ইরানে ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রণে সিনেটে বিল পাস

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে অথবা পরবর্তী যেকোনো পদক্ষেপ নেয়ার আগে কংগ্রেসের অনুমতি বাধ্যতামূলকের বিধান রেখে মার্কিন পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটে একটি বিল পাস হয়েছে। আলজাজিরা জানায়, স্থানীয় সময় গত মঙ্গলবার সিনেটে ৫০-৪৮ ভোটে এই বিল অনুমোদিত হয়। এর আগে চলতি মাসের শুরুর দিকে বিলটি নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে ২১৫-২০৮ ভোটে পাস হওয়ার পর সিনেটে পাঠানো হয়েছিল।

সিনেটে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও চারজন রিপাবলিকান সিনেটর ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ভোট দেয়ায় বিলটি পাস হয়। তারা হলেন- লুইজিয়ানার বিল ক্যাসিদি, আলাস্কার লিসা মুরকোওস্কি, মেইনের সুসান কলিন্স ও কেন্টাকির র‌্যান্ড পল। এ ছাড়া কেন্টাকির মিচ ম্যাককনেল ও পেনসিলভেনিয়ার ডেভ ম্যাককরমিক নামে দুই রিপাবলিকান সিনেটর ভোটদানে বিরত ছিলেন। অন্য দিকে পেনসিলভেনিয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন ফেটারম্যান বিলটির বিপক্ষে অবস্থান নেন। তবে সিনেটে অনুমোদন পেলেও এ উদ্যোগ ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ পুরোপুরি বন্ধ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের সংশয় রয়েছে। কারণ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই বিলে ভেটো দিতে পারেন। আর সেই ভেটো বাতিল করতে হলে পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে দু-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনের প্রয়োজন হবে।

ভোটাভুটি শেষে সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের শীর্ষনেতা চাক শুমার বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সামরিক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে আনতে এটি ছিল সিনেটের দশম প্রচেষ্টা এবং শেষমেশ ‘যুদ্ধক্ষমতাসংক্রান্ত’ প্রস্তাবটি পাস হলো। তিনি আরো বলেন, ট্রাম্প বছরের পর বছর ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষ পর্যন্ত এক বিপর্যয়কর যুদ্ধের মাধ্যমে মার্কিন জনগণের ওপর সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিভ্রান্তি, বিশৃঙ্খলা ও মূল্য চাপিয়ে দিয়েছেন। উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে যুদ্ধ শুরু করে। বর্তমানে সেই যুদ্ধ বন্ধে দুই দেশের প্রেসিডেন্ট একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছেন। সেই অনুযায়ী পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় সুইজারল্যান্ডে দু’পক্ষের শান্তি আলোচনা চলছে, যার লক্ষ্য ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি সম্পন্ন করা।

মিত্রদের উদ্বেগ প্রশমনে মধ্যপ্রাচ্যে রুবিও

রয়টার্স জানায়, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সাম্প্রতিক সমঝোতাচুক্তি নিয়ে উপসাগরীয় মিত্রদের অসন্তোষ ও উদ্বেগ দূর করতে আনুষ্ঠানিকভাবে মধ্যপ্রাচ্য সফর শুরু করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। গতকাল বুধবার তার এই কূটনৈতিক সফর শুরু হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্বাক্ষরিত এই চুক্তি পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে তাদের একসময়কার আঞ্চলিক ‘শত্রুর’ প্রতি ‘অতিরিক্ত উদারতার’ মতো মনে হচ্ছে। তিন দিনের উপসাগরীয় সফরের অংশ হিসেবে মঙ্গলবার স্থানীয় সময় গভীর রাতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে পৌঁছান রুবিও। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে ইরানের চার মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে গত সপ্তাহে স্বাক্ষরিত চুক্তির পর- এটিই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সফর।

আবুধাবিতে পৌঁছানোর পর এই চুক্তি নিয়ে মিত্রদের অস্বস্তি দূর করার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে রুবিও সাংবাদিকদের বলেন, ‘আলোচনায় অবশ্যই এ বিষয়টি উঠবে।’ তিনি আরো জানান, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতাস্মারকে উল্লেখ নেই এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়েও দ্বিপক্ষীয় স্তরে আলোচনা হবে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানসংক্রান্ত আলোচনা থেকে মার্কিন শীর্ষ কূটনীতিক রুবিও অনেকটাই আড়ালে ছিলেন। তার পরিবর্তে রোববার সুইজারল্যান্ডে ইরানি প্রতিনিধিদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় মার্কিন পক্ষের নেতৃত্ব দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। একসময় ইরানের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নেয়া রুবিও এখন কিভাবে মিত্রদের কাছে এই চুক্তিকে উপস্থাপন করেন, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কারণ অনেক রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাই মনে করছেন, এই চুক্তি মূলত তেহরানের কাছে ট্রাম্প প্রশাসনের একধরনের নতিস্বীকার। রুবিও ও ভ্যান্স, দু’জনই সাবেক মার্কিন সিনেটর। রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উত্তরসূরি হওয়ার দৌড়ে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তাদের জোরালো অবস্থান রয়েছে।

রুবিওর এবারের সফরটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ট্রাম্পের দৃঢ় সমর্থনপুষ্ট এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির প্রতি সমর্থন দেয়ার পাশাপাশি তাকে চুক্তির শর্ত নিয়ে সন্দিহান উপসাগরীয় মিত্রদের আশ্বস্ত করতে হবে।

