যুক্তরাষ্ট্র ‘রেড লাইন’ পার হলে যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ছড়াবে : ইরান

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ওয়াশিংটন যদি ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করে তাহলে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের বাইরে সঙ্ঘাত ছড়িয়ে পড়বে বলে সতর্ক করে দিয়েছে ইরান। গতকাল মঙ্গলবার ইরানের বিপ্লবী গার্ডবাহিনী (আইআরজিসি) ওই সতর্কবার্তা দিয়েছে বলে জানিয়েছে এএফপি।

শুধু তাই নয়, পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের তেল-গ্যাস থেকে বঞ্চিত করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে ইরান। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে ওই হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে। অন্য দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে আলটিমেটামের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালী খুলতে সম্মত না হয় তবে তিনি ইরানি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সেতুগুলোতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আঘাত হানবেন। ট্রাম্পের এই হুমকির জবাবে আইআরজিসি বিবৃতি দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি বেসামরিক স্থাপনায় আক্রমণ করে তবে ইরানও পাল্টা আঘাত হানতে দ্বিধা করবে না।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা আমেরিকা এবং তার মিত্রদের অবকাঠামোতে পাল্টা আঘাত হানব। এতে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা বহু বছর ধরে এই অঞ্চলের তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে বঞ্চিত হবে।’ আইআরজিসি বলেছে, ‘তারা আক্রমণ করলে আমাদের যোদ্ধাদের রেঞ্জের মধ্যে তাদের কত সম্পদ ঝুঁকিতে পড়বে, সেই হিসাব করার ক্ষমতা আমেরিকার নেতাদের নেই।’ বিবৃতিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র রেড লাইন অতিক্রম করলে ইরানের জবাব আঞ্চলিক গণ্ডির মধ্যে সীমাবব্ধ থাকবে না।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, দেশের জন্য জীবন দিতে এরই মধ্যে এক কোটি ৪০ লাখ (১৪ মিলিয়ন) ইরানি অঙ্গীকার করেছেন। এমনকি আমি নিজেও জীবন দিতে প্রস্তুত। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, ১৪ মিলিয়নের বেশি গর্বিত ইরানি তাদের জীবন উৎসর্গ করতে নিবন্ধন করেছেন। আমিও আমার জীবন ইরানের জন্য উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলাম, আছি এবং থাকব।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মুখে ইরানের নেতৃত্ব দেশবাসীর মধ্যে প্রতিরোধ ও জাতীয় ঐক্যের বার্তা জোরদার করার চেষ্টা করছে। একই সাথে সরকার দাবি করছে, বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষ স্বেচ্ছায় দেশ রক্ষায় এগিয়ে এসেছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে নতুন করে মঙ্গলবারের সময়সীমার মধ্যে চুক্তি করার হুমকি দিয়ে বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধে একটি চুক্তি না হলে আজ রাতে একটি সম্পূর্ণ সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে। ‘এই সভ্যতা আর কখনও পুনরুদ্ধার করা যাবে না। আমি চাই না এটি ঘটুক, কিন্তু এটি সম্ভবত ঘটবে।’ নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল এক পোস্টে ট্রাম্প এই হুমকি দেন।

তিনি লেখেন, ‘যা হোক, এখন আমরা সম্পূর্ণ ও সামগ্রিক শাসন পরিবর্তন করেছি, যেখানে ভিন্ন, আরো বেশি বুদ্ধিমান এবং কম কট্টরপন্থীমনা মানুষেরা আছে, হয়তো বিপ্লবী চমৎকার কিছু ঘটতেও পারে, কে জানে?’ ‘আজ রাতেই আমরা দেখতে পাব বিশ্বের দীর্ঘ ও জটিল ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক মুহূর্ত। ৪৭ বছরের শোষণ, দুর্নীতি এবং মৃত্যুর অবসান শেষ পর্যন্ত হবে। ইরানের জনগণকে ঈশ্বর আশীর্বাদ করুন,’ লেখেন ট্রাম্প।

‘কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ দ্রুত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে’ : মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে কাতার সতর্ক করে বলেছে, কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ দ্রুত সঙ্কুচিত হয়ে আসছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। খবর আলজাজিরার। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেন, আমরা এমন এক পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি, যেখানে পরিস্থিতি পুরো অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দীর্ঘস্থায়ী এই সঙ্ঘাত কোনো দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে নয়। এই যুদ্ধ চলতে থাকলে কোনো পক্ষই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হবে না।

একইসাথে সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলার সমালোচনা করে আল-আনসারি বলেন, যে পক্ষই হোক, বেসামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি আঞ্চলিক নৌপথ নিয়ে বাড়তে থাকা উত্তেজনার দিকেও ইঙ্গিত করেন, বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালী প্রসঙ্গে। আল-আনসারি বলেন, হরমুজ কোনো খাল নয়, এটি একটি প্রাকৃতিক প্রণালী। এই অঞ্চলের সব দেশেরই এটি ব্যবহারের অধিকার রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, কাতারের এই সতর্কবার্তা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ না নিলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সঙ্ঘাত আরো বিস্তৃত আকার ধারণ করতে পারে।

ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, মঙ্গলবার তারা ইরানের বিভিন্ন পরিবহন রুটে বড় পরিসরের হামলা চালিয়েছে। ইরানের তেল উৎপাদনকারী খারগ দ্বীপেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। একই সাথে দেশটির বিভিন্ন রেললাইন ও সড়ক অবকাঠামোতেও হামলা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। তাবরিজ-তেহরান মহাসড়কের কাছে একটি হামলায় দুই দিকের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া কাশানের ইয়াহিয়াবাদ রেলসেতু এবং কোম প্রদেশের কয়েকটি সেতুও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

ইসরাইলি সেনাবাহিনী ইরানের সাধারণ জনগণকে ট্রেন ব্যবহার না করার এবং রেললাইনের কাছাকাছি না যাওয়ার সতর্কবার্তা দিয়েছে। তারা বলেছে, এসব এলাকায় অবস্থান জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এই ‘সতর্ক’ বার্তা দেয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের রেল নেটওয়ার্কে ইসরাইলি বিমান হামলা আসন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বেসামরিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুসহ বেসামরিক অবকাঠামোগুলো গুঁড়িয়ে দেয়ার হুমকির পর ইরানিদের ট্রেন ভ্রমণের বিষয়ে সতর্ক করেছে ইসরাইল।

ইসরাইলি বাহিনী এই ‘সতর্ক’ বার্তা দেয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের রেল নেটওয়ার্কে ইসরাইলি হামলা আসন্ন। কিন্তু ইরানে কয়েক সপ্তাহ ধরে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ইসরাইলি বাহিনীর এই পোস্ট সম্ভবত খুব বেশি মানুষ দেখতে পাবে না। ইরানের রেল নেটওয়ার্ক ব্যাপক ও দেশজুড়ে বিস্তৃত। লোকজন ইতোমধ্যে হয়তো ট্রেনে ভ্রমণ শুরু করে দিয়েছে, তার দূর গন্তব্যে যাচ্ছে আর অনেকেই হয়তো রেলস্টেশন বা লাইনের কাছাকাছি থাকবে। এর আগে ইসরাইল রাতভর ইরানের একটি পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনাসহ বিভিন্ন অবকাঠামোতে একাধিক হামলা চালায়।