পুলসিরাত, অনন্তের বিশেষ পারাপার

Printed Edition

জাফর আহমাদ

পুলসিরাত আখিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন। হাশরের মাঠ থেকে জান্নাতে যাওয়ার পথে জাহান্নামের ওপর নির্মিত একটি সুদীর্ঘ সেতু। আল কুরআনে সরাসরি এটির বর্ণনা পাওয়া না গেলেও পরোক্ষভাবে তার বর্ণনা রয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে জাহান্নাম অতিক্রম করবে না। এ তো একটি স্থিরিকৃত ব্যাপার, যা সম্পন্ন করা তোমার রবের দায়িত্ব। তারপর যারা (দুনিয়ায়) মুত্তাকি ছিল তাদেরকে আমি বাঁচিয়ে নেবো এবং জালেমদেরকে তার মধ্য নিক্ষেপ অবস্থায় রেখে দেবো।’ (সূরা মারইয়াম : ৭১-৭২) অতিক্রম করা এ কথা নয় যে, প্রত্যেককে জাহান্নামে প্রবেশ করতে হবে। সত্যিকারার্থে এটির দ্বারা জাহান্নামের উপর পুল নির্মিত পুলের কথা বলা হয়েছে। যা পুলসিরাত নামে খ্যাত। হাদিসে তার সুস্পষ্ট বর্ণনা বিদ্যমান রয়েছে। নিম্নে সহিহ হাদিসগুলো উল্লেখ করা হলো।

যেমন- আবু সাইদ খুদরি রা: বর্ণিত দীর্ঘ এক হাদিসে মাঝের অংশে রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘এমন সময় জাহান্নামের উপড় পুল স্থাপন করা হবে। সাহাবিরা বললেন, সে পুলটি কেমন হবে হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, দুর্গম পিচ্ছিল স্থান। এর ওপর আংটা ও হুঁক থাকবে, শক্ত চওড়া উল্টোকাঁটা বিশিষ্ট হবে, যা নাজদ দেশের সাদান বৃক্ষের কাঁটার মতো হবে। সে পুলের উপড় দিয়ে ঈমানদারদের কেউ পার হয়ে যাবে চোখের পলকের মতো, কেউ বিদ্যুতের মতো, কেউ বাতাসের মতো আবার কেউ দ্রুতগামী ঘোড়া ও সওয়ারের মতো। তবে মুক্তিপ্রাপ্তরা কেউ নিরাপদে চলে আসবেন, আবার কেউ জাহান্নামের আগুনে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাবে।’ (বুখারি-৭৪৩৯, কিতাবুত তাওহিদ, বাবু কাউলিহি তায়ালা : সূরা আল কিয়ামাহ : ২২-২৩, মুসলিম-১৮৩, আহমাদ-১১১২৭, আ. প্র. ৬৯২১, ইফা-৬৯৩২)

উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা সিদ্দিকা রা: থেকে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘জাহান্নামের ওপর একটি পুল আছে, যা চুলের চেয়েও বেশি চিকন আর তরবারির চেয়েও বেশি ধারালো। এর ওপর লোহার শিকল ও কাঁটা থাকবে। মানুষ এর উপড় দিয়েই গমন করবে। কেউ চোখের পলকে, কেউ বিদ্যুৎ গতিতে, কেউ বায়ুর বেগে আর কেউ উত্তম ঘোড়া ও উটের ঘোড়া ও উটের গতিতে পুলসিরাত পার হবে। আর ফেরেশতারা বলতে থাকবে, হে প্রভু! সহি-সালামতে অতিক্রম করাও, হে প্রভু! নিরাপদে পার করাও। কেউ নাজাত পাবে, কেউ আহত হবে, কেউ উপুড় হয়ে পড়ে যাবে আর কেউ অধঃমুখী হয়ে জাহান্নামে পড়ে যাবে।’ (মুসনাদে আহমাদ-২৪৮৪৭)

পুলসিরাত কঠিন পরীক্ষায় সবাই খুব পেরেশান থাকবে। নবীরাও সেদিন আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে থাকবেন। হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিস বর্ণিত হয়েছে, তার কিয়দাংশ হলো নিম্নরূপ- ‘তিনি দু’আল নিমিত্তে দাঁড়াবেন এবং তাকে অনুমতি প্রদান করা হবে। আমানত ও আত্মীয়তার সম্পর্ক, পুলসিরাতের ডানে-বামে এসে দাঁড়াবে। আর তোমাদের প্রথম দলটি এ সিরাতে, বিদ্যুৎগতিতে পার হয়ে যাবে। সাহাবা বলেন, আমি জিজ্ঞাস করলাম, আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা উৎসর্গ হোক। আমাকে বলে দিন ‘বিদ্যুৎ গতির ন্যায়; কথাটির অর্থ কি? রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, আকাশের বিদ্যুৎ চমক কি কখনো দেখোনি? চোখের পলকে এখান থেকে সেখানে চলে যায় আবার ফিরে আসে। তারপর রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, এর পরবর্তী দলগুলো যথাক্রমে বায়ুর বেগে, পাখির গতিতে, তারপর লম্বা দৌড়ের গতিতে পার হয়ে যাবে। প্রত্যেকেই তার আমল হিসেবে তা অতিক্রম করবে। আর তোমাদের নবী সে অবস্থায় পুলসিরাতের উপর দাঁড়িয়ে এ দোয়া করতে থাকবে, আল্লাহ এদেরকে নিরাপদে পৌঁছিয়ে দিন, এদেরকে নিরাপদে পৌঁছিয়ে দিন।’

