অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
সপ্তাহের শুরুতে আবারো বড় ধরনের হোঁচট খেল দেশের পুঁজিবাজার। গতকাল সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দুই পুঁজিবাজারে সূচকের বড় অবনতি ঘটে। গত সপ্তাহেও একই পরিস্থিতি ছিল। ওই সপ্তাহে প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সূচক ডিএসইএক্স হারিয়েছিল ১০৩ পয়েন্টের বেশি। গতকাল আবারো একই ঘটনা ঘটে। প্রধান সূচক ৯৬ দশমিক ৬১ পয়েন্ট হারায়। এতে বিগত চার মাসে সর্বনি¤œ অবস্থানে নেমে আসে সূচকটি।
বাজার সংশ্লিষ্টদের নানা প্রয়াস সত্ত্বেও পুঁজিবাজারগুলোর পতনতো থামছেই না বরং তা দিনদিন বেড়ে চলেছে। কারণ জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি নয়া দিগন্তকে বলেন, পুঁজিবাজার নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি বেশ কিছু উদ্যোগ কার্যকর রয়েছে। কমিশন (বিএসইসি) ইতোমধ্যে বিভিন্ন আইন সংশোধন করাসহ বেশ কিছু কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে যেগুলোর ফল পেতে একটু সময় লাগছে। কিন্তু আমাদের বাজারের সমস্যা হলো এর বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ ব্যক্তিশ্রেণীর। বাজারের এ অংশটি কখনো পরিপক্ব আচরণ করেন না। হুজুগে বা গুজবের দ্বারা তাড়িত হয়েই এরা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। আর সামান্য দরপতনেই বাজারে শুরু হয় আতঙ্ক। কে কার আগে শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে যাবে তার প্রতিযোগিতা চলে।
তিনি আরো বলেন, সরকার বাজার নিয়ে সচেতন। কমিশনও সাধ্যমতো কাজ করে যাচ্ছে। আমরা তার মনিটরও করছি। কিন্তু কিছু সময় দিতে হবে। দীর্ঘসময় ধরে অনিয়মের মধ্যে চলতে থাকা একটি বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতেও কিছু সময় দরকার। তবে তিনি আশাবাদী, কমিশন কর্তৃক নেয়া বিভিন্ন সংস্কার কার্যকর করা গেলে বাজার আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। এটি এখন সময়ের ব্যাপার। বিনিয়োগকারীদের হতাশ না হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচকটি গতকাল ৯৬ দশমিক ৬১ পয়েন্ট অবনতি হয়। পাঁচ হাজার ৫১৫ দশমিক ১৬ পয়েন্ট থেকে রোববার সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি লেনদেন শেষে নেমে আসে পাঁচ হাজার ৪১৮ দশমিক ৫৫ পয়েন্টে। চলতি বছরের ২ জুনের পর সূচকটি আর এ পর্যায়ে নামেনি। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি ঘটে যথাক্রমে ২৩ দশমিক ২৯ ও ১৯ দশমিক ৬৬ পয়েন্ট। দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১৫০ দশমিক ৮৭ পয়েন্ট হারায় গতকাল। ১৪ হাজার ৮৬৬ দশমিক ৬৯ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি রোববার বিকেলে লেনদেন শেষে স্থির হয় ১৪ হাজার ৭১৫ দশমিক ৮২ পয়েন্টে। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ১০৮ দশমিক ২৭ ও ৭৯ দশমিক ৬৯ পয়েন্ট।
দিনের বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুই বাজারের সবগুলো খাতই গতকাল ব্যাপকভাবে দরপতনের শিকার হয়। তবে সূচকের অবনতির পেছনে বড় ভূমিকাটি ছিল ব্যাংক, বীমা, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও টেক্সটাইল খাতের। এ চারটি খাতে গতকাল বড় ধরনের দরপতন ঘটে। তাছাড়া সিমেন্ট সিরামিকসসহ আরো বেশ কয়েকটি খাতে শতভাগ কোম্পানির দরপতন ঘটে।
বিগত কয়েক দিনের মতো একমাত্র মিউচুয়াল ফান্ড খাতটিই ছিল কিছুটা ভালো অবস্থানে। দিনশেষে ডিএসইতে লেনদেনে অংশ নেয়া ৩৮৪টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ২৭টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দর হারায় ৩৩৬টি। অপরিবর্তিত ছিল ২১টির দর। অপরদিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে লেনদেনে অংশ নেয়া ২০১টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ৪০টির দাম বাড়লেও কমেছে ১৩৮টির। এখানে দর অপরিবর্তিত ছিল ২৩টি সিকিউরিটিজের।
এদিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের কোম্পানি জিপিএইচ ইস্পাত রাইট শেয়ার ছেড়ে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন উত্তোলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গতকাল ডিএসইর ওয়েবসাইটে কোম্পানিটি এ তথ্য প্রকাশ করে। কোম্পানিটি ২:১ হিসেবে রাইট শেয়ার ইস্যু করতে চায়। অর্থাৎ বিদ্যমান প্রতি একটি শেয়ারের বিপরীতে দু’টি রাইট শেয়ার পাবেন শেয়ারহোল্ডাররা। দশ টাকা অভিহিত মূল্যেই এ শেয়ার ইস্যু করা হবে। গত শনিবার অনুষ্ঠিত কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে রাইট শেয়ার ইস্যুর এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি। সূত্র অনুসারে, রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে কোম্পানিটি ৯৬৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা সংগ্রহ করবে। এই অর্থ কোম্পানি উচ্চ সুদে নেয়া ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করবে।
২০২৫ সালেও একবার রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহের চেষ্টা করেছিল কোম্পানিটি। সে সময় দু’টি শেয়ারের বিপরীতে একটি শেয়ার ছেড়ে ২৪১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা সংগ্রহের চেষ্টা করেছিল জিপিএইচ ইস্পাত। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমতি পায়নি। পরবর্তীতে প্রেফারেন্স শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমেও ৫০০ কোটি টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করেও পরে ব্যর্থ হয়। এবার বাজার থেকে প্রায় ৯৬৮ কোটি টাকা উত্তোলন করতে চায় একসময় পুঁজিবাজারে বেশ ভালো পারফর্ম করা কোম্পানিটি। এ টাকা দিয়ে কোম্পানি উচ্চসুদে নেয়া ঋণ শোধ করতে চায়।
ডিএসইর ওয়েসবসাইট পাওয়া তথ্যানুসারে বর্তমানে কোম্পানিটির স্বল্পমেয়াদি তিন হাজার ৯৫১ কোটি ও দীর্ঘমেয়াদি দুই হাজার ৯১১ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে।
আগামী ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভায় শেয়ারহোল্ডাররা রাইট শেয়ার ইস্যুর প্রস্তাব অনুমোদন করলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কাছে আবেদন করা হবে। তাদের অনুমোদন সাপেক্ষে সিদ্ধান্তটি কার্যকর হবে।



