- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
- মানবতাবিরোধী অপরাধ
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার সাবেক সেনাকর্মকর্তা জিয়াউল আহসানকে ‘সিরিয়াল কিলার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া। এ কারণে জিয়াউলের পদোন্নতির বিরোধিতা করেছিলেন বলেও দাবি করেছেন তিনি।
গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জেরার জবাবে সাবেক সেনাপ্রধান এই দাবি করেন। তাকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো। সাথে ছিলেন জিয়াউল আহসানের বোন আইনজীবী নাজনীন নাহারসহ আরো কয়েকজন। শতাধিক গুম-খুনের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলার আসামি বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে সকালে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনালে এ দিন অপর বিচারক ছিলেন মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। জেরার একপর্যায়ে আইনজীবী আমিনুল গণি টিটোর প্রশ্নের জবাবে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘জিয়াউল আহসান একজন সিরিয়াল কিলার। এ কারণে আমি তার পদোন্নতি দেয়ার পক্ষে ছিলাম না। তবে পদোন্নতি বোর্ডের অধিকাংশই তাকে ভালো কর্মকর্তা হিসেবে আখ্যা দিয়ে পদোন্নতি দিতে সুপারিশ করেছেন।’
জেরার সময় সাবেক সেনাপ্রধানকে আইনজীবী টিটো প্রশ্ন করেন, তার সেনাপ্রধান থাকাকালে ২০১২-১৫ সালের মধ্যে জিয়াউল আহসান কয়টি পদোন্নতি পেয়েছেন। এর উত্তরে অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, একটি পদোন্নতি পেয়েছেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল থেকে কর্নেল পদে। এ সময় তার পদোন্নতির ব্যাপারে পদোন্নতি বোর্ডের কতজন কর্মকর্তা সুপারিশ করেছেন জানতে চান আসামির আইনজীবী টিটো।
জবাবে ইকবাল করিম বলেন, ‘অধিকাংশই মতামত দিয়েছেন। তাদের মতামতের ভিত্তিতে জিয়াউল আহসানকে পদোন্নতি দেয়া হয়। তবে বোর্ডের অনেক সদস্যই নিজেদের ভবিষ্যৎ স্বার্থ চিন্তা করে মতামত দিয়েছেন।’
জিয়াউল আহসানের পদোন্নতি ঠেকাতে চাওয়ার কথা তুলে ধরে ইকবাল করিম বলেন, আমি মেজর জেনারেল মোমেনকে ডেকে বলেছি যে, জিয়াউল আহসান একজন সিরিয়াল কিলার। আমি তার পদোন্নতি দেয়ার পক্ষে নই। তুমি পদোন্নতি সভায় এভাবেই উপস্থাপন করবে। পরে সভায় এভাবেই উপস্থাপন করেছেন মোমেন। তথাপি জিয়াউলকে ভালো কর্মকর্তা হিসেবে অভিহিত করে পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করেছেন অধিকাংশ সদস্য।
জিয়াউল আহসান ‘কখনোই ভালো কর্মকর্তা ছিলেন না’ দাবি করে ইকবাল করিম বলেন, ‘সেনাবাহিনীতে সচরাচর স্টাফ কলেজ করা ছাড়া কাউকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে পদোন্নতি দেয়া হয় না। তিনি স্টাফ কলেজ করার যোগ্যতা কখনো অর্জন করেননি। এমনকি স্টাফ কলেজও করেননি। এ ছাড়া লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে তিনি কোনো ব্যাটালিয়ন কমান্ড করেননি। এ জন্য তিনি কর্নেল পদে পদোন্নতির যোগ্য ছিলেন না।’
পদোন্নতি সভায় জিয়াউল সম্পর্কে এ কথা উপস্থাপন করায় জেনারেল মোমেনকে কিছুদিন পর সেনাবাহিনী থেকে সরিয়ে বাহরাইনের রাষ্ট্রদূত করা হয় বলে জানান জেনারেল করিম। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলামসহ অন্য প্রসিকিউটররা উপস্থিত ছিলেন।
