সিটের জন্য আর গণরুম, গেস্টরুমের কষ্ট করতে হয় না শিক্ষার্থীদের

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বড় প্রাপ্তি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনও অসংখ্য নজির রয়েছে, যারা তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

হারুন ইসলাম
Printed Edition
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গণরুম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গণরুম |সংগৃহীত

বাংলাদেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়টি দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, মুক্ত চর্চার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। এ দেশের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬৯’র গণ-অভ্যুত্থান, স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, ৯০’র স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, সর্বশেষ জুলাই অভ্যুত্থানে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। বিভিন্ন সময়ে সরকারে থাকা দলগুলো মুখ চেপে ধরার চেষ্টা করেছে। তবুও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বর তুলতে কোনো সময়ের জন্য থেমে থাকেনি এ বিদ্যাপীঠ।

তবে জুলাই অভ্যুত্থানের আগে ছিল এর বিপরীত চিত্র। স্বৈরাচারী শাসনামলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে জেঁকে বসেছিল পতিত আওয়ামী সরকারের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগ। প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ক্যাম্পাসগুলোতে সিট বণ্টনসহ নানাবিধ কার্যক্রম সম্পন্ন হতো তাদের অনুমতিতে। ম্যানার (আদব-কায়দা) শেখানোর নাম করে চলত টর্চার সেল নামক গেস্টরুম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনও অসংখ্য নজির রয়েছে, যারা তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছে। বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলোকে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে দিত না তারা। সেই সময় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা কোনো শিক্ষার্থীকে একপ্রকার বাধ্য হয়েই থাকতে হতো গণরুমের মতো নরকপুরীতে। তবে সেই চিত্র ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আর দেখতে হচ্ছে না। শিক্ষা, প্রশাসন, গবেষণা ও রাজনৈতিক সংস্কারে শুরু হয়েছে কাঠামোগত রূপান্তর। শতবর্ষের প্রাচীন এই বিদ্যাপীঠ দ্বিতীয় শতকে পা রেখে এগিয়ে চলেছে নতুন দিশায়।

যেমন ছিল স্বৈরাচারী আমলের গণরুম, গেস্টরুম কালচার

নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের একটি বড় হাতিয়ার ছিল গণরুম-গেস্টরুম প্রথা। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ১৮টি হলে ছাত্রলীগের তৈরি করা এই গণরুম-গেস্টরুমে পিষ্ট হতো হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের স্বপ্ন। ৮ জনের জন্য বরাদ্দকৃত রুমে থাকত ২০ থেকে ২২ জন। আবার কখনো ছাত্রলীগের নেতাদের ইচ্ছে অনুযায়ী সংখ্যাটা আরো বাড়ত। গণরুম ছিল অনেকটা গণ-কারাগারের মতো। পরিচয়পর্বের নামে প্রথম থেকেই গেস্টরুমে চলত নানা কায়দায় নির্যাতন। নেতাদের সেট করা ম্যানারে না চললে ডাকা হতো গেস্টরুমে। আওয়ামী লীগের পার্টি অফিস থেকে ছাত্রলীগের প্রোগ্রাম, কোথাও তালি বা স্লোগানে ভাইদের সন্তুষ্ট করতে না পারলে ডাকা হতো গেস্টরুমে। ভুলবশত সালাম দেয়া না হলেও ডাকা হতো গেস্টরুমে। এভাবে কারণে অকারণে নির্যাতন করা হতো সাধারণ শিক্ষার্থীদের।

ওই সময়ের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, কৃত্রিম আসন সঙ্কটের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২২-২৩ সেশনে প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়া দুই হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর ঠাঁই হতো বিভিন্ন হলের গণরুমে। গাদাগাদি করে থাকতে বাধ্য হতো তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হলের ১২৩টি কক্ষ গণরুম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এসব কক্ষে ২ হাজার ৩০০-এর বেশি শিক্ষার্থীর বসবাস। চারজনের কক্ষে ২০ জনের বেশি শিক্ষার্থী গাদাগাদি করে থাকতেন।

