- চাপের মুখে দেশের কৃষি খাত
- বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সারের সঙ্কটে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে
- খরচ বাড়লেও ধানের দাম অপরিবর্তিত
- আগাম বন্যার আশঙ্কায় হাওরের কৃষকদের নির্ঘুম রাত
দেশের কৃষি অর্থনীতির প্রাণভোমরা বোরো মৌসুম। মোট ধান উৎপাদনের ৫৫ শতাংশের বেশি আসে এই মৌসুম থেকেই। অথচ চলতি বছর বোরো চাষ একযোগে একাধিক সঙ্কটে জর্জরিত। বিদ্যুতের লোডশেডিং, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ ঘাটতি, সারের সঙ্কট, কৃষিযন্ত্র ও শ্রমিকের অভাব- সবমিলিয়ে কৃষি খাত এখন চরম চাপে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে প্রাকৃতিক ঝুঁকি, বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যার আশঙ্কা। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও ধানের সরকারি মূল্য অপরিবর্তিত থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষকরা।
বাংলাদেশের ধান উৎপাদন কাঠামোতে বোরো, আমন ও আউশ- এই তিন মৌসুম গুরুত্বপূর্ণ হলেও উৎপাদনের মূল ভরকেন্দ্র বোরো। এ মৌসুমে প্রায় দুই কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদিত হয়, যেখানে আমনে প্রায় এক কোটি ৬৭ লাখ টন এবং আউশে প্রায় ৩০ লাখ টন। ফলে বোরো মৌসুমে সামান্য ব্যাঘাতও সরাসরি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।
জ্বালানিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থার চাপ
বর্তমান কৃষিব্যবস্থার প্রতিটি ধাপই জ্বালানিনির্ভর। জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে রোপণ, সেচ, ধান কাটা, মাড়াই এবং পরিবহন-সব ক্ষেত্রেই ডিজেলের ব্যবহার অপরিহার্য। শ্রমিক সঙ্কট ও মজুরি বৃদ্ধির কারণে কৃষকরা ক্রমেই যন্ত্রনির্ভর হয়ে উঠেছেন। কম্বাইন হারভেস্টার, থ্রেশার, ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, সেচ পাম্প সবই ডিজেলচালিত।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২১ লাখের বেশি ডিজেলচালিত কৃষিযন্ত্র রয়েছে, যার মধ্যে কম্বাইন হারভেস্টারই ১০ হাজারের বেশি। সেচ মৌসুমে কৃষিতে ডিজেলের মোট চাহিদা প্রায় ১২.৫ লাখ টন, যার মধ্যে ৭.৬ লাখ টন লাগে শুধু সেচে। দৈনিক চাহিদা প্রায় ৭ হাজার টন। কিন্তু সরবরাহ ঘাটতির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই যন্ত্র মাঠে অচল হয়ে পড়ে থাকছে, ফলে ধান কাটা বিলম্বিত হচ্ছে।
আগাম বন্যার শঙ্কা ও হাওরের উদ্বেগ
হাওরাঞ্চলে এখন ধান কাটার ভরা মৌসুম। কিন্তু আকাশে সামান্য মেঘ জমলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে কৃষকদের মধ্যে। বজ্রপাতের ঝুঁকি এতটাই বেড়েছে যে, অনেক সময় কাজ ফেলে আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষক-শ্রমিকরা।
উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ইতোমধ্যে নির্দেশ দিয়েছে- ৮০ শতাংশ পাকা ধান দ্রুত কেটে ফেলতে হবে। কারণ হাওরাঞ্চলে ধান কাটার সময় খুবই সীমিত; সামান্য বিলম্বও পুরো ফসল তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
কৃষিযন্ত্র সঙ্কটে ঝুঁকি আরও বাড়ছে
দেশের মোট বোরো ধানের প্রায় ২০ শতাংশ উৎপাদিত হয় হাওরাঞ্চলে। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে কৃষিযন্ত্রের সঙ্কট পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। দ্রুত ধান কাটতে যেখানে প্রায় সাড়ে সাত হাজার হারভেস্টার প্রয়োজন, সেখানে সচল রয়েছে মাত্র তিন হাজারের মতো। আরো শত শত যন্ত্র মেরামতের অভাবে অচল পড়ে আছে। অনেক জমিতে পানি জমে থাকায় যন্ত্র ব্যবহার করা যাচ্ছে না, ফলে শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। কিন্তু শ্রমিক সঙ্কট ও বাড়তি মজুরি কৃষকদের নতুন করে চাপের মুখে ফেলেছে। খুচরা যন্ত্রাংশের অভাব এবং ভর্তুকি বন্ধ থাকায় নতুন যন্ত্রও সহজলভ্য নয়। ফলে সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও সময়মতো ধান কাটার সক্ষমতা নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে।
