নতুন হামলার আরো কঠোর জবাবের হুঁশিয়ারি ইরানের

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ গতকাল রোববার যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের স্বার্থ বা নিরাপত্তার ওপর যেকোনো নতুন হামলার জবাবে ‘আরো দ্রুত, কঠোর এবং বেদনাদায়ক’ জবাব দেয়া হবে। পার্লামেন্টের অধিবেশন চলাকালে গালিবাফ বলেন, তিনি যাকে ‘আনুপাতিক জবাব’ বলেছেন, সেই যুগ শেষ হয়ে গেছে এবং তিনি বলেন যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর ইরানের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানগুলো ‘কেবল একটি সূচনা।’

তিনি বলেন, “আমেরিকানদের নিশ্চয়ই বুঝতে হয়েছে যে ‘আনুপাতিক জবাব’-এর যুগ শেষ হয়ে গেছে।” তিনি আরো বলেন, “তারা যদি এখনও এটা না বুঝে থাকেন, তবে খুব দেরি হওয়ার আগেই তাদের বুঝে নেয়া উচিত যে খেলার নিয়ম বদলে গেছে এবং এখন থেকে ইরানের স্বার্থ ও নিরাপত্তার ওপর যেকোনো আগ্রাসনের জবাবে আরো দ্রুত, কঠোর এবং বেদনাদায়ক জবাব দেয়া হবে।”

গালিবাফ বলেন, মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরানের সামরিক হামলা ওয়াশিংটনকে চাপে ফেলেছে এবং তিনি মার্কিন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি তুলে ধরতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ছবি ও ভিডিও তৈরির অভিযোগ তোলেন। তার এই মন্তব্য এমন এক চলমান সংঘাতের মধ্যে এসেছে, যা ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানের ওপর হামলা চালানোর মাধ্যমে শুরু হয়েছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় তেহরান অঞ্চলজুড়ে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুর ওপর প্রতিশোধমূলক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র জুনে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে, যেখানে সংঘাত বন্ধ, হরমুজ প্রণালী ফের খুলে দেয়া এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাগুলো সমাধানের পদক্ষেপের রূপরেখা দেয়া হয়। এরপর থেকে উভয় পক্ষই স্মারকের অধীনে দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতার জন্য একে অপরকে অভিযুক্ত করেছে। একই সাথে নিষেধাজ্ঞা এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে নৌচলাচল নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি সামরিক উত্তেজনাও অব্যাহত রয়েছে। এই সংঘাত চলাকালে ইরান এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, অন্য দিকে ওয়াশিংটন ইরানের লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

আবারো পাল্টাপাল্টি হামলা

ইরানের আশপাশের জলসীমায় দু’পক্ষের জাহাজে পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। তিনটি ইরানি তেলবাহী জাহাজে আমেরিকানরা আঘাত হেনেছে আর আরো তিনটি জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করেছে ইরান, যেগুলো হরমুজ প্রণালীর অননুমোদিত রুট ধরে যাচ্ছিল বলে দাবি করেছে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, শনিবার তারা ইরানের তেল কেন্দ্র খার্ক দ্বীপের কাছে একটিসহ তিনটি ইরানি জাহাজে আঘাত হেনেছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) মার্কিন নৌবাহিনীর দু’টি জাহাজ লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর এসব হামলা চালানো হয়।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধায়ক সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্রাড কুপার বলেছেন, “আইআরজিসির কাছে পরিষ্কার বার্তা : তোমরা যদি আমাদের দু’টি জাহাজে গুলি করো, আমরা তোমাদের তিনটিকে তুলে নিয়ে আরো বেশি অর্থনৈতিক ব্যয় চাপিয়ে দেবো।” এর প্রতিক্রিয়ায় আইআরজিসি ওই অঞ্চলে মার্কিন যুদ্ধ জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে হামলা তীব্র করার হুমকি দিয়েছে। পরে আইআরজিসি জানায়, তারা তিনটি ট্যাঙ্কারকে লক্ষ্যবস্তু করেছে, পাশাপাশি অন্য এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক আছে এমন তিনটি জাহাজে আঘাত হেনেছে। ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসির নৌবাহিনী বলেছে, “সন্ত্রাসী মার্কিন সামরিক বাহিনী দ্বারা প্রতারিত হবেন না এবং অননুমোদিত জলপথ দিয়ে পার হওয়ার উদ্দেশ্যে যেকোনো সন্দেহজনক গতিবিধি থেকে বিরত থাকুন। অন্যথায় আপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।’ ইরানি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, খার্ক দ্বীপের উপকূলে নোঙর করে থাকা একটি ট্যাঙ্কারে চারটি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। ট্যাঙ্কারটির নাবিকরা জাহাজটি ছেড়ে সরে যাওয়ার পর সেটিতে আঘাত হানা হয়, ফলে হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি। সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানি হামলায় কোনো আমেরিকান জখম হয়নি। গত সপ্তাহে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ার পর এই পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটল। উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ার ফলে দু’পক্ষের সংঘাত আরো তীব্র হয়ে ওঠার আশঙ্কা ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক চাপের মুখে ইরান যুদ্ধের গতিপথ বদল

