বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কৌশলগত পুনর্বিন্যাস চলছে, তা কেবল অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার প্রশ্ন নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে একটি বড় পরীক্ষার ক্ষণ। এই পরীক্ষার কেন্দ্রে রয়েছে তিনটি শক্তি- বাংলাদেশের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তিগুলো, আঞ্চলিক প্রভাবশালী ভারত এবং বৈশ্বিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্র। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পুনর্গঠনে ভারত কী ধরনের বন্দোবস্ত চায়, আওয়ামী লীগের পরিবর্তিত অবস্থানকে দিল্লি এখন কিভাবে দেখছে এবং এই পুরো প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা ভারত কতটা মেনে নিতে প্রস্তুত।
ভারতের দৃষ্টিতে পুনর্গঠন : ক্ষমতার পালাবদল নয়, নিয়ন্ত্রিত ধারাবাহিকতা
ভারত বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো আকস্মিক বা বিপ্লবী পরিবর্তনের পক্ষে নয়। দিল্লির কৌশল বরাবরই তাদের নিয়ন্ত্রিত স্থিতিশীলতা-কেন্দ্রিক। তাদের কাছে গণতন্ত্র একটি নৈতিক আদর্শের চেয়ে বেশি ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন। ভারতের মূল উদ্বেগ- বাংলাদেশে এমন একটি সরকার ও রাজনৈতিক কাঠামো থাকা যা পূর্বানুমেয়, নিরাপত্তা-সহযোগিতামুখী এবং তাদের অনুকূল আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য যাতে নষ্ট না করে।
এই কারণেই ভারত এমন কোনো রাজনৈতিক পুনর্গঠন চায় না, যেখানে হঠাৎ করে নতুন, অপ্রত্যাশিত শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসে। ভারতের কাঙ্ক্ষিত মডেল হলো- বহুদলীয় রাজনীতি থাকবে, নির্বাচন হবে, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাও থাকবে; কিন্তু তাদের অনুকূল রাষ্ট্রের মৌলিক কৌশলগত দিকনির্দেশনা যেন বদলে না যায়। একে বলা যায় ‘নিয়ন্ত্রিত বহুদলীয়তা’। ভারতের চোখে আসন্ন নির্বাচন মানে কেবল সরকার গঠন নয়, বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চরিত্র কতটা নিয়ন্ত্রণযোগ্য থাকবে তার একটি পরীক্ষা।
আওয়ামী লীগ : অপরিহার্য মিত্র থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বোঝা : দীর্ঘ সময় ধরে আওয়ামী লীগ ছিল ভারতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদার, এক ধরনের কৌশলগত রাজনৈতিক সম্পদ। নিরাপত্তা সহযোগিতা থেকে শুরু করে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিদ্রোহ দমন, ট্রানজিট ও অবকাঠামো সুবিধা- সবখানেই শেখ হাসিনার সরকার দিল্লির কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করেছে। কিন্তু ২০২৪ সালের বিপ্লব বা গণ-অভ্যুত্থান সেই সমীকরণ ভেঙে দিয়েছে।
বর্তমান বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ ভারতের কাছে আর নিঃশর্ত সম্পদ নয়। বরং এটি হয়ে উঠেছে দ্বিমুখী এক সমস্যা। এক দিকে দলটির সাথে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও সম্পর্ক রয়েছে, অন্য দিকে আওয়ামী লীগের বৈধতা সঙ্কট ভারতের জন্য কূটনৈতিক বোঝা তৈরি করছে। দিল্লি বুঝতে পারছে- আগের মতো প্রকাশ্যভাবে আওয়ামী লীগের পাশে দাঁড়ালে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী জনমত আরো তীব্র হবে, পাশাপাশি পশ্চিমা শক্তির সাথেও সঙ্ঘাত বাড়বে।