এরূপে মানুষের আমল মানুষকে চলতে অক্ষম করে দেয়ার পূর্ব পর্যন্ত তারা এ সিরাত অতিক্রম করতে থাকবে। শেষে এক ব্যক্তিকে দেখা যাবে সে নিতম্বের উপর ভর করে পথ অতিক্রম করছে। রাসূলুল্লাহ সা: আরো বলেন, ‘সিরাতের উভয় পাশে ঝুলানো থাকবে কাঁটাযুক্ত লৌহ শলাকা। এরা আল্লাহর নির্দেশক্রমে চিহ্নিত পাপিদেরকে পাকড়াও করবে। তন্মধ্যে কাউকে তো ক্ষত-বিক্ষত করেই ছেড়ে দেবে; অতঃপর সে নাজাত পাবে। আর কতক আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে জাহান্নামের গর্ভে নিক্ষিপ্ত হবে।’

আবু হুরায়রা রা: বলেন, ‘শপথ সে সত্তার যার হাতে আবু হুরায়রার প্রাণ! জেনে রেখো- জাহান্নামের গভীরতা ৭০ খারিফ (অর্থাৎ ৭০ হাজার বছরের পথের ন্যায়)। (মুসলিম-৩৭০, আন্ত. নাম্বার-১৯৫, কিতাবুল ঈমান, বাবু আদনা আহলিল জান্নাতি মানজিলাতি, ইফা-৩৭৮, ই. সে:-৩৮৯)

আবু সাইদ খুদরি রা: কর্তৃক বর্ণিত দীর্ঘ হাদিসের মাঝের অংশে রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘তারপর জাহান্নামের উপর জাসার (পুল) স্থাপন করা হবে। শাফায়াতেরও অনুমতি দেয়া হবে। মানুষ বলতে থাকবে, হে আল্লাহ! আমাদের নিরাপত্তা দিন, আমাদেরকে নিরাপত্তা দিন। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! জাসার কি? রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, এটি এমন স্থান যেখানে পা পিছলে যায়। সেখানে আছে নানা প্রকারের লৌহ শলাকা ও কাঁটা, দেখতে নাজদের সাদান বৃক্ষের কাঁটার মতো। মুমিনদের কেউ তো এ পথ চোখের পলকের গতিতে, কেউ উষ্টের গতিতে অতিক্রম করবে। কেউ তো অক্ষত অবস্থায় নাজাত পাবে, আর কেউ তো হবে ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় নাজাতপ্রাপ্ত। আর কতককে কাঁটাবিদ্ধ অবস্থায় জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। অবশেষে মুমিনগণ জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করবে।’ (মুসলিম-৩৪৩, আন্ত. নাম্বার-১৮৩, কিতাবুল ঈমান, বাবু মারেফাতু তরিকের রুইয়াহ)

পুলসিরাত; হাশরের ময়দান থেকে জান্নাত পর্যন্ত প্রলম্বিত একটি সেতু, যা সম্পূর্ণটাই নির্মিত হবে জাহান্নামের উপর। উপরে উল্লিখিত হাদিসসমূহে সেই পুলের বিস্তৃত বর্ণনা দেয়া হয়েছে। কারা এই পুলের উপর দিয়ে পার হবে তাদের পারাপারের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যারা মুমিন তারা চোখের পলকে বিদ্যুৎগতিতে তা পার হয়ে যাবে। কিন্তু যারা কাফের ও পাপাচারী সেখানে পদস্খলিত হয়ে নিচে জাহান্নামে নিপতিত হবে। তারা চিরস্থায়ী নিবাসে বসবাস করবে। উপরে উল্লিখিত সহিহ মুসলিমের ১৮৩ নং হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, ‘মুমিনদের কেউ তো এ পথ চোখের পলকের গতিতে, কেউ উষ্টের গতিতে অতিক্রম করবে। কেউ তো অক্ষত অবস্থায় নাজাত পাবে, আর কেউ তো হবে ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় নাজাতপ্রাপ্ত। আর কতককে কাঁটাবিদ্ধ অবস্থায় জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। অবশেষে মুমিনগণ জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করবে।’

অর্থাৎ- মুমিনদের মধ্যে আমলের তারতম্য থাকবে এবং সেই অনুযায়ী কিছু লোক এ পথ চোখের পলকের গতিতে, কেউ উষ্টের গতিতে, কেউ অক্ষত অবস্থায় নাজাত পাবে, আর কেউ ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় নাজাতপ্রাপ্ত হবে। আর কতককে কাঁটাবিদ্ধ অবস্থায় জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। মুমিনগণ অবশেষে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করবে। প্রত্যেকে তার আমল অনুযায়ী পুলসিরাত পার হবে।

ফলে সেই সেতুতে পার হওয়ার গতি তার আমল অনুযায়ী তারতম্য ঘটবে। সুতরাং নিজেদেরকে বিশ^াসের সাথে সাথে কার্যধারা বা কর্মনীতি বিশ^াসের অনুগত করতে হবে। অর্থাৎ- ঈমানের সাথে সাথে পরিপূর্ণ মুসলিম হতে হবে। আল্লাহ নির্দেশিত ও রাসূলুল্লাহ সা. প্রদর্শিত পথে নিজেকে পুরোপুরি পরিচালিত করতে হবে।

লেখক : প্রবন্ধকার ও গবেষক