এস এম ইসাহক আলী রাজু গুরুদাসপুর (নাটোর)
নাটোরের গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম ও পাবনার চাটমোহর উপজেলায় বিনা চাষে রসুন রোপণ ও আমন ধান কাটার মৌসুমকে কেন্দ্র করে জমে উঠেছে শ্রমিকের হাট। ভোরের আলো ফোটার আগেই জীবিকার তাগিদে নয়াবাজার, হাজীরহাট, হাসমারী এবং বড়াইগ্রামের মানিকপুর পয়েন্টে কয়েক হাজার শ্রমিক (নারী-পুরুষ) জড়ো হন। শীত ও ঠাণ্ডা উপেক্ষা করে দূর-দূরান্ত থেকে আদিবাসীসহ নানা পেশার নারী, পুরুষ ও শিশুরা ট্রাক, বাস, নছিমন, করিমন ও ভ্যানে চেপে এই হাটে আসেন।
প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত জমে থাকে এই শ্রমিকের বাজার। শ্রমিকরা দলভুক্ত হয়ে আসেন ৬ থেকে ২০ জনের গ্রুপে। কৃষকরা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী দরদাম ঠিক করে শ্রমিকদের নিয়ে যান মাঠে। ধান কাটা, লারা বিছানো, জমি প্রস্তুত, রসুনের কোয়া রোপণ- এসব কাজে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত চলে এই মৌসুমি ‘শ্রমিক হাট’।
গত বৃহস্পতিবার সরেজমিন নয়াবাজারে দেখা যায়, গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম ছাড়াও তাড়াশ, সলঙ্গা ও উল্লাপাড়াসহ চলনবিলের বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিকরা দলে দলে এসেছেন। সবার সাথে রয়েছে কাজের সরঞ্জাম- কাস্তে, কোদাল, ধান বহনের বাক। রাস্তার পাশে ভিড় জমে তাদের। কোনো কৃষকের দেখা মিললেই শ্রমিকরা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করেন, ‘কতজন লাগবে?’
তাড়াশের নওগাঁ থেকে আসা আমেনা বেগম (৪০) জানান, স্বামী পঙ্গু হওয়ায় সংসার চালাতে তাকেই শ্রমিক দলে যোগ দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খাটুনি দিই। মজুরি পাই ৩০০-৩৫০ টাকা। অথচ পুরুষেরা একই কাজ করে ৫৫০-৬০০ টাকা মজুরি পায়। এই বৈষম্য মেনেই কাজ করি।
ধারাবারিষা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল মতিন বলেন, বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়ক চালুর পর থেকে হাসমারী ও মানিকপুরে প্রায় দুই যুগ ধরে শ্রমিকের হাট বসছে। চলনবিলের প্রাণকেন্দ্র হওয়ায় রসুন রোপণ ও ধান কাটার মৌসুমে প্রতিদিন পাঁচ-ছয় হাজার শ্রমিক এখানে জড়ো হন। যাদের মধ্যে নারী শ্রমিকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
গুরুদাসপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাফিউল ইসলাম বলেন, নিম্নআয়ের মানুষরা বাধ্য হয়েই কম মজুরিতে শ্রম বিক্রি করেন। অনেকে উচ্চ সুদে অগ্রিম নিয়ে সংসার চালান। আবার সেই টাকাই শোধ করতে হয় কম দামে শ্রম দিয়ে। তিনি আরো জানান, গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম ও চাটমোহরে বিপুল পরিমাণ জমিতে বিনা চাষে রসুন আবাদ হয়। আর এসব আবাদকে ঘিরেই শ্রমিকদের এমন ভিড়।
চলনবিলের পানি নেমে যাওয়ায় বিভিন্ন ইউনিয়নের আবাদি জমিতে আমন ধান কাটা ও রসুন রোপণ চলছে জোরেশোরে। কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচ এখন অনেক বেশি। প্রতি বিঘায় ৩০-৩৫ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে। বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, নিড়ানি ও শ্রমিক খরচ- সবই বেড়েছে। নাড়ানপুরের কৃষক সামছু (৩৭) জানান, বিঘা প্রতি রসুনবীজ লাগে ৯ হাজার টাকার, সার-কীটনাশকে চলে যায় সাত হাজার টাকা, শ্রমিকদের দিতে হয় চার হাজার এবং নিড়ানিতে তিন হাজার ও সেচে খরচ হয় পাঁচ হাজার টাকা। ক্ষুদ্র চাষিরা আবার প্রতি বিঘা ১০ হাজার টাকা দিয়ে জমি বর্গা নিয়ে আরো বেশি খরচে আবাদ করেন।
চলনবিলজুড়ে রসুন আবাদে যেমন কর্মযজ্ঞ চলছে, তেমনি শ্রমিক হাটগুলোও পরিণত হয়েছে হাজারো মানুষের জীবিকার সন্ধানে।