এই কারণে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গিতে আওয়ামী লীগের ভূমিকা বদলেছে। এখন দিল্লি চায় আওয়ামী লীগ টিকে থাকুক, কিন্তু সাময়িকভাবে দুর্বল ও নিয়ন্ত্রিত অবস্থায়। একক ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক ভারসাম্যের একটি উপাদান হিসেবে। ভারতের কাছে আওয়ামী লীগ এখন এক ধরনের ‘ব্যাকআপ অপশন’- যা পুরোপুরি পরিত্যাজ্য নয়, আবার একমাত্র ভরসাও নয়।
ভারতের কৌশলগত মহলে এমন ধারণাও জোরালো হচ্ছে যে শেখ হাসিনা-পরবর্তী আওয়ামী লীগ হয়তো ভারতের জন্য বেশি সুবিধাজনক হতে পারে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসন ও দমনমূলক রাজনীতি দলটিকে যেমন জনবিচ্ছিন্ন করেছে, তেমনি ভারতকেও ‘স্বৈরাচারের পৃষ্ঠপোষক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাই দিল্লির আগ্রহ আওয়ামী লীগের ভেতরে নেতৃত্ব ও ভাষ্যের পরিবর্তন এবং ভবিষ্যতে জোট বা সমঝোতাভিত্তিক রাজনীতিতে দলটির অভ্যস্ত হওয়া।
তবে ভারত আওয়ামী লীগের সম্পূর্ণ পতনও কোনোভাবে চায় না। কারণ রাষ্ট্রের প্রশাসন, আমলাতন্ত্র ও নিরাপত্তা কাঠামোয় দলটির গভীর প্রভাব রয়েছে। হঠাৎ ভেঙে পড়লে যে শূন্যতা তৈরি হবে, তা চীনের প্রভাব বা অপ্রত্যাশিত গণরাজনীতির উত্থানের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করে ভারত।
বিএনপি ও নতুন শক্তি : শর্তাধীন গ্রহণযোগ্যতা
ভারতের কাছে বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে সন্দেহজনক দল। তবুও বাস্তবতার চাপে দিল্লি বুঝছে বিএনপিকে বাদ দিয়ে কোনো গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। ফলে ভারতের অবস্থান এখন শর্তযুক্ত। বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারে, যদি তারা ভারতবিরোধী ভাষ্য নিয়ন্ত্রণে রাখে, নিরাপত্তা সহযোগিতায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখে এবং চীন-পাকিস্তান অক্ষের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে না পড়ে।
একই সাথে ভারত সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত নতুন রাজনৈতিক শক্তি ও গণ-আন্দোলনের উত্থান নিয়ে। ২০২৪ সালের আন্দোলন দেখিয়েছে এই শক্তিগুলো ঐতিহ্যবাহী ভারতপন্থী নেটওয়ার্কের বাইরে। তাদের সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও পররাষ্ট্র ভারসাম্যের ভাষ্য ভারতের আঞ্চলিক আধিপত্যের ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক। তাই দিল্লি নতুন শক্তির (পড়–ন ইসলামভিত্তিক ও আধিপত্যবিরোধী জাতীয়তাবাদী) দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ চায় না।
যুক্তরাষ্ট্র : প্রয়োজনীয়, কিন্তু সীমিত
এই পুরো সমীকরণে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ভারতের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রশ্ন। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিকপর্যায়ে ঘনিষ্ঠ অংশীদার হলেও বাংলাদেশ প্রশ্নে তাদের অগ্রাধিকার এক নয়। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে মানবাধিকার, নির্বাচন ও রাজনৈতিক মুক্ত পরিসরকে সামনে রাখে, ভারত সেখানে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেয়।
ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি বাইরে রাখতে চায় না, বলা যায় পারে না। জুলাই-আগস্ট ২৪-এর পর ওয়াশিংটনের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন আনার ব্যাপারে দিল্লির গুরুতর একাধিক প্রচেষ্টা সফল হয়নি। এ কারণে বাংলাদেশ প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে, গভীর ক্ষমতা বলয় ও শীর্ষ প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণকে পরিবর্তনের চেষ্টা দিল্লি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। সে প্রচেষ্টায় মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কৌশলগত মিত্র একটি দেশের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। দিল্লির নীতি প্রণেতারা বিশ^াস করেন, ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্র কৌশল পরিবর্তনে আইপ্যাক লবির মতো কার্যকর সহযোগিতা আর কেউ সেভাবে করতে পারে না।