জানতে চাইলে ২১-২২ সেশনের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আবির হাসান বলেন, “ইমিডিয়েট সিনিয়র থেকে শুরু করে মোস্ট সিনিয়র ভাইকে অনেক দূর থেকে দেখেও কেন সালাম দেইনি, এই অপরাধে আমাদের ওপর নেমে আসত ভয়াবহ নির্যাতন। অনেক সময় তাদের নির্যাতনের কোনো কারণ লাগত না। ছাত্রলীগের প্রোগ্রাম করতে গিয়ে ঠিকমতো পড়াশোনাও করতে পারিনি।”

তিনি আরো বলেন, “রোজা অবস্থায় রমজান মাসেও আমাদের রেহাই দিত না। সিনেট ভবন থেকে ভিসি চত্বর পর্যন্ত হাঁটানো হতো। কোনো কাজ ছাড়াই ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয়, বিশ্ববিদ্যালয় বা হল সভাপতি, সেক্রেটারির পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে পর্যাপ্ত সিট থাকার পরও নেতারা কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে রাখত। তাদের প্রোগ্রাম ও মিছিল-মিটিংয়ে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করার জন্য ছিল এই পদ্ধতি। মেধাবীদের বৈধ অধিকার তারা দিত না। উল্টো দয়া দেখানোর মতো আচরণ করা হতো।”

জসীমউদ্দীন হলের শিক্ষার্থী বায়েজিদ আহমেদ বলেন, ‘আমাদের হলে যত রুম আছে, তাতে গণরুম ছাড়াই শিক্ষার্থীরা ভালোভাবে থাকতে পারত। কিন্তু নেতারা, তাদের অধিকাংশ রুম দখল করে রেখেছিল। আটজনের রুমে দুই থেকে তিনজন থাকত।” তিনি বলেন, “আমাদের ২০টা রুম আছে। প্রতি রুমে আটজন থাকলে মোট ১৬০ জন থাকতে পারে। বৈধ শিক্ষার্থী আছে ১৪০ জন। কিন্তু নেতাদের কারণে অবৈধসহ দুই শতাধিক শিক্ষার্থী থাকে। ফলে প্রতিটি গণরুমে ২০ থেকে ২২ জনের থাকতে হতো।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর বর্তমান চিত্র : বছরের পর বছর ধরে সিট ব্যবস্থাপনা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকলেও জুলাই অভ্যুত্থানের পরে চিত্র বদলেছে। প্রশাসনের তৎপরতায় সিট বণ্টন হচ্ছে হলগুলোতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত ছাত্ররা হল প্রশাসনের মাধ্যমে বৈধভাবে সিট বরাদ্দ পাচ্ছেন। অথচ এই বরাদ্দ প্রাপ্তি হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জন্য একসময় ছিল স্বপ্নের বিষয়। জুলাই বিপ্লব শিক্ষার্থীদের হলে বৈধভাবে সিট পাওয়ার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করেছে বলে মন্তব্য করছেন শিক্ষার্থীরা।

১২টি ছাত্র হলের ছাত্র এবং হাউস টিউটরগণ জানান, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হলে থাকার জন্য রাজনৈতিক দাসত্ব মেনে নেয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। কারণ, প্রশাসন সিট ব্যবস্থাপনায় কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে পারত না বরং তা সম্পূর্ণরূপে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল।

নারী শিক্ষার্থীদের সিট সঙ্কট নিরসনে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

জুলাই অভ্যুত্থানের পরে ছাত্রী হলে সঙ্কট নিরসনে কিছু ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এর মধ্যে রয়েছে মেয়েদের জন্য নতুন হল নির্মাণ, যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের আবাসন সঙ্কট নিরসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এ ছাড়াও, ছাত্রীদের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান, কিছু ছাত্রী হলে শিক্ষার্থীদের জন্য সেলফ-সার্ভিস পদ্ধতিতে ওষুধের ব্যবস্থা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারসহ বেশ কয়েকটি কাজ করা হয়েছে।