দাম বাড়লেও সরবরাহ বাড়েনি সয়াবিন তেলের : চড়া ডিম-মুরগি-সবজির বাজার

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

দাম বাড়ানোর পরও রাজধানীর খুচরা বাজারে স্বাভাবিক হয়নি সয়াবিন তেলের সরবরাহ। নতুন দাম ঘোষণার কয়েক দিন পার হলেও দুয়ারীপাড়া, মিরপুর-৬ ও পল্লবীসহ বিভিন্ন এলাকার বেশির ভাগ দোকানে এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও পুরনো দামের তেলও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। একই সাথে চিনির সরবরাহেও কিছুটা ঘাটতি দেখা দিয়েছে। গত দুই সপ্তাহে চিনির দাম কেজিতে বেড়েছে প্রায় ১০ থেকে ১৫ টাকা।

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নিত্যদিনের খাবারের অন্যতম প্রধান উপকরণ ডিমের দামও উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। রাজধানীর বাজারগুলোতে ফার্মের মুরগির ডিম প্রতি হালি ৫৫ টাকা এবং প্রতি ডজন ১৬৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি ব্রয়লার মুরগি ১৮৫ থেকে ১৯৫ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩২০ থেকে ৩৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সবজির বাজারেও বেশির ভাগ পণ্যের দাম ৮০ থেকে ১২০ টাকা কেজির মধ্যে। ফলে সীমিত আয়ের মানুষের খাদ্য ব্যয় আরো বেড়েছে।

সম্প্রতি বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে পাঁচ টাকা বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা থেকে ২০৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। কিন্তু নতুন দাম নির্ধারণের পরও বাজারে এক লিটারের বোতলজাত তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। বেশির ভাগ দোকানে দুই ও পাঁচ লিটারের বোতল পাওয়া গেলেও এক লিটারের বোতল পাওয়া যাচ্ছে না।

দুয়ারীপাড়া বাজারে খুচরা বিক্রেতা এনামুল হক বলেন, গত বুধবার তেলের নতুন দাম ঘোষণার পরও সরবরাহ বাড়েনি। কোম্পানিগুলো নতুন দামের পণ্য বাজারে না আসা পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবে অর্ডার নিচ্ছে না। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে সরবরাহকারীরা তেল কম দিচ্ছেন। কয়েক দফা অর্ডার দেয়ার পরও অল্প পরিমাণে পণ্য পাওয়া যাচ্ছে। এক মুদি দোকানি মো: তাহের বলেন, একদিকে অর্ডার দিয়েও তেল পাওয়া যাচ্ছে না, অন্য দিকে খুচরা বিক্রেতার কমিশনও কমিয়ে দেয়া হয়েছে। ২০০ টাকার একটি বোতলে আগে যে কমিশন ছিল, তা কমে দেড় টাকার মতো হয়েছে। বিভিন্ন বাজারে ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে সরবরাহ সঙ্কট থাকায় অনেক দোকানি প্রয়োজন অনুযায়ী তেল সংগ্রহ করতে পারছেন না। ফলে দাম বাড়ানোর পরও ভোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী এক লিটারের বোতলজাত তেল পাওয়া যাচ্ছে না।

এ দিকে ডিমের বাজারেও স্বস্তি ফেরেনি। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে প্রতি ডজন ফার্মের মুরগির ডিম ১৬৫ টাকা এবং চারটি ৫৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ খুচরা হিসাবে প্রতিটি ডিমের দাম পড়ছে প্রায় ১৪ টাকা। কয়েক দিন আগেও একডজন ডিম একসাথে কিনলে কিছুটা কম দামে দেয়ার প্রবণতা ছিল। এখন সেই সুযোগও কমে গেছে।

মিরপুর-৬ বাজারের ডিম বিক্রেতা মাসুম বলেন, ফার্মের মুরগির ডিম এখন হালি ৫৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। দাম বাড়ছে, কিন্তু কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এ দিকে মুরগির বাজারে অবশ্য গত সপ্তাহের তুলনায় বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। ব্রয়লার মুরগি ১৮৫ থেকে ১৯৫ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩২০ থেকে ৩৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। গরুর গোশত আগের দামেই রয়েছে। প্রতি কেজি গরুর গোশতের দাম প্রায় ৮০০ টাকা।

