নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ইসরাইলি সেনাবাহিনীর সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনে রোববার সকালে গাজা উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় কিশোরসহ তিন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। স্থানীয় সূত্র জানায়, দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসের জোরাত আল-লুত এলাকায় ইসরাইলি গুলিতে নিহত হয় ১৫ বছর বয়সী আলা আল-দিন মুহাম্মদ জুহাইর আশরাফ। খবর আরব নিউজের।
এ দিকে গাজার উপকূলীয় নৌসীমায় মাছ ধরার সময় ইসরাইলি নৌবাহিনীর গুলিতে মাথায় আঘাত পেয়ে নিহত হন ৩২ বছর বয়সী জেলে আবদুর রহমান আবরুল-হাদি আল-কান্না। একই ঘটনায় আরো একজন জেলে আহত হয়েছেন। অন্যদিকে খান ইউনুসের পশ্চিমাঞ্চলের আল-মাওয়াসি এলাকায় ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে ফাদি নাজিব সালাহ নিহত হন। তার লাশ খান ইউনুসের নাসের হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাফাহ উপকূল ও আশপাশ এলাকায় ইসরাইলি নৌ ও বিমান হামলা বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে ৩০টির বেশি ত্রাণ সংস্থার লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত গাজায় মানবিক সঙ্কট আরো গভীর করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইসরাইলের নিষেধাজ্ঞায় বিপাকে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো
গাজা ও অধিকৃত পশ্চিমতীরে কাজ করা ৩৭টি আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার ওপর ইসরাইলের নিষেধাজ্ঞা অঞ্চলটির তীব্র মানবিক সঙ্কটকে আরো গভীর করতে পারে বলে সতর্ক করছেন ত্রাণকর্মীরা। এই সিদ্ধান্তের ফলে চিকিৎসা, খাদ্য, পানি ও আশ্রয় সহায়তা কার্যক্রমে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আরব নিউজ জানায়, নিষিদ্ধ তালিকায় রয়েছে ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স (এমএসএফ), নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল, অক্সফাম এবং মেডিক্যাল এইড ফর প্যালেস্টিনিয়ানসের মতো শীর্ষস্থানীয় সংস্থা। এসব সংস্থা গাজায় তাঁবু বিতরণ, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, ক্লিনিক ও হাসপাতাল পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছিল।
লাইসেন্স বাতিলের ফলে ১ মার্চের মধ্যে এসব সংস্থাকে কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে বলে জানিয়েছে ইসরাইল। এর অর্থ, তারা আর গাজায় ত্রাণসামগ্রী প্রবেশ করাতে বা আন্তর্জাতিক কর্মী পাঠাতে পারবে না। ইতোমধ্যে কিছু সংস্থা কয়েক মাস ধরে ত্রাণ প্রবেশে বাধার মুখে রয়েছে। নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল জানিয়েছে, গত ১০ মাস ধরে তারা নতুন ত্রাণ ঢোকাতে পারেনি।
ইসরাইল দাবি করছে, নিষিদ্ধ সংস্থাগুলো গাজার সামগ্রিক সহায়তাকার্যক্রমের একটি ছোট অংশ মাত্র। তবে জাতিসঙ্ঘ ও শীর্ষ এনজিওগুলো বলছে, বর্তমানে অনুমোদিত সংস্থার সংখ্যা গাজার ন্যূনতম চাহিদা পূরণেও যথেষ্ট নয়। দুই মিলিয়নের বেশি মানুষ এখনো মানবিক সঙ্কটে রয়েছে; অনেক পরিবার দিনে মাত্র একবেলা খাবার পাচ্ছে এবং শীতের মধ্যে এক মিলিয়নের বেশি মানুষের উন্নত আশ্রয়ের প্রয়োজন।
ইসরাইল নতুন নিবন্ধন নীতির আওতায় সহায়তা সংস্থাগুলোর কর্মীদের ব্যক্তিগত তথ্য চেয়েছে এবং ইসরাইলবিরোধী বক্তব্যকে নিষেধাজ্ঞার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, এসব তথ্য দিলে স্থানীয় কর্মীরা ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। জাতিসঙ্ঘের হিসাবে, যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৫০০-এর বেশি ত্রাণকর্মী নিহত হয়েছেন।
