নথি ও সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সুপারিশকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এতে নির্বাচন কমিশনের প্রকৃত স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এবং গেরিম্যান্ডারিংয়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট দলকে সুবিধা দেয়ার পথ সুগম হয়েছে।

নথি সংরক্ষণে ব্যর্থতা : প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা : তদন্ত কমিশন একটি গুরুতর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার দিকেও ইঙ্গিত করেছে, তা হলো নথি সংরক্ষণের অভাব।

২০০৮ ও ২০১৪ সালের সীমানা পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোন মানদণ্ডে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, বিকল্প মানচিত্র বা সুপারিশ বিবেচনা করা হয়েছিল কি না- এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ নথি পাওয়া যায়নি। কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকারে জানা গেছে, আগারগাঁওয়ে নতুন ভবনে স্থানান্তরের সময় বহু গুরুত্বপূর্ণ নথি হারিয়ে গেছে বা সংরক্ষণ করা হয়নি। তদন্ত কমিশনের মতে, এই নথি-অভাব ইচ্ছাকৃত অথবা চরম অবহেলার ফল- উভয় ক্ষেত্রেই এটি নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বহীনতার প্রমাণ।

২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ : একই প্যাটার্নের পুনরাবৃত্তি : তিনটি নির্বাচনের আগে সীমানা পুনর্নির্ধারণ প্রক্রিয়া প্রায় একই রকম ছিল। ২০১৪ সালে ইতঃপূর্বে ২০০৮ সালের সীমানা প্রায় অপরিবর্তিত রেখে নির্বাচন আয়োজন; ২০১৮ সালে শত শত আপত্তি সত্ত্বেও মাত্র ২৪টি আসনে আংশিক পরিবর্তন এবং ২০২৪ সালে ২৯৩টি আসন অপরিবর্তিত রেখে মাত্র ১০টি আসনে নামমাত্র সংশোধন।

তদন্ত কমিশনের মতে, প্রতিবারই সময় সঙ্কট, আনুষ্ঠানিক শুনানি এবং সীমিত সংশোধনের অজুহাতে খসড়াকেই প্রায় হুবহু চূড়ান্ত করা হয়েছে। এতে জনপরামর্শ কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থেকে বিচ্যুতি : গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে সীমানা নির্ধারণ নির্বাচন ব্যবস্থাপনা থেকে পৃথক, দীর্ঘমেয়াদি ও অংশগ্রহণমূলক একটি প্রক্রিয়া। যুক্তরাজ্যসহ অনেক দেশে স্বাধীন বাউন্ডারি কমিশন কয়েক বছর ধরে ধাপে ধাপে খসড়া, সংশোধিত খসড়া ও চূড়ান্ত মানচিত্র তৈরি করে।

এর বিপরীতে বাংলাদেশে সীমানা পুনর্নির্ধারণ হয়েছে অল্প সময়ের মধ্যে, সীমিত পরামর্শে এবং সরকারের প্রভাবাধীন কাঠামোয়। ফলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ড থেকে বাংলাদেশ অনেক দূরে সরে গেছে।

তদন্ত কমিশনের মূল উপসংহার : তদন্ত কমিশনের সার্বিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে- সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক স্বাধীনতা কার্যত প্রয়োগ হয়নি; রাজনৈতিক সুবিধা দিতে বিরোধী ভোটার অধ্যুষিত এলাকা বিভক্ত করা হয়েছে; ভোটার সমতা, প্রশাসনিক সুবিধা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিয়মিতভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে; গেরিম্যান্ডারিং একটি প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে; প্রক্রিয়াটি ছিল অস্বচ্ছ, নথিহীন ও রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত।

কমিশনের মতে, এই বাস্তবতা স্বীকার না করে ভবিষ্যতে সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।