এসব নীতি প্রণেতা আরো মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি নির্বাচনকে আন্তর্জাতিক বৈধতা দেয় এবং চরম অস্থিতিশীলতা ঠেকাতে সহায়ক হতে পারে। এ জন্য বাংলাদেশ প্রশ্নে দিল্লির পরিকল্পনায় ওয়াশিংটনের সায় চায় ভারত। তবে দিল্লি চায় বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের এই সম্পৃক্ততা সীমিত ও পরোক্ষ হোক। ভারতের কাছে যুক্তরাষ্ট্র গ্রহণযোগ্য একটি ‘লেজিটিমেসি প্রোভাইডার’, কিন্তু ‘ডিসিশন মেকার’ নয়। এ কারণে বিগত সরকারের দেড় দশকের বেশি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কৌশলগত স্বার্থ বাস্তবায়নে দিল্লি বাধাও তৈরি করেছে। এমনকি বঙ্গোপসাগরে বাইরের শক্তির প্রবেশাধিকার রোধ করার নামে যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে রাখতে দিল্লি-বেইজিং সমঝোতার কথাও জানা যায়। যুক্তরাষ্ট্র বার্মা আইন বাস্তবায়নে ১৩ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখলেও দেশ দু’টির অবস্থান এর বিপরীত এবং কাছাকাছি- সামরিক জান্তাকে সহযোগিতাকেন্দ্রিক।
বাংলাদেশে অতিরিক্ত মার্কিন সক্রিয়তা ভারতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি কারণে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত নাগরিকসমাজ ও সংস্কারপন্থী গোষ্ঠীর প্রতি সহানুভূতিশীল, যাদের ওপর ভারতের প্রভাব কম। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ যদি ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব প্রতিযোগিতার মঞ্চে পরিণত হয়, তাহলে দিল্লির আঞ্চলিক নেতৃত্ব প্রশ্নের মুখে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো শক্তিশালী দেখতে চায়, যা দিল্লির আকাক্সক্ষার বিপরীত।
তবে চরমপন্থা প্রতিরোধ, সামরিক শাসন এড়ানো এবং বঙ্গোপসাগরে চীনের পূর্ণ আধিপত্য ঠেকানোর কিছু প্রশ্নে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ মিলিত। এই জায়গাগুলোতেই দিল্লি সীমিত মার্কিন ভূমিকা মেনে নিতে প্রস্তুত।
বাংলাদেশের সামনে মূল দ্বন্দ্ব
সবমিলিয়ে বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারতের কাক্সিক্ষত রাজনৈতিক পুনর্গঠন মানে ‘বহুদলীয় কাঠামো থাকবে, কিন্তু আদর্শিক পরিসর সীমিত। নির্বাচন হবে, কিন্তু ফলাফল যেন দিল্লির জন্য কৌশলগতভাবে ‘নিরাপদ’ থাকে। আওয়ামী লীগ থাকবে, কিন্তু দুর্বল নির্ভরশীল অবস্থায়। বিএনপি আসতে পারে, কিন্তু শর্তসাপেক্ষে। যুক্তরাষ্ট্র থাকবে, কিন্তু ব্যাকস্টেজে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে মূল প্রশ্ন দাঁড়ায়- দেশ কি নিজস্ব রাজনৈতিক পুনর্গঠন নিজেই নির্ধারণ করবে, নাকি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির সমঝোতার ফল হিসেবে একটি ব্যবস্থাপিত গণতন্ত্রে আবদ্ধ থাকবে? আসন্ন নির্বাচন সেই প্রশ্নের আংশিক উত্তর দেবে। কিন্তু চূড়ান্ত উত্তর নির্ভর করবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলো কতটা স্বাধীনভাবে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে তার ওপর। রাজনৈতিক শক্তির পাশাপাশি রাষ্ট্রের মৌলিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।



