বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদন

বেনামী শেয়ারে ইস্টার্ন ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ

ব্যাংক কোম্পানি আইনে একজন ব্যক্তি বা একই পরিবারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কোনো ব্যাংকের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ না থাকলেও ইস্টার্ন ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান পরিচালক মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে বেনামে ২০.৪৮ শতাংশ শেয়ার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে শওকতের দৃশ্যমান পারিবারিক মালিকানার বাইরে অন্তত দু’টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আরো বড় অংশের শেয়ার তার নিয়ন্ত্রণে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। পরিদর্শন দল এসব প্রতিষ্ঠানকে প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকের আড়াল হিসেবে চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করলেও কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

  • তদন্তে উঠে এসেছে আরুসা ও আনিকা শেয়ারসের ভূমিকা
  • ১ লাখ টাকা মূলধন থেকে ৩০০ কোটির বেশি শেয়ার

ব্যাংক কোম্পানি আইনে একজন ব্যক্তি বা একই পরিবারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কোনো ব্যাংকের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ না থাকলেও ইস্টার্ন ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান পরিচালক মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে বেনামে ২০.৪৮ শতাংশ শেয়ার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে শওকতের দৃশ্যমান পারিবারিক মালিকানার বাইরে অন্তত দু’টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আরো বড় অংশের শেয়ার তার নিয়ন্ত্রণে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। পরিদর্শন দল এসব প্রতিষ্ঠানকে প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকের আড়াল হিসেবে চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করলেও কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সাল পর্যন্ত শওকত আলী ও তার পরিবারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মালিকানা মিলিয়ে ইস্টার্ন ব্যাংকে তার নিয়ন্ত্রণ ছিল ২১.১০ শতাংশ। সাম্প্রতিক পরিদর্শনে এই নিয়ন্ত্রণ ২০.৪৮ শতাংশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। দৃশ্যমান পারিবারিক শেয়ারের পাশাপাশি আরুসা অ্যান্ড কোং (প্রাইভেট) লিমিটেড এবং আনিকা শেয়ারস অ্যান্ড সিকিউরিটিজ নামের দু’টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শওকতের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের তথ্য পাওয়া যায়।

এক লাখ টাকা মূলধন থেকে ৩০০ কোটির বেশি শেয়ার : পরিদর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উঠে এসেছে আরুসা অ্যান্ড কোংয়ের ভূমিকা। ২০০১ সালে মাত্র এক লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি নিবন্ধনের মাত্র ১৭ দিনের মাথায় ইস্টার্ন ব্যাংকের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শেয়ার ধারণ করে। পরবর্তীতে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ না করে প্রতিষ্ঠানটি মূলত ইস্টার্ন ব্যাংকের শেয়ার সংগ্রহ করে। ক্রয় ও স্টক ডিভিডেন্ড মিলিয়ে আরুসার হাতে ইস্টার্ন ব্যাংকের ১৫ কোটি ৯১ লাখ ৫৩ হাজার ২৯২টি শেয়ার জমা হয়, যা ব্যাংকটির মোট পরিশোধিত মূলধনের প্রায় ৯.৯৭ শতাংশ। বর্তমান বাজারদরে এসব শেয়ারের মূল্য ৩০০ কোটি টাকারও বেশি। পরিদর্শনকালে আরুসার পোর্টফোলিওতে ইস্টার্ন ব্যাংক ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানির শেয়ার পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দলের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নিয়মিত শেয়ার কেনাবেচা করে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে নয়, বরং ইস্টার্ন ব্যাংকের শেয়ার নিয়ন্ত্রণে রাখাই ছিল এই বিনিয়োগের প্রকৃত উদ্দেশ্য।

আর্থিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন

আরুসার আর্থিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে পরিদর্শন দল। মাত্র এক লাখ টাকা মূলধনের কোম্পানিটি ২০০৩ অর্থবছরেই প্রায় তিন কোটি ৮০ লাখ টাকা মুনাফা এবং এক কোটি ২০ লাখ টাকার ক্যাপিটাল রিজার্ভ দেখায়। এত অল্প মূলধনের একটি প্রতিষ্ঠানের এত দ্রুত বিপুল মুনাফা ও রিজার্ভ গঠনকে প্রতিবেদনে অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নামে থাকা শেয়ারের অর্থের উৎস নিয়েও অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। ২০০২ সালে শেয়ার কেনার অর্থের উৎস হিসেবে আরুসার হিসাবের ‘ভেন্ডরস অ্যাকাউন্টে’ ছয় কোটি ৭১ লাখ টাকা দেখানো হয়েছিল। তবে কোম্পানিটির নিজস্ব মূলধন, নঈমুল হকের আর্থিক সক্ষমতা এবং শওকতের সাথে তার সম্পর্ক- সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে অর্থের প্রকৃত উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলে পরিদর্শন দল।