গত ৪ জানুয়ারি জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি শেষ করে প্রসিকিউশন। শুনানিতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শতাধিক গুম-খুনের দায়ে তার বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ পড়ে শোনান প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা তিনটি অভিযোগের প্রথমটি হলো- ২০১১ সালের ১১ জুলাই রাতে গাজীপুর সদর থানার পুবাইলে সড়কের পাশে জিয়াউলের সরাসরি উপস্থিতিতে সজলসহ তিন হত্যা। দ্বিতীয় অভিযোগের ঘটনাস্থল বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের চরদুয়ানী খাল ঘেঁষা বলেশ্বর নদের মোহনা। ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সেখানে নজরুল ইসলাম মল্লিকসহ ৫০ জনকে হত্যা করা হয়।
তৃতীয় অভিযোগে বরগুনার বলেশ্বর নদ ও বাগেরহাটের শরণখোলায় সুন্দরবনের বিভিন্ন অঞ্চলে কথিত বনদস্যু দমনের আড়ালে ৫০ জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়। গত ১৭ ডিসেম্বর জিয়াউলের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল-১। ওই দিনই তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়।
মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান সবশেষ টেলিযোগাযোগ নজরদারির জাতীয় সংস্থা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মহাপরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ে রদবদলের ধারাবাহিকতায় গত বছরের ৬ আগস্ট তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। পরে ১৬ আগস্ট তাকে গ্রেফতার করার কথা জানায় পুলিশ।
প্রথমে তাকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হকার শাহজাহানকে হত্যার অভিযোগে ঢাকার নিউ মার্কেট থানার মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত বছর ১২ নভেম্বর তাকে জুলাই-আগস্টের হত্যা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়।
ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সে দিন বলেছিলেন, ‘বরখাস্তকৃত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। অসংখ্য হত্যাকাণ্ড ও গুমের সাথে তার সম্পৃক্ততা। আমাদের তদন্ত সংস্থা ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে প্রমাণ পেয়েছে।’
১৯৯১ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশন পাওয়া জিয়াউল সেনাবাহিনীর একজন প্রশিক্ষিত কমান্ডো ও প্যারাট্রুপার ছিলেন। ২০০৯ সালে মেজর থাকাকালে তিনি র্যব-২-এর উপ-অধিনায়ক হন।
ওই বছরই তিনি পদোন্নতি পেয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হন এবং র্যাব সদর দফতরের গোয়েন্দা শাখার পরিচালকের দায়িত্ব পান। র্যাবে দায়িত্ব পালনের সময় থেকেই জিয়াউল আহসান হয়ে উঠেছিলেন সংবাদমাধ্যমে পরিচিত নাম।
কর্নেল পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে অতিরিক্ত মহাপরিচালক করে তাকে র্যাবেই রেখে দেয়া হয়। ২০১৬ সালে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে জিয়াউল আহসানকে পাঠানো হয় জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) পরিচালকের দায়িত্বে। পরের বছরই এনটিএমসির পরিচালক করা হয় জিয়াউল আহসানকে। ২০২২ সালে সংস্থাটিতে মহাপরিচালক পদ সৃষ্টির পর তাকেই সংস্থাটির নেতৃত্বে রাখা হয়েছিল।
আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে গুম, খুন এবং ‘আয়নাঘর’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া গোপন বন্দিশালায় নির্যাতনে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া প্রায় ৪০ কোটি ৮৭ লাখ টাকার ‘অবৈধ সম্পদ’ অর্জন এবং ৩৪২ কোটি টাকার ‘অস্বাভাবিক লেনদেনের’ অভিযোগে জিয়াউল আহসান এবং তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দু’টি মামলা করেছে দুদক।
দুদকের আবেদনে ঢাকার জজ আদালত জিয়াউল আহসানের তিনটি ফ্ল্যাট, পাঁচটি বাড়ি ও প্রায় ১০০ বিঘা জমি জব্দ এবং তার ৯টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করারও আদেশ দিয়েছে।