চার মাসব্যাপী সঙ্ঘাতের সময় উপসাগরীয় নেতারা বারবার শান্তির আহ্বান জানালেও সমঝোতাচুক্তির চূড়ান্ত শর্ত দেখে তারা চমকে গেছেন এবং একই সাথে হতাশ হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আরব মিত্রদের প্রধান শঙ্কা হলো, ইরান এই ৩০ হাজার কোটি ডলারের পুনর্গঠন তহবিল তার সামরিক শক্তি নতুন করে বাড়াতে ব্যবহার করতে পারে।

এ ছাড়া এই চুক্তিতে তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে কোনো কথা বলা হয়নি, যা উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। যেহেতু যুদ্ধের সময় এই দেশগুলো ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সরাসরি আঘাতের শিকার হয়েছিল। রুবিও তার এই সফরে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সামরিক ঘাঁটি থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত পরিদর্শনে যাচ্ছেন, যেখানে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বেসামরিক নাগরিক নিহত ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। যুদ্ধের কারণে তেলবহির্ভূত অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হাজার হাজার প্রবাসী পালিয়ে যাওয়ায় বিশেষ করে আরব আমিরাত এখন তীব্র অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়েছে। এর ফলে আক্রমণকারী দেশের এত কাছাকাছি থাকা একটি বিকাশমান বৈশ্বিক আর্থিক কেন্দ্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।

যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে মার্কিনিদের সংশয়

রয়টার্স আরো জানায়, ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে মনে করছেন বেশির ভাগ মার্কিন নাগরিক। একই সাথে, প্রতি চারজন মার্কিনির মধ্যে মাত্র একজন মনে করেন যে ইরান যুদ্ধের পেছনে যে বিপুল খরচ হয়েছে, সেই তুলনায় প্রাপ্তি বা লাভ বেশি। রয়টার্স ও জরিপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইপসোসের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত নতুন এক জনমত জরিপে এই চিত্র উঠে এসেছে।

গত সোমবার শেষ হওয়া পাঁচ দিনব্যাপী এই জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, ইরান যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায়। তার প্রতি জনগণের সমর্থনের হার হ্রাস পেয়ে ৩৪ শতাংশে নেমে এসেছে, যা তার দ্বিতীয় মেয়াদে সর্বনিম্ন। এর আগে গত এপ্রিলেও তার জনপ্রিয়তা একই স্তরে নেমেছিল। জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ২৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন যুদ্ধের আগের তুলনায় বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। এমনকি ট্রাম্পের নিজের দল রিপাবলিকানের সমর্থকদের মধ্যেও এই ধারণা খুব একটা জোরালো নয়; মাত্র ৫০ শতাংশ রিপাবলিকান মনে করেন দেশের অবস্থান আগের চেয়ে শক্তপোক্ত হয়েছে। বিপরীতে, ৩৫ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন যুক্তরাষ্ট্র এখন আগের চেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। অন্যরা এ বিষয়ে নিশ্চিত নন কিংবা মনে করেন পরিস্থিতির কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেনি।

গত ১৭ জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি প্রাথমিক চুক্তি বা সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল যুদ্ধের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া তেল ও গ্যাস পরিবহনের কৌশলগত সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী আবার চালু করা এবং ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ কিছুটা শিথিল করা। চুক্তি স্বাক্ষরের পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত কমলেও, সাধারণ মার্কিনিদের জন্য পেট্রোলের দাম এখনো গত ২৮ ফেব্রুয়ারির আগের চেয়ে অনেক বেশি। উল্লেখ্য, ওই দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার মাধ্যমে এই ইরান যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারির সেই হামলার পরপরই ইরান পাল্টা আঘাত হেনে হরমুজ প্রণালী কার্যত অবরুদ্ধ করে দেয়, যার ফলে বিশ্বের মোট তেল-বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর বেশ কিছু জ্বালানি স্থাপনায় ইরানি হামলায় ক্ষতি হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা ও সরবরাহ নিয়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়। রয়টার্স/ইপসোসের জরিপে অংশ নেয়া অর্ধেক মানুষই মনে করেন, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মোটেও সার্থক ছিল না। আর মাত্র ২৪ শতাংশ মানুষ এই যুদ্ধকে লাভজনক বলে মনে করেন।

জরিপের উপাত্ত অনুযায়ী, ৬৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিকের ধারণা, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সই করা এই চুক্তি দুই দেশের মধ্যে স্থায়ী শান্তি আনতে ব্যর্থ হবে। রিপাবলিকানদের প্রায় অর্ধেক এবং প্রতি ১০ জন ডেমোক্র্যাটের মধ্যে আটজনই এই চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে সন্দিহান। বিপরীতে, মাত্র ১৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিক (১০ শতাংশ ডেমোক্র্যাট ও ৩৪ শতাংশ রিপাবলিকান) দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা দেখছেন। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প মূলত মূল্যস্ফীতি কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যয়বহুল বিদেশী যুদ্ধ থেকে দূরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জয়লাভ করেছিলেন। একজন সফল রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী, চুক্তি-সম্পাদনকারী ও রিয়েলিটি টিভি তারকা হিসেবে পরিচিত ট্রাম্পের মূল রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল এসব প্রতিশ্রুতিই। তবে বর্তমানে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তার প্রতি জনসমর্থন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। জরিপে দেখা গেছে, জীবনযাত্রার খরচ সামলানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ভূমিকাকে মাত্র ২২ শতাংশ মানুষ সমর্থন করছেন, যা তার চলতি মেয়াদের অন্যতম সর্বনিম্ন রেকর্ড।