কাগজে মালিক নঈমুল, নিয়ন্ত্রণ শওকতের

আরুসা প্রতিষ্ঠার সময় এক হাজার শেয়ারের মধ্যে ৯৫০টি ছিল নঈমুল হকের নামে। বাকি ৫০টি ছিল শওকতের শ্যালিকা আনিকা তাহজীবের নামে। নথি অনুযায়ী, নঈমুল হক শওকতের নিজস্ব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এসএন করপোরেশনের সাথে যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংক নঈমুলের আয়কর বিবরণী পর্যালোচনা করে এমন কোনো সম্পদ বা আয়ের উৎস পায়নি, যার মাধ্যমে তার পক্ষে ইস্টার্ন ব্যাংকের এত বিপুল শেয়ার কেনা বা বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করা সম্ভব ছিল বলে ব্যাখ্যা করা যায়। এ ছাড়া ২০১৪ সালে আরুসার পাঁচ হাজার শেয়ার শওকতের মেয়ে জারা নামীরের নামে বরাদ্দ দেয়া হয়। ২০১৭ সালের ২০ জুলাই পর্যন্ত শেয়ারগুলো তার নামেই ছিল। পরে সেগুলো নঈমুল হকের স্ত্রীর নামে হস্তান্তর করা হলেও শওকতের আয়কর নথিতে এসব শেয়ারের তথ্য দেখানো হয়নি। পরিদর্শন দল মনে করে, এসব শেয়ারও কার্যত শওকতের নিয়ন্ত্রণেই ছিল।

আরুসা থেকে শওকতের পরিবারের কাছে অর্থপ্রবাহ

শুধু মালিকানার কাঠামো নয়, আরুসা থেকে শওকত ও তার পরিবারের প্রতিষ্ঠানে অর্থপ্রবাহের তথ্যও পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। নথি অনুযায়ী, ২০১৩ সালে জমির বায়না বাবদ আরুসা থেকে ব্যক্তিগতভাবে ৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা নেন শওকত। কিন্তু ১৩ বছর পরও ওই জমি প্রতিষ্ঠানটির কাছে হস্তান্তরের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ২০২৪ সালে আরুসা থেকে আরো ২৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা যায় এসএন করপোরেশনে। প্রতিষ্ঠানটির ৫০ শতাংশ মালিক শওকত এবং বাকি ৫০ শতাংশ তার স্ত্রী তাসমিয়া আম্বরিন। অর্থাৎ কাগজে শওকতের মালিকানাধীন না থাকা একটি প্রতিষ্ঠান থেকে তার ও পরিবারের প্রতিষ্ঠানে অন্তত ৩৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। পরিদর্শন দল এই অর্থপ্রবাহকেও বেনামী নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করেছে।

আনিকা শেয়ারসেও পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ

শওকতের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের আরেকটি মাধ্যম হিসেবে আনিকা শেয়ারস অ্যান্ড সিকিউরিটিজকে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির হাতে ইস্টার্ন ব্যাংকের ১.১৪ শতাংশ শেয়ার ছিল। পরবর্তী সময়ে এই অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। কোম্পানিটির ৯৮ শতাংশ শেয়ারের মালিক জসিম উদ্দিন এবং ২ শতাংশের মালিক শওকতের শ্যালিকা আনিকা তাহজীব। আনিকা এর আগে আরুসা অ্যান্ড কোংয়ের শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালকও ছিলেন। বিভিন্ন নথিতে আনিকা, শওকত ও তার পরিবারের সদস্যদের একই ঠিকানা ব্যবহারের তথ্যও পাওয়া গেছে। এসব পারিবারিক ও ব্যবসায়িক যোগসূত্র বিবেচনায় নিয়ে আনিকা শেয়ারসের মাধ্যমে থাকা ইস্টার্ন ব্যাংকের শেয়ারের ওপরও শওকতের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

আইনে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ থাকলেও নীরব কেন্দ্রীয় ব্যাংক

ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৪ক ধারায় কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা একই পরিবারের সদস্যদের একক বা যৌথভাবে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে কোনো ব্যাংকের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণের সুযোগ নেই। শেয়ার কেনার সময় ক্রেতাকে ঘোষণা দিতে হয় যে তিনি অন্য কারও মনোনীত ব্যক্তি বা বেনামী হিসেবে শেয়ার কিনছেন না। মিথ্যা ঘোষণা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট শেয়ার বাজেয়াপ্তসহ ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে অতিরিক্ত ও বেনামী শেয়ারের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। ব্যাংকের মালিকানা ও শেয়ারসংক্রান্ত বিষয় ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-২-এর আওতাধীন হওয়ায় ওই বিভাগকে শওকতের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তাবও দেয়া হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৬ ধারায় নির্দিষ্ট অনিয়মে কোনো পরিচালককে অপসারণের ক্ষমতাও বাংলাদেশ ব্যাংকের রয়েছে। অপসারণের পর তিন বছর পর্যন্ত তাকে আর্থিক খাতের ব্যবস্থাপনায় যুক্ত থাকার সুযোগ না দেয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু এতসব তথ্য ও সুপারিশের পরও শওকতের বিরুদ্ধে কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি- এখন সেটিই বড় প্রশ্ন। এর পাশাপাশি বিশেষ পরিদর্শনে শওকতের সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং যুক্তরাজ্যে শনাক্ত ২৫ মিলিয়ন ডলার উদ্ধারে ব্যর্থতার বিষয়ও উঠে এসেছে। এসব বিষয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে আরো তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে শওকতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শেয়ার নিয়ন্ত্রণ, অর্থের উৎস, পারিবারিক ব্যবসায়িক সম্পর্ক এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠে এসেছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো- আইনে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেন এত দিনেও সেই প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়নি।