চিকিৎসা খাতে প্রভাব সবচেয়ে ভয়াবহ হতে পারে। এমএসএফ গাজায় ছয়টি হাসপাতাল, দু’টি ফিল্ড হাসপাতাল ও আটটি ক্লিনিক পরিচালনা করে এবং শিশুদের অপুষ্টি চিকিৎসাকেন্দ্র চালায়। সংস্থাটি জানিয়েছে, তাদের কাজ বন্ধ হলে হাজারো রোগীর চিকিৎসা ও প্রসবসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। ত্রাণ সংস্থাগুলোর মতে, এই সিদ্ধান্ত আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সহায়তা কার্যক্রমকে কার্যত অচল করে দিচ্ছে। পরিস্থিতি দ্রুত বদলানো না হলে গাজায় মানবিক দুর্ভোগ আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
গাজা ‘পিস কাউন্সিল’ স্থগিত ঘোষণা ট্রাম্পের
আরব নিউজ আরো জানায়, গাজায় যুদ্ধ-পরবর্তী শাসনব্যবস্থা গঠনের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত ‘গাজা পিস কাউন্সিল’ ঘোষণা আপাতত স্থগিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইসরাইলি দৈনিক মারিবের খবরে বলা হয়েছে, ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে অপহরণ করে নিউ ইয়র্কে নেয়ার ঘটনার পর এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
গাজায় যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এই পিস কাউন্সিল, যার মাধ্যমে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে গাজায় একটি বেসামরিক-রাজনৈতিক প্রশাসন গঠনের কথা বলা হয়েছে। তবে পরিকল্পনার নিরাপত্তা অংশ, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠনের বিষয়টি জটিল হয়ে উঠেছে। মারিব জানায়, শুরু থেকেই ইসরাইল এই বাহিনী গঠনের বাস্তবতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। ওয়াশিংটনও এখন স্বীকার করছে যে, গাজায় সেনা পাঠাতে আগ্রহী দেশ খুঁজে পাওয়া কঠিন, কারণ হামাস এখনো সামরিক সক্ষমতা ও ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো ধরে রেখেছে।
তবে ট্রাম্পের সাথে বৈঠকে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্টভাবে গাজায় তুরস্কের সেনা মোতায়েনের বিরোধিতা করেছেন। ইসরাইল অংশগ্রহণকারী দেশ বাছাইয়ে ভেটো ক্ষমতাও দাবি করেছে। ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত ইসরাইলের অবস্থান পুরোপুরি গ্রহণ করবেন কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭১ হাজার ৩৮৫
ইসরাইলের সামরিক অভিযানে গাজা উপত্যকায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭১ হাজার ৩৮৫ জনে পৌঁছেছে। রোববার স্থানীয় চিকিৎসা সূত্রগুলো ফিলিস্তিনি গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানিয়েছে। গতকাল গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, শেষ ৪৮ ঘণ্টায় অন্তত তিনজন নিহত ও ১৩ জন আহত অবস্থায় গাজার বিভিন্ন হাসপাতালে আনা হয়েছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরাইলের আগ্রাসন শুরুর পর থেকে গাজায় ব্যাপক প্রাণহানি ও মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। হাসপাতাল, আবাসিক এলাকা ও শরণার্থী শিবিরে হামলার কারণে মৃতের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। চিকিৎসা সূত্রগুলো বলছে, অব্যাহত হামলা, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি এবং বিদ্যুৎসঙ্কটের কারণে আহতদের যথাযথ চিকিৎসা দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক হাসপাতাল আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে অচল অবস্থায় রয়েছে।
গাজায় দারিদ্র্য ও বেকারত্ব চরমে, ধসে পড়েছে অর্থনীতি