এ দিকে আল-জাজিরার এক বিশ্লেষণী রিপোর্টে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে গোলাগুলি ও পাল্টা হামলা শুরু হলেও ওয়াশিংটনের সামরিক কৌশলে একটি নির্দিষ্ট তারিখের চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শীর্ষ পরামর্শকরা চাইছেন, নির্বাচনের আগে যেন এই সংঘাত কোনোভাবেই পূর্ণাঙ্গ রূপ না নেয়।

কংগ্রেসে বর্তমানে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুবই সামান্য। ক্ষমতা ধরে রাখার এই লড়াইয়ে মার্কিন প্রশাসন আপাতত তেহরানের ওপর সর্বাত্মক সামরিক অভিযানের বদলে অর্থনৈতিক অবরোধ ও নজরদারির কৌশল বেছে নিয়েছে। গত মাসে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের তেল কেনাবেচার সাথে জড়িত ৬০টি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী ও গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোতে নৌঘাঁটির নজরদারি জোরদার করে তেল রফতানি বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। তবে প্রশাসনিকভাবে সংঘাতের মাত্রা কম দেখানোর চেষ্টা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সামগ্রিক পরিস্থিতিকে হালকা করে উপস্থাপনের কৌশল নিয়েছেন। কারণ, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে বেড়েছে। দেশটির ভেতরে মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়ায় সাধারণ আমেরিকানরা এই যুদ্ধের তীব্র বিরোধী হয়ে উঠেছেন। সাম্প্রতিক রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, ৬৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এই সামরিক পদক্ষেপের বিপক্ষে, আর ট্রাম্পের জনসমর্থন কমে ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে।

তবে তেহরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বাড়ালেও ওয়াশিংটন পুরোপুরি আগ্রাসন বন্ধ করেনি। চলতি সপ্তাহেও মার্কিন বাহিনীর পৃথক কিছু হামলায় দক্ষিণ ইরানের কুহেস্তাকে একটি বিয়ের প্যান্ডেলে আঘাত হানার খবর পাওয়া গেছে, যেখানে শিশুসহ বেশ কয়েকজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথকে সতর্ক করেছেন সেনা ও নৌবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তাদের লিখিত মূল্যায়নে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে এই যুদ্ধ চালানো মার্কিন সামরিক সক্ষমতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অন্য দিকে, ইরানের হিসাব-নিকাশ ভিন্ন। সস্তা ড্রোনের ব্যবহার এবং কৌশলগত স্থানে আঘাত হেনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেট খালি করার পথ বেছে নিয়েছে তেহরান। হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে স্থবিরতা তৈরি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রল ও ডিজেলের দাম আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। ফলে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি-জ্বালানির দাম কমানো ও নতুন যুদ্ধ না জড়ানো-সরাসরি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন দুর্বল অবস্থায় আছে বুঝতে পেরে তেহরান নিজেই নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে সংঘাত আরো বাড়িয়ে দিতে পারে, যাতে রাজনৈতিক চাপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলই নির্ধারণ করবে এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ। নির্বাচনে রিপাবলিকানরা জিতলে ট্রাম্প প্রশাসন ভোটের পরপরই ইরানে পূর্ণমাত্রায় হামলা চালানোর আইনি ও রাজনৈতিক সুযোগ পাবে। তবে কংগ্রেস ডেমোক্র্যাটদের দখলে গেলে ট্রাম্পের সামরিক বাজেট আটকে যেতে পারে। যদিও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ভোটে পরাজিত হলে ট্রাম্প আরো বেশি বেপরোয়া সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা মধ্যপ্রাচ্যকে পুরোপুরি এক অনিশ্চিত যুদ্ধের মুখে ঠেলে দেবে।