অবশেষে বিনিয়োগকারীদেও মুখে হাসি দেখল পুঁজিবাজার

ব্যাংক, বীমা থেকে এবার অন্য খাতে বিনিয়োগকারীরা

Printed Edition
অবশেষে বিনিয়োগকারীদেও মুখে হাসি দেখল পুঁজিবাজার
অবশেষে বিনিয়োগকারীদেও মুখে হাসি দেখল পুঁজিবাজার

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

আবার হাসি ফুটেছে বিনিয়োগকারীদের মুখে যা দীর্ঘ সময় ধরে ছিল অনুপস্থিত। এরই মধ্যে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীরা খুব বেশি কিছু যে পেয়ে গেছেন তা কিন্তু নয়। তবু টানা মন্দায় ধুঁকতে থাকা পুঁজিবাজারে গত দু’দিনের আচরণ যেন আলোর ঝলকানি হয়ে দেখা দিলো। একটি ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরে একটি দেয়াশলাইয়ের কাঠিও যেমন অত্যুজ্জ্বল আলো ছড়ায় তেমনি গত দু’দিনে দেশের দুই বাজার যেন বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রত্যাশার আলো ছড়িয়ে দিলো। আর এভাবে দীর্ঘদিন পর গতকাল মতিঝিলের বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ট্রেডিং ফ্লোরগুলোতে উপস্থিত বিনিয়োগকারীদের মুখে মুখে ফুটে উঠল হাসি। আদৌ এ হাসি ক’দিন টিকবে তা নিয়ে তারা ভাবতে চাননি। তবে প্রত্যাশা করছেন, সামনের দিনগুলোতে পুঁজিবাজারে ভালো কিছু হবে।

গতকাল সোমবার টানা দ্বিতীয় দিনের মতো পুঁজিবাজার সূচকের বড় ধরনের উন্নতি ঘটতে দেখা যায়। এ নিয়ে দু’দিনে ঢাকা শেয়ারবাজারের প্রধান সূচকটির উন্নতি ঘটেছে ১৩২ পয়েন্টের বেশি। আর চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারের প্রধান সূচক একই সময় উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয় ২৯৫ পয়েন্ট। দুই পুঁজিবাজারেরই বিশেষায়িত সূচকগুলোরও উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে। সূচকের এ উন্নতি বাজারের লেনদেনেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে ঢাকা শেয়ারবাজারে গতকাল লেনদেন পৌঁছে যায় ৫৯৩ কোটি টাকায় যা আগের দিনের লেনদেনের চেয়ে ১১৯ কোটি টাকা বেশি। রোববার বাজারটির লেনদেন ছিল ৪৭৪ কোটি টাকা।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা দিনের বাজার আচরণে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করেন, টানা মন্দার পর গত দু’ দিনের বাজার আচরণ বিনিয়োগকারীদের জন্য কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার করেছে। তবে তারা এখনো নিশ্চিত নয় কত দিন এ ধারাবাহিকতা টিকে থাকে। তবে তারা বিশ^াস করতে চান সামনে জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারীদের ভালো কিছু দেবে। তা না হলে পুঁজি হারিয়ে পথে বসে যাওয়া বিনিয়োগকারীরা এ মুহূর্তে নিজেদের সক্ষমতার পুরোটাই হারিয়ে বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দু’টি সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারের ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের পুঁজির বেশির ভাগই নিঃশেষ হয়ে গেছে। তাই সামনের দিনগুলোতে হারানো পুঁজির একটি অংশ ফিরে না পেলে বিনিয়োগকারীরা যেমন টিকবেন না তেমনি অস্তিত্ব হারাবে পুঁজিবাজারও। কারণ পুঁজি ছাড়া পুঁজিবাজারের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার দ্বিতীয় কোনো পথ নেই।

