দেশী-বিদেশী নানা উদ্যোগে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগসংক্রান্ত ইস্যুর নিষ্পত্তি হতে চলেছে। সরকার ও দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক সূত্র থেকে এ কথা জানা গেছে।
সূত্র মতে, ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো থেকে একযোগে বলা হয়েছে তারা প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে প্রফেসর ড. ইউনূসের পদত্যাগ কামনা করেন না। বিএনপি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে তারা কেবলই নির্বাচনের সুস্পষ্ট রোটম্যাপ দাবি করেছে। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এই ইস্যুতে প্রভাবশালী পক্ষগুলোর মধ্যে মতান্তর হওয়ার পর থেকে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার চলমান রাখার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার সাথে কথা বলে দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করেছে। এ ক্ষেত্রে বিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়া অভিভাবকমূলক ভূমিকা রেখেছেন বলে জানা গেছে।
সূত্র অনুসারে সেনা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ অবস্থান থেকে সরকারের কার্যক্রম নিয়ে স্বাভাবিক সৌজন্যের বাইরে কথা বলার পেছনে রদবদলের একটি গুজব সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। প্রতিবেশী একটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সেনাপ্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদলের উদ্যোগ নিয়েছেন।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে কর্মরত গোয়েন্দা তথ্যে বলা হয়, একজন লে. জেনারেলকে সেনা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বসানো হবে। এ তথ্যে বেশ উত্তেজনার তৈরি হয়। সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তাকে দুই দফায় অন্যত্র বদলির প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু সেনা সদর দফতরের এ প্রস্তাবের সাথে সম্মত হয়নি প্রধান উপদেষ্টার দফতর। এটাকে দিয়ে উত্তেজনা পরিকল্পিতভাবে আরো বাড়ানো হয়।
অন্য দিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নেতৃত্বের কাছে একই উৎসের গোয়েন্দা তথ্য আসে যে অন্তর্বর্তী সরকার ডিসেম্বর থেকে জুন ২৬-এর মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সেটি রক্ষা না করে ক্ষমতাকে প্রলম্বিত করতে চাইছে।
এতে উদ্বিগ্ন হয়ে বিএনপি একের পর এক কঠোর কর্মসূচি ও বক্তব্য দিয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়। এর অংশ হিসেবে ইশরাকের ঢাকা দক্ষিণের মেয়র ঘোষণার ব্যাপারে সরকার ও বিচার বিভাগ দুই ক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগ করা হয়। ইশরাকের কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের অংশগ্রহণ সরকারের মধ্যে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করে সে সাথে নির্বাচনের জন্য চাপ সৃষ্টিতে যমুনা ঘেরাও এবং সে কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ব্যাপক অংশগ্রহণের গোপন নির্দেশনায় সরকারের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়।
সরকারের কাছে গোয়েন্দা তথ্য আসে যে, বিএনপি যে সময়ে যমুনা ঘেরাওয়ের কথা বলছে সেই একই সময়ে ভারতে থাকা পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের নেতাকর্মীদের বার্তা দেন যে তিনি যেকোনো সময় দেশে ঢুকে পড়তে পারেন। তাদের এমনও বলা হয় যে, তোমরা বিএনপির কর্মসূচিতে পরিচয় গোপন করে ঢুকে পড়ে ড. ইউনূস পদত্যাগ করলে নিজস্ব পরিচয় প্রকাশ করে সব প্রতিষ্ঠান দখল করতে হবে। একই সময় শেখ হাসিনা চট করে দেশে ঢুকে পড়বেন।
আওয়ামী লীগের প্রধান আগেই ঘোষণা করেন যে তিনি প্রধানমন্ত্রী থেকে পদত্যাগ করেননি। পদত্যাগ করলে তিনি আকস্মিকভাবে ঢুকে পড়লে প্রেসিডেন্ট তাকে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করবেন। এ আশাবাদ নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ কর্মী সমর্থকদের বেশ উজ্জীবিত করে।
এ দিকে গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে বিএনপিকে বলা হয় প্রফেসর ইউনূস পদত্যাগ করলে সেনা প্রধান কর্তৃত্ব গ্রহণ করবেন এবং একটি জাতীয় সরকার গঠন করে দ্রুততম সময়ে নির্বাচন দেবেন। ঢাকায় দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার স্টেশন প্রধান একজন প্রভাবশালী বিএনপি নেতার সাথে বৈঠকে এ ধারণা দেন। এই নেতা দীর্ঘদিন প্রতিবেশী দেশটির আশ্রয়ে ছিলেন। সশস্ত্র তিন বাহিনীর প্রধান উপদেষ্টার সাথে বৈঠকের সময় মানবিক করিডোর, চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবহার দায়িত্ব বিদেশী কোম্পানিকে দেয়া এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার নিয়োগ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরদিন সেনা অ্যাড্রেসে জেনারেল ওয়াকারের বক্তব্য বহু পত্রিকায় প্রকাশ হলে উত্তেজনা আরো বৃদ্ধি পায়। প্রধান উপদেষ্টা এই বক্তব্য এবং বিএনপির যমুনা ঘেরাও এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উদ্দেশ্যমূলক অস্থিরতা সৃষ্টিতে বিরক্ত হন। এবং তিনি উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে নিজের ইস্তফা দানের বিবেচনার কথা জানান। তিনি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণের একটি খসড়া তৈরির জন্য নির্দেশনা দেন।
এতে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে দূরত্ব ও ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটানোর চেষ্টা করেন। গভীরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন যে একটি প্রতিবেশী দেশ প্রফেসর ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকার থেকে বিদায় করতে পরিকল্পিতভাবে ভুল তথ্য দিয়ে দুই পক্ষকে মুখোমুখি করেছে।
নাম সূত্র থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর রাজনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি বাংলাদেশের একটি কূটনৈতিক অংশীদার সক্রিয় হয়। তাদের উদ্যোগে প্রকৃত তথ্য সংশ্লিষ্টদের জানানো হয় যে সেনা প্রতিষ্ঠানে কোনো রদবদলের পরিকল্পনা ছিল না। কিছু ইউটিউবের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিষয়টি উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রচার করা হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত সব পক্ষ স্থিতাবস্থা বজায় রেখে আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে একমত হন। এ সময়ে সেনা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কোনো পরিবর্তন আনা হবে না। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বও বুঝতে পারে যে, ড. ইউনূস সরকারের পতন ঘটলে সেনা সমর্থিত আরেকটি সরকার এলে তখন ফ্যাসিবাদের ফিরে আসার পথ তৈরি হবে। নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
পুরো বিষয়টি বিএনপি চেয়ারপারসনের দৃষ্টিতে আনার পর বিএনপি প্রফেসর ইউনূসের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গীতে নমনীয়তা আনেন। বিএনপি নির্বাচনের রোডম্যাপের যে দাবি উত্থাপন করেছে সেটির ব্যাপারে সরকার একমত হলেও সেটি ঘোষণায় কিছুটা সময় নিতে পারে। এ ঘোষণা দেয়া হলে প্রশাসনে সরকারের নিয়ন্ত্রণ অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে।
জানা গেছে, সরকারের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক নেতাদেরকে পরিষ্কার বার্তা দেয়া হয়েছে যে, আগামী বছর ফেব্রুয়ারি মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সে অনুযায়ী সময়মতো ডিসেম্বরে তফসিল ঘোষণা করা হবে।
দেশী-বিদেশী পক্ষের এ উদ্যোগে ফ্যাসিবাদের সমর্থকদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিপক্ষ দলটি নতুন কৌশল নেয়ার বিষয়ে ভাবছে বলে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।



