নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- ধর্মপাশা ও মধ্যনগরে ৪০ ভাগ ধান পানিতে তলিয়ে গেছে
- কোনো কোনো হাওরে শ্রমিকের মজুরি জনপ্রতি ১২০০ টাকা
সুনামগঞ্জের হাওরে ধানের বাম্পার ফলনেও কৃষকরা পড়েছেন দুশ্চিন্তায়। ধান ঘরে তোলা নিয়ে ত্রিমুখী সঙ্কটে পড়েছেন দোয়ারাবাজার, ধর্মপাশা ও মধ্যনগরের কৃষকরা। প্রকৃতির বৈরী আচরণ, শ্রমিক ও জ্বালানি সঙ্কটের অসহায় হয়ে পড়েছেন তারা। একদিকে কালবৈশাখীর শিলাবৃষ্টিতে তলিয়ে যাচ্ছে পাকা ধান। অন্যদিকে তীব্র শ্রমিক সঙ্কটে ধান কাটার মজুরি এখন সাধ্যের বাইরে।
জ্বালানি তেলের অভাবে হারভেস্টার মেশিনগুলো অচল হয়ে পড়েছে। বৃষ্টির কারণে জমিতে সেগুলো নামানোও যাচ্ছে না। দাদন আর ঋণের টাকায় ফলানো ফসল চোখের সামনে নষ্ট হতে দেখে দিশেহারা হাওরপাড়ের কৃষক পরিবারগুলো। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ধান কাটার জন্য মাইকিং ও জ্বালানি সহায়তার আশ্বাস দেয়া হলেও শ্রমিক সঙ্কটে কার্যকর করা যাচ্ছে না।
দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, কিছু এলাকায় পুরোদমে চলছে ধান কাটা। কিন্তু ত্রিমুখী সঙ্কটে হাওর পাড়ের কৃষকরা ধান ঘরে তুলা নিয়ে শঙ্কায়। কৃষি শ্রমিকের সঙ্কট, জ্বালানি সঙ্কট এবং গুঁড়ি-গুঁড়ি বৃষ্টির সাথে শিলাবৃষ্টি আর আগাম বন্যার শঙ্কায় কৃষকদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ দেখা দিয়েছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের তথ্য মতে, চলতি বছরে দোয়ারাবাজার উপজেলায় ১৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। তবে ৭০ ভাগ জমির ধান এখনো পাকেনি। এদিকে ভারী বৃষ্টিপাতে আকস্মিক বন্যা হওয়ার আশঙ্কায় সতর্কতা জারি করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ২৮ এপ্রিল থেকে সুনামগঞ্জ জেলায় আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এজন্য ৮০ শতাংশ ধান পাকা জমির ধান দ্রুত কাটার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, গত শনিবার সকাল থেকে দোয়ারাবাজার উপজেলার কোনো কোনো অঞ্চলে হালকা থেকে মাঝারি আকারে কালবৈশাখী ঝড়-তুফান ও শিলাবৃষ্টি আঘাত হানে। সরেজমিন হাওরে দেখা যায়, হাঁটু পানিতে ভিজে ধান কাটছেন আবুল কাশেম ও রুবেল মিয়া নামের স্থানীয় দুই যুবক। ৭০০ টাকা মজুরিতে মহাজনের ধান কাটছেন তারা। ১০ বিঘা জমিতে তারা বোরো ধানের আবাদ করেছে। তবে কয়েকদিনের বৃষ্টিতে বেশির ভাগ জমিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে জমিতে হারভেস্টার মেশিন নিতে না পারায় ধান পাকলেও সময় মতো কাটতে পারছেন না।
স্থানীয় কৃষক কামরুল ইসলাম জানান, জমির অধিকাংশ ধানই এখনো কাঁচা। এর মধ্যে কালবৈশাখী ঝড় আর শিলাবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। বাজারে তেল নেই, তেলের কারণে হারভেস্টর ব্যবহার করা যাচ্ছে না। শ্রমিকও সঙ্কট, অতিরিক্ত মজুরি দিয়ে ও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। জানা যায়, উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের ছোট-বড় ৩৯টি হাওরে বোরো চাষ হয়েছে। বৈশাখের মাঝামাঝি সময়ে কিছু কিছু জমির ধান কাটা শেষ হলেও জ্যৈষ্ঠ মাসের শুরের দিকে পুরোদমে ধান ঘরে তোলা শেষ হয়।
দোয়ারাবাজার উপজেলা ভারতের সীমান্তবর্তী হওয়াতে এখানে পাহাড়ি ঢল আর শিলাবৃষ্টির প্রকোপ বেশি থাকে। প্রতিকূল আবহাওয়ার আশঙ্কায় অনেক সময় ৮০% পাকলেই ধান কাটা শুরু হয়। এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আশ্রাফুল আলম খাঁন জানান, বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। আগাম বন্যা থেকে বাঁচতে কৃষকদের সব ধরনের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। ইউএনও অরুপ রতন সিংহ জানান, হারভেস্টর ব্যবহারে সহজে জ্বালানি প্রাপ্তির জন্য কৃষকদের প্রত্যয়ন এবং শ্রমিক চাহিদা মেটানোর জন্য বালু মহালে শ্রমিকদের কাজ বন্ধ রাখতে জনসচেতনতায় মাইকিং করা হচ্ছে। এছাড়াও সব ইউপি চেয়ারম্যানকে সার্বিক সহযোগিতার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
শ্রমিক নেই তলিয়ে যাচ্ছে পাকা ধান
ধর্মপাশা (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, ধর্মপাশায় ও মধ্যনগরে ধান কাটার শ্রমিক নেই বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার হেক্টর পাকা বোরো ধান। চোখের সামনে ফসলে ক্ষতি দেখে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছে এলাকার কৃষক পরিবার। চলতি বোরো মৌসুমে ৩১ হাজার ৯১০ হেক্টর জমিতে বিএডিসির উচ্চ ফলনশীল উফশী জাতের ধান চাষে বাম্পার ফলন হয়েছে। কালবৈশাখী ঝড় ও অতি বৃষ্টির কারণে দুই উপজেলায় বৃষ্টির পানিতে ৪০ ভাগ ফসল তলিয়ে গেছে। ৬০ ভাগ ফসল অবশিষ্ট থাকলেও শ্রমিক সঙ্কটের কারণে কৃষকদের এসব পাকা ধান ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। কোনো কোনো হাওরে শ্রমিকের মজুরি এক হাজার থেকে ১২০০ টাকা। উপজেলার ডুবাইল হাওর, চন্দ্র সোনার থাল, টগা, বোয়ালা, গুড়াডুবাসহ ছোট বড় ১০টি হাওরে ৫০ ভাগ ধান বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে।
মধ্যনগর উপজেলার কৃষকরা বলেন, দাদন ব্যবসায়ী মহাজনদের কাছ থেকে দেনা সুদে হাজার হাজার টাকা ঋণ এনে অনেক আশা নিয়ে জমিতে চাষাবাদ করেছি এখন কালবৈশাখী ঝড় ও অতি বৃষ্টিতে আমাদের সোনার ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এখন কিভাবে মহাজনদের দেনা পরিশোধ করব আর খাবই বা কি। উপজেলা কৃষি অফিসার রাহাত তিনি বলেন, ধান কাটার শ্রমিক সঙ্কট থাকায় ধান কাটার হারবেষ্টর মেশিনের জন্য যমুনা ওয়েল কোম্পানির ডিপো থেকে ডিলারদের মাধ্যমে ডিজেলের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কিন্তু এসব মেশিন পানিতে ধান কাটতে পারছে না।