গতকাল মতিঝিলে অবস্থিত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ট্রেডিং ফ্লোরগুলোতে লেনদেনে অংশ নেয়া বিনিয়োগকারীদের কাছে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে তারা চলমান পুঁজিবাজার আচরণে সন্তোষ প্রকাশ করেন। নয়া দিগন্তকে তারা বলেন, নিয়ে আসার পুঁজির ৬০ শতাংশই ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। বিশেষ করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেয়া সিদ্ধান্ত তাদেরকে এক প্রকার পথেই বসিয়ে দিয়েছে। এ পুঁজি ফিরে পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাও তারা দেখছেন না। তা সত্ত্বেও এখন বাজার ঘুরে দাঁড়ালে তারা নতুন করে আশাবাদী হতে পারেন। এ মুহূর্তে বাজারের যে মূল্যস্তর ও সূচকের যে অবস্থান তাতে বাজার আরো অনেক দূর যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অনেক ভালো কোম্পানির শেয়ার এখনো হাতের নাগালে রয়েছে যা বিনিয়োগকারীদের এখনো ভালো মুনাফা দিতে পারে।

তবে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখন যে ভয় কাজ করছে তা হলো বরাবরই পুঁজিবাজারের ভালো সময়ে একশ্রেণীর বিনিয়োগকারীরা বাজার নিয়ে জুয়া খেলায় মেতে ওঠেন। বাজারে তৈরি হয় নানা ধরনের সিন্ডিকেট যারা দুর্বল ও মৌলভিত্তিহীন কোম্পানিগুলো নিয়ে অনৈতিকভাবে মুনাফা লাভে তৎপর হয়। পুঁজিবাজার কর্তৃপক্ষ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত ভালো বাজার চাইলে যাতে এসব বিষয়ে নজরদারি বাড়িয়ে দেন। বাজার নিয়ে যারা অনৈতিক খেলায় মেতে উঠতে চায় তাদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা। তা না হলে ভালো বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে সময় লাগবে না।

এ দিকে গতকালের বাজার আচরণ বিশ্লেষণে দেখা যায় আগের দিন ব্যাংক ও বীমা খাতের যে দাপট ছিল গতকাল তেমনটি দেখা যায়নি। অন্য খাতগুলোতেই গতকাল তাদের অবস্থান নিতে দেখা যায়। ফলে ব্যাংক ও বীমা খাতে খুব একটা দরপতন না ঘটলেও মূল্যবৃদ্ধিও তেমনটি ঘটেনি। বিপরীতে অন্য খাতগুলোর বেশির ভাগ কোম্পানি গতকাল মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় জায়গা করে নেয়। সিমেন্ট সিরামিকস, ওষুধ ও রসায়ন, প্রকৌশল, সেবা ও বিবিধ খাতের বেশির ভাগ কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধি ঘটে গতকাল। বাজারের ভারসাম্যপূর্ণ এ আচরণ সামনের দিনগুলোতে ধারাবাহিকতা রক্ষা ও টেকসই হতে ভূমিকা রাখবে বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

গতকাল ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল ওষুধ ও রসায়ন খাতের স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস। ১৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৯ লাখ ১৪ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল ১৮ কোটি ৮৭ লাখ টাকায় ৬১ লাখ ৬৪ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে ব্যাংকিং খাতের প্রাইম ব্যাংক উঠে আসে দ্বিতীয় স্থানে। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে সিটি ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ওরিয়ন ইনফিউশন, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, আনোয়ার গ্যালভেনাইজিং, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ ও শাহজিবাজার পাওয়ার।

দিনের মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষে উঠে আসে খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ। ‘বি’ ক্যাটাগরি থেকে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত হওয়ায় ৯ দশমিক ৯১ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে গতকাল। ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল বীমা খাতের রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্স। ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে এলআর গ্লোবাল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, এসইএম আইবিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, সিলাভা ফার্মা, এআইবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, আইসিবি এমপ্লয়িজ মিউচুয়াল ফান্ড, সি-পার্ল বিচ হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট ও রিলায়েন্স ওয়ান মিউচুয়াল ফান্ড।

দিনের দরপতনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের প্রাইম ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট। কোম্পানিটি ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ দর হারায় গতকাল। ৭ দশমিক ৫২ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় ছিল এনসিসিবি ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড। দরপতনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে জিএসপি ফিন্যান্স, ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স, ঝিল বাংলা সুগার মিলস, শ্যামপুর সুগার মিলস, বিডি ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোড, বিডি ল্যাম্প, জাহিন স্পিনিং ও এপেক্স ফুডস।