সংলাপের আভাস রাজপথে অনড় শিক্ষার্থীরা

ফিরে দেখা জুলাই’২৪

Printed Edition
সংলাপের আভাস  রাজপথে অনড় শিক্ষার্থীরা
সংলাপের আভাস রাজপথে অনড় শিক্ষার্থীরা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

১১ ও ১২ জুলাই টানা ‘বাংলা ব্লকেড’-এর পর ১৩ জুলাই ২০২৪ ছিল কোটা সংস্কার আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এদিন আন্দোলন সহিংসতার পর্যায়ে না পৌঁছালেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, শিক্ষার্থীরা আর শুধু আদালতের রায়ের অপেক্ষায় নেই; তারা সরকারের কাছ থেকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত চাইছে। অন্য দিকে সরকারও প্রথমবারের মতো অনানুষ্ঠানিক আলোচনার ইঙ্গিত দেয়। ফলে দিনটি ছিল একদিকে সংলাপের সম্ভাবনা, অন্য দিকে আরো বড় সঙ্ঘাতের পূর্বাভাস।

শনিবার হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত ক্লাস ছিল না। কিন্তু ছুটির দিনও আন্দোলনের গতি থামাতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন। সমাবেশ শেষে তারা শাহবাগ মোড় অবরোধ করলে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। একই সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রেললাইন অবরোধ করেন। দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েও কর্মসূচি পালিত হয়। আন্দোলনের মূল বার্তা ছিল একটাই- কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা। সেখানে তারা অভিযোগ করেন, আন্দোলন দমাতে বিভিন্ন স্থানে মামলা, ভয়ভীতি ও প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। একই সাথে তারা ঘোষণা দেন, পরদিন রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দেয়া হবে। তাদের বক্তব্য ছিল, বিষয়টি শুধু আদালতের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না; সরকারকেও রাজনৈতিকভাবে দায়িত্ব নিতে হবে এবং বৈষম্যহীন নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট করেন যে, আপিল বিভাগের স্থিতাবস্থা আদেশে তারা সন্তুষ্ট নন। কারণ আদালতের আদেশ সাময়িক হলেও মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান আসেনি। তাই তাদের দাবি ছিল, সব গ্রেডের সরকারি চাকরিতে একটি যৌক্তিক ও বৈষম্যহীন কোটা সংস্কার কমিশন গঠন এবং সেই সুপারিশ বাস্তবায়নের রাজনৈতিক অঙ্গীকার।

এদিন সরকারের পক্ষ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা আসে। তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত বলেন, বিষয়টি যেহেতু আদালতে বিচারাধীন, তাই সরকার এখনই কোটা সংস্কার কমিশন গঠন বা নতুন কোনো ঘোষণা দিতে পারবে না। তবে সরকারের বিভিন্ন পর্যায় এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের সাথে অনানুষ্ঠানিক মতবিনিময়ের আগ্রহের কথাও প্রকাশ করা হয়। আলোচনায় কী ধরনের কোটা যৌক্তিক হতে পারে, সে বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মতামত জানতে চাওয়ার ইঙ্গিত দেয়া হয়।

কিন্তু আন্দোলনকারীরা তখনও সতর্ক ছিলেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করা হতে পারে। তাই তারা ঘোষণা দেন, লিখিত ও কার্যকর প্রতিশ্রুতি ছাড়া আন্দোলন প্রত্যাহারের প্রশ্নই আসে না। আন্দোলনের নেতৃত্ব বারবার জোর দিয়ে বলেন, এটি কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি নয়; এটি মেধাভিত্তিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের দাবি।

১৩ জুলাইয়ের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল আন্দোলনের বিস্তার। শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক যে কর্মসূচি ছিল, তা এরই মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং জেলা শহরে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আন্দোলনের বিভিন্ন ছবি, ভিডিও ও বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ফলে রাজধানীর গণ্ডি পেরিয়ে আন্দোলন একটি জাতীয় চরিত্র লাভ করে।

সেই দিনের পরিবেশ ছিল দৃশ্যত শান্ত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে উত্তেজনাপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শাহবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় সতর্ক অবস্থানে ছিল। শিক্ষার্থীরাও বুঝতে পারছিলেন, সামনে আন্দোলন আরো কঠিন পর্যায়ে যেতে পারে। ফলে কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি তারা সাংগঠনিক সমন্বয়, বার্তা প্রচার এবং পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে প্রস্তুতি নিতে থাকেন।

বর্তমানে ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৩ জুলাই ছিল ঝড়ের আগের অপেক্ষাকৃত শান্ত দিন। এর পরদিন রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি, প্রধানমন্ত্রীর বিতর্কিত ‘রাজাকার’ মন্তব্য, মধ্যরাতের বিক্ষোভ এবং ১৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া সংঘর্ষ আন্দোলনকে সম্পূর্ণ নতুন মোড়ে নিয়ে যায়। তাই ১৩ জুলাইকে শুধু একটি বিক্ষোভের দিন হিসেবে নয়, বরং আলোচনার সম্ভাবনা ও আসন্ন সঙ্ঘাত, দুইয়ের সন্ধিক্ষণ হিসেবে দেখা হয়।