সাবেক ছাত্রলীগ ক্যাডার নিকলীর এসি ল্যান্ড প্রতীক দত্তের দাপট

আলি জামশেদ, নিকলী (কিশোরগঞ্জ)
Printed Edition
সাবেক ছাত্রলীগ ক্যাডার নিকলীর এসি ল্যান্ড প্রতীক দত্তের দাপট
সাবেক ছাত্রলীগ ক্যাডার নিকলীর এসি ল্যান্ড প্রতীক দত্তের দাপট

কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে কর্মরত প্রতীক দত্তকে ঘিরে অভিযোগের যেন শেষ নেই। সাবেক বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক প্রতীক দত্ত ৩৮তম বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তা। অতীতে বুয়েটে শিক্ষক ও ছাত্র পেটানোর ঘটনায় আলোচিত এই কর্মকর্তা বর্তমানে ভূমি প্রশাসনের দায়িত্বে থেকেও অনিয়ম ও অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন।

ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতীক দত্তের বিরুদ্ধে সুবিধার বিনিময়ে ভূমি সেবায় প্রভাব খাটানো, সেবা গ্রহীতাদের কাছ থেকে পরোক্ষভাবে বড় অঙ্কের অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অনেকেই বলেন, তিনি প্রায়ই দম্ভের সাথে নিজের অতীত ‘মাস্তানি’ কর্মকাণ্ডের গল্প করেন এবং দাবি করেন- বদলি ছাড়া তার বিরুদ্ধে কেউ কিছু করতে পারবে না। এতে সেবা গ্রহীতা ও অধীনস্থ কর্মচারীরা আতঙ্কে থাকেন। আইনি জটিলতার ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে অভিযোগ করতেও সাহস পান না।

নিকলীতে যোগদানের আগেই চলতি বছরের ১১ মার্চ গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়া উপজেলায় ঠিকাদার পেটানোর অভিযোগে তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। ঘটনার দুই দিনের মাথায় তিনি নিকলীতে যোগ দেন। স্থানীয়দের দাবি, যোগদানের পর থেকেই তিনি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন এবং ভূমি সেবাকে কেন্দ্র করে ফায়দা লুটের অভিযোগ বাড়তে থাকে। এ বিষয়ে অতীতে জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন গণমাধ্যমেও একাধিক প্রতিবেদন ও ডকুমেন্টারি প্রকাশিত হয়েছে।

সরকার ভূমি সেবায় দুর্নীতি কমাতে ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করলেও নিকলীতে তার সুফল মিলছে না। বরং অসাধু কর্মকর্তাদের কারণে ঘুষ ছাড়া নামজারি ও খারিজ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এসব ঘটনায় সংবাদ প্রকাশ হলে গণমাধ্যমকর্মীদের হেনস্থা করার অভিযোগ রয়েছে।

এসি ল্যান্ডের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রশ্রয়ে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। সরকার নির্ধারিত নামজারি ফি যেখানে এক হাজার ১৭০ টাকা, সেখানে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। দামপাড়া ইউনিয়নের আলিয়াপাড়ার বাসিন্দা বাচ্চু মিয়া অভিযোগ করেন, ওয়ারিশ সূত্রে পাওয়া জমির খারিজ করতে গিয়ে অতিরিক্ত ২০ হাজার টাকা দাবি করেন দামপাড়া ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা নাছিমা আক্তার। কাজ না হওয়ায় পরে সাংবাদিকদের হস্তক্ষেপে অফিস সহকারীর মাধ্যমে টাকা ফেরত পান। তিনিসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা এসি ল্যান্ডের প্রশ্রয়ে প্রকাশ্যে অর্থ লেনদেন করেন। বিনিময়ে মোটা অংকের ভাগ দিতে হয় এসি ল্যান্ডকে।

জারইতলা ইউনিয়নের আঠারবাড়িয়া এলাকার আলী হোসেনের অভিযোগ, আদালতে একাধিক মামলা চলমান থাকা সত্ত্বেও একটি পক্ষ টাকার বিনিময়ে নামজারি করিয়ে নেয়। পরে সংশ্লিষ্ট নায়েব ভিপি বিষয়টিকে ‘মিস্টেক’ হিসেবে স্বীকার করেন।

এ ছাড়া ঘোড়াউত্রা নদীর তীরবর্তী প্রায় ৫০০ একর চরভূমির মধ্যে প্রায় ২০০ একর সরকারি জমি নিয়ে সালিশ ও ভাগাভাগির অভিযোগ ওঠে। এতে সংঘর্ষ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিনা নোটিশে উচ্ছেদ অভিযান চালানোয় সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রতীক দত্ত। তিনি বলেন, অবৈধ উচ্ছেদে নোটিশের প্রয়োজন নেই এবং তিনি কারো কাছ থেকে টাকা নেননি। বরং সরকারি রাজস্ব আদায় বেড়েছে বলে দাবি করেন। এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা বলেন, অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হবে। প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।