অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
লেনদেনে কিছুটা ধীরগতি থাকলেও সূচকের উন্নতি দিয়েই ঈদপূর্ব লেনদেন শেষ করেছে দেশের পুঁজিবাজার। গতকাল দেশের দুই পুঁজিবাজারই সূচকের উন্নতি ধরে রেখে লেনদেন শেষ করে। সামনে পবিত্র ঈদুল ফিতরের সাত দিনের লম্বা ছুটি। এ সময় বন্ধ থাকবে পুঁজিবাজার। এ কারণে স্বাভাবিকভাবেই পুঁজিাবাজারে বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ট্রেডিং ফোরগুলো ছিল অনেকটা ফাঁকা। যারা হাউজগুলোতে উপস্থিত ছিলেন তারা বেশ ভালো মেজাজেই ছিলেন। ঈদ পরবর্তী একটি ভালো বাজারের প্রত্যাশা ছিল তাদের চোখেমুখে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৩৪ দশমিক ৭৯ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। পাঁচ হাজার ৩১৯ দশমিক ১৪ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি সোমবার দিনশেষে পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ৩৫৩ দশমিক ৯৩ পয়েন্টে। এ সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৭ দশমিক ৬৪ ও ৯ দশমিক ৩৮ পয়েন্ট। অপর দিকে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ৫১ দশমিক ০৪ পয়েন্ট উন্নতি ঘটে। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৩৯ দশমিক ৬৯ ও ১৭ দশমিক ২২ পয়েন্ট।
সূচকের উন্নতি ঘটলেও গতকাল দুই বাজারেই লেনদেন বেশ খানিকটা হ্রাস পায়। ডিএসই গতকাল ৪৬০ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ৬৩ কোটি টাকা কম। রোববার বাজারটির লেনদেন ছিল ৫২৩ কোটি টাকা। লেনদেন কমেছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারেও। এখানে লেনদেন নেমে আপসে চার কোটি টাকায়। রোববার বাজারটির লেনদেন ছিল ৩৫ কোটি টাকা। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, সামনে দীর্ঘ ছুটির কারণে বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ অনুপস্থিত ছিল গতকাল। তা ছাড়া যেহেতু শেয়ার বিক্রি করলেও টাকা ক্যাশ করা যাবে না তাই বিক্রয় চাপও ছিল কম। সব মিলিয়ে বাজার কিছুটা শ্লথ গতির ছিল।
এ দিকে দেশের শেয়ারবাজারের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পাশে থাকার কথা জানিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। বিএসইসি আগামী তিন বছরের মধ্যে শেয়ারবাজারের আকার বা মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন বর্তমানের মোট জিডিপির ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে জিডিপির অন্তত ৪০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বিএসইসির এই লক্ষ্য অর্জনে সবধরনের কারিগরি ও নীতিনির্ধারণী বিষয়ে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক।
সম্প্রতি রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিএসইসি কার্যালয়ে বিএসইসি ও এডিবির প্রতিনিধিদলের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় শেয়ারবাজারের বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শেয়ারবাজারের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি ‘ক্যাপিটাল মার্কেট ডায়াগনস্টিক’ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
গতকাল বিএসইসির পক্ষ থেকে পরিচালক ও মুখপাত্র মো: আবুল কালাম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
বিজ্ঞপ্তি অনুসারে বিএসইসির সাথে এডিবির এ সভায় জানানো হয়, দেশের শেয়ারবাজারে বর্তমানে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বাজার মূলধন জিডিপির মাত্র ১০ শতাংশের আশপাশে রয়েছে, যা পাশের দেশগুলোর চেয়ে অনেক কম। আগামী তিন বছরের মধ্যে এই হারকে ৪০ শতাংশে উন্নীত করতে বৃহৎ ও আর্থিকভাবে শক্তিশালী কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কর সংস্কার এবং অন্যান্য নীতিগত পরিবর্তন আনার বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে বড় ঋণগ্রহীতাদের সরাসরি ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে শেয়ারবাজার থেকে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করতে বিএসইসি ও বাংলাদেশ ব্যাংক সমন্বিতভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এ ছাড়া বাজারের স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিএসইসির কার্যক্রমে পূর্ণ অটোমেশন ও ডিজিটালাইজেশন করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে কমিশন। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে সুশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ছাড়া শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের নতুন মাধ্যম হিসেবে বন্ড মার্কেটকে শক্তিশালী করতে একটি ‘বন্ড গ্যারান্টি ফান্ড’ গঠনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এডিবি এই ফান্ড গঠনের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং এর বাস্তায়নে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বৈঠকে বিএসইসির কমিশনার ফারজানা লালারুখ, পরিচালক মো: আবুল কালাম এবং এডিবির সিনিয়র ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর স্পেশালিস্ট মানোহারি গুণাবর্ধনেসহ উভয় প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় এডিবি প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের শেয়ারবাজারকে আন্তর্জাতিক মানের এবং বিনিয়োগবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সরকারি প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে সেগুলোর সাথে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন। উভয় পক্ষই আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, এই যৌথ উদ্যোগের ফলে ভবিষ্যতে একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ শেয়ারবাজার গড়ে উঠবে।
ডিএসইতে গতকাল লেনদেনের শীর্ষে ছিল ওরিয়ন ইনফিউশন। ১৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকায় কোম্পানিটির চার লাখ ১০ হাজার শেয়ার হাত বদল হয় গতকাল। ১৪ কোটি পাঁচ লাখ টাকায় ৪৪ লাখ ২৩ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে দিনের দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল সিটি ব্যাংক। ডিএসইর লেণদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে- ইনটেক অনলাইন, লাভোলা আইসক্রিম, ব্র্যাক ব্যাংক, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, সি পার্ল বিচ রিসোর্ট, ব্যাংক এশিয়া, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলস ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক।