সবজির বাজারে পণ্যের ধরন ও বাজারভেদে দামের পার্থক্য থাকলেও বেশির ভাগ সাধারণ সবজির দামই চড়া। পল্লবী বাজারে বেগুন, করলা, বরবটি, ঢেঁড়স, পটল ও কাঁকরোল ৮০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। লম্বা বেগুন ১০০ টাকা, গোল বেগুন ১২০ টাকা এবং টমেটো ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বরবটি, ঝিঙে ও করলার দাম প্রায় ৮০ টাকা কেজি।

এ দিকে শসা তুলনামূলক কম দামে ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি পাওয়া গেলেও দেশী শসার দাম ৮০ থেকে ১০০ টাকা। আগাম শিমের দাম আরো বেশি- কেজি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। পেঁপে তুলনামূলক কম দামে ৪০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। লাউ প্রতি পিস ৫০ থেকে ৭০ টাকা এবং কচুরমুখি ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

তবে বাজারভেদে কয়েকটি সবজির দাম কিছুটা কমার তথ্যও পাওয়া গেছে। ঝিঙা ৭০ থেকে ৮০ টাকা, চিচিঙ্গা ৫০ থেকে ৬০ টাকা, পেঁপে ৩০ থেকে ৪০ টাকা, দেশি লাউ ৫০ থেকে ৭০ টাকা, কচুরমুখি ৬০ থেকে ৮০ টাকা, করলা ৬০ থেকে ৮০ টাকা এবং ছোট পটল ও ঢেঁড়স ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, কাঁচা মরিচের দামেও বাজারভেদে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। কোথাও ৮০ থেকে ১২০ টাকা কেজিতে পাওয়া গেলেও কোথাও আবার ১২০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা কেজি হয়েছে। একইভাবে পেঁয়াজের দাম কোথাও কিছুটা কমে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কেজি হয়েছে।

বাজারে দেখা যায়, শাকের বাজার তুলনামূলক স্বস্তিতে রয়েছে। লালশাক ও কলমিশাক ১০ টাকা আঁটি, ডাঁটাশাক ৩০ থেকে ৪০ টাকা, পুঁইশাক ৩০ থেকে ৫০ টাকা, লাউশাক ৪০ থেকে ৬০ টাকা এবং কচুশাক ২৫ থেকে ৩০ টাকা আঁটি দরে বিক্রি হচ্ছে।

বিভিন্ন বাজারে ক্রেতারা বলছেন, বাজারে একসাথে বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় সংসারের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। দুয়ারীপাড়া বাজারে ক্রেতা আবু দাউদ বলেন, প্রায় সব সবজির দামই বেড়েছে। কমপক্ষে ১০ টাকা করে বাড়তি গুনতে হচ্ছে। ৮০ টাকার নিচে অনেক সবজি পাওয়া যাচ্ছে না। টমেটো, বেগুন ও করলার মতো সাধারণ সবজি কিনতেও ১০০ টাকার বেশি দিতে হচ্ছে। সীমিত আয়ের মানুষের পক্ষে মাছ, সবজি ও চাল- সব একসাথে কেনা কঠিন।

মাছের বাজারেও খুব একটা স্বস্তি নেই। বাজারে তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা, পাঙাশ ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা, রুই-কাতলা ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকা এবং চিংড়ি এক হাজার থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, বড় আকারের রুই ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা, ট্যাংরা প্রায় ৭০০ টাকা, ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, বাইম ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং দেশী কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

চাষের কই প্রায় ৩০০ টাকা, পোয়া ২৬০ টাকা এবং শোল মাছ ৭০০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যাচ্ছে। আকারভেদে চাষের শিং মাছের দাম ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা। মাঝারি আকারের রুই ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আর দেশী ও তুলনামূলক চাহিদাসম্পন্ন কিছু মাছের দাম কেজিতে হাজার টাকার ওপরে।

মিরপুর-৬ বাজারের মাছ বিক্রেতা মফিজুল ইসলাম বলেন, মাছের দাম মূলত আকার, মান, সরবরাহ এবং জীবিত না মৃত- এসব বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। একই ধরনের মাছের ক্ষেত্রেও বাজারভেদে প্রতি কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত পার্থক্য থাকে। সরবরাহ কম থাকলে বা বড় মাছের চাহিদা বাড়লে দাম আরো বাড়ে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীর খুচরা বাজারে একদিকে ভোজ্যতেলের সরবরাহ সঙ্কট, অন্য দিকে ডিম, মাছ ও বিভিন্ন সবজির উচ্চ মূল্য ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। তেলের দাম বাড়ানোর পরও সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ায় বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একই সাথে নিত্যপণ্যের সরবরাহ ও দামের ওপর কার্যকর নজরদারি বাড়ানোর জন্য তারা দাবি জানিয়েছেন।