লোডশেডিং ও জ্বালানি সঙ্কটে সেচ ব্যাহত
গ্রামাঞ্চলে ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গভীর নলকূপ বন্ধ থাকায় জমিতে প্রয়োজনীয় পানি দেয়া যাচ্ছে না। অন্য দিকে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সঙ্কট কৃষকদের দুর্ভোগ আরো বাড়িয়ে তুলেছে। অনেক ক্ষেত্রে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না।
ডিজেলের দাম বৃদ্ধির ফলে কৃষিতে অতিরিক্ত ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা। এক বিঘা জমিতে উৎপাদন খরচ কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে কৃষকের জন্য লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচ তোলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বোরো আবাদের ভরা মৌসুম চলছে। হাওরাঞ্চলে ধান কাটা শুরু হলেও অন্যান্য অঞ্চলে এখনও এক থেকে দেড় মাস সময় বাকি। এই সময়ে সেচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিদ্যুৎ ও ডিজেল সংকটের কারণে সেচ ব্যাহত হওয়ায় কৃষকরা চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট সতর্ক করেছে-তাপপ্রবাহের সময়ে পানির ঘাটতি হলে ধানে চিটা হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার বাসুদেবকোল গ্রামের কৃষক আকতার হোসেন জানান, কয়েক বছর আগেও বিঘাপ্রতি বোরো চাষে ১২-১৩ হাজার টাকা খরচ হতো, যা এখন বেড়ে ১৬-১৭ হাজার টাকায় পৌঁছেছে।
খরচ বাড়লেও বাড়েনি ধানের দাম
বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি মৌসুমে উৎপাদন ব্যয় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। কিন্তু সরকারি সংগ্রহ মূল্য অপরিবর্তিত রয়েছে- ধান ৩৬ টাকা, সেদ্ধ চাল ৪৯ টাকা এবং আতপ চাল ৪৮ টাকা। এতে কৃষকরা লোকসানের শঙ্কায় পড়েছেন।
অনেক কৃষকের ভাষায়, এক মণ ধানের দামে এখন এক দিনের শ্রমিকের মজুরিও ওঠে না। ফলে ভবিষ্যতে উৎপাদনে আগ্রহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সরকার চলতি বোরো মৌসুমে ধান-চাল সংগ্রহের মূল্য অপরিবর্তিত রাখলেও সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে পাঁচ লাখ টন করেছে। আগামী ৩ মে থেকে ধান ও গম এবং ১৫ মে থেকে চাল সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়ে চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে গুদামে ১৭ থেকে ১৮ লাখ টন চাল মজুত রয়েছে। জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ন্যূনতম ১৩ লাখ টন নিরাপত্তা মজুদ রাখা বাধ্যতামূলক। প্রয়োজনে এই মজুদ ২৪-২৫ লাখ টনে উন্নীত করার সক্ষমতা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
দেশে বার্ষিক চালের চাহিদা প্রায় ৪ কোটি ২৪ লাখ টন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বাম্পার ফলনের আশা করা হলেও বর্তমান সঙ্কট পরিস্থিতি সেই সম্ভাবনাকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
খাদ্য নিরাপত্তায় বাড়ছে শঙ্কা
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বোরো উৎপাদন ব্যাহত হলে তা সরাসরি দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলবে। উৎপাদন কমে গেলে চালের দাম বাড়বে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পাবে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলমের মতে, উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ না করলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি কৃষি খাতে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা, পুনর্বহাল বা বৃদ্ধি করা এবং বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেয়া জরুরি।