তা ছাড়া আলজাজিরা জানায়, ইসরাইলের টানা যুদ্ধের দুই বছরে গাজা উপত্যকার অর্থনীতি কার্যত ভেঙে পড়েছে। উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও আয়-সব সূচকেই নেমেছে নজিরবিহীন পতন। জাতিসঙ্ঘ ও স্থানীয় সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে গাজার অর্থনীতি কমেছে প্রায় ৮৭ শতাংশ, দারিদ্র্য আরো গভীর হয়েছে এবং লক্ষাধিক মানুষ আয়হীন অবস্থায় পড়েছে।
মধ্য গাজা সিটির একটি জাতিসঙ্ঘ পরিচালিত স্কুলে স্থাপিত ছোট্ট একটি তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছেন ৪১ বছর বয়সী আলা আলজানিন। স্ত্রী, পাঁচ সন্তান, ৭১ বছর বয়সী মা ও এক বোনকে নিয়ে তিনি সেখানে বৃষ্টি ও শীত থেকে বাঁচার চেষ্টা করছেন। ইসরাইলের যুদ্ধে বেইত হানুনে তাদের বাড়ি ধ্বংস হয়। আটবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর এই তাঁবুই এখন তাদের শেষ আশ্রয়। দিনমজুর আলজানিন এখন সম্পূর্ণ বেকার। আগে তিনি অবকাঠামো ও কৃষি খাতে কাজ করে দিনে ৪০-৫০ শেকেল আয় করতেন। এখন তিনি বলেন, ‘কাজ নেই, পরিবার চালানোর কোনো উপায়ও নেই।’
একই বাস্তবতার মুখোমুখি ৫৩ বছর বয়সী মাজেদ হামুদা। জাবালিয়ার এই বাসিন্দা পোলিও আক্রান্ত, তার স্ত্রী থ্যালাসেমিয়ার বাহক। পাঁচ সন্তানের পরিবার নিয়ে তিনি রিমাল এলাকার একটি স্কুল ক্যাম্পে থাকছেন। অসুস্থতার কারণে কাজ করতে না পারায় যুদ্ধের আগে যে সরকারি সহায়তা পেতেন, সেটিও বন্ধ হয়ে গেছে। কোনো কোনো দিন খাবার না থাকলে তিনি তার ছোট ছেলেকে রাস্তায় প্লাস্টিক ও আবর্জনা কুড়িয়ে বিক্রি করতে পাঠান। অথচ সেই ছেলে ইয়াকুব ছিল উত্তর গাজার স্কুলগুলোর মেধাবী শিক্ষার্থী, ‘লিটল সায়েন্টিস্ট’ পুরস্কারও পেয়েছিল। এখন তাকে খাবারের লাইনে দৌড়াতে দেখে বাবা চোখের পানি ধরে রাখতে পারেন না।
দুই বছরের বেশি সময়ের যুদ্ধে গাজা প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। জাতিসঙ্ঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, অবরুদ্ধ এই ভূখণ্ডে প্রবেশ করা সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। প্রতিদিন দুই হাজার টন সহায়তার লক্ষ্য থাকলেও মাত্র দু’টি ক্রসিং খোলা থাকায় এবং ইসরাইলি বিধিনিষেধের কারণে তা পূরণ হচ্ছে না।
ফিলিস্তিনি কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর অক্টোবরের রিপোর্টে বলা হয়েছে, যুদ্ধে ফিলিস্তিনে বেকারত্ব বেড়ে ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে, আর গাজায় তা ৮০ শতাংশ। মোট বেকার মানুষের সংখ্যা পাঁচ লাখ ৫০ হাজার। জাতিসঙ্ঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলন (ইউএনসিটিএডি) জানিয়েছে, ফিলিস্তিনি জিডিপি নেমে গেছে ২০১০ সালের স্তরে, আর মাথাপিছু আয় ফিরে গেছে ২০০৩ সালের পর্যায়ে। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরে মুছে গেছে ২২ বছরের উন্নয়ন ।
গাজা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মহাপরিচালক মাহের আলতাব্বা জানান, যুদ্ধের আগে বেসরকারি খাত ছিল অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, যা কর্মসংস্থানের ৫২ শতাংশ জোগান দিত। কৃষি খাতেও স্বয়ংসম্পূর্ণতা ছিল। এখন ২০২৪ সালে জিডিপি কমেছে ৮৩ শতাংশ, দুই বছরে নেমে এসেছে মাত্র ৩৬২ মিলিয়ন ডলারে। মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ১৬১ ডলারে, যা বিশ্বের সর্বনি¤œগুলোর একটি। গাজার সরকার বলছে, আবাসন ও অবকাঠামোসহ ৯০ শতাংশ খাত ধ্বংস হয়েছে এবং মোট ক্ষতি প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার। ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ পুনরুজ্জীবন, জরুরি কর্মসংস্থান কর্মসূচি এবং সব ক্রসিং খুলে কাঁচামাল প্রবেশের সুযোগ না দিলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। গাজার সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এই ধ্বংসস্তূপ থেকে অর্থনীতি ও জীবনকে আবার দাঁড় করানো।



