পবিত্র ঈদুল আজহার উৎসব শেষ হতে না হতেই রাজধানীর প্রাণ বুড়িগঙ্গা নদী আবারো মারাত্মক পরিবেশ দূষণের শিকার হয়েছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কোরবানি করা পশুর রক্ত ও তরল বর্জ্য ড্রেন ও খালের মাধ্যমে সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ায় অনেক স্থানে পানির রঙ লালচে-কালচে হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র দুর্গন্ধ, যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
সরেজমিনে পুরান ঢাকার শ্যামবাজার, নয়াবাজার পয়েন্ট ও মিলব্যারাক এলাকায় দেখা গেছে, ঈদের পর থেকে বিভিন্ন ড্রেন দিয়ে পশুর রক্ত ও বর্জ্যমিশ্রিত পানি অবিরাম নদীতে প্রবাহিত হচ্ছে। স্থানীয় কিছু বাসিন্দা অসচেতনতাবশত পশুর নাড়িভুঁড়ি ও অন্যান্য উচ্ছিষ্টাংশ ড্রেনে ফেলে দেয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানির সাথে এসব বর্জ্য দ্রুত নদীতে মিশে যাচ্ছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, পশুর রক্তে উচ্চমাত্রার জৈব উপাদান থাকে। এসব উপাদান পানিতে মিশে পচন প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ অক্সিজেন ব্যবহার করে, ফলে পানির বায়োলজিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (ইঙউ) বেড়ে যায়। এতে নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা দ্রুত কমে যায় এবং জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়।
গবেষকদের মতে, এমনিতেই বুড়িগঙ্গার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা অত্যন্ত কম। তার ওপর কোরবানির রক্ত ও জৈব বর্জ্যরে অতিরিক্ত চাপ নদীর পরিবেশগত ভারসাম্যকে আরো সঙ্কটাপন্ন করে তুলছে। এর ফলে মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, সিটি করপোরেশন কোরবানির বর্জ্য অপসারণে কাজ করলেও ড্রেন ও সুয়ারেজ লাইনে জমে থাকা তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এখনো কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। অন্য দিকে সীমিত সক্ষমতার কারণে রাজধানীর বিপুল পরিমাণ তরল বর্জ্য যথাযথ শোধন ছাড়াই নদীতে গিয়ে পড়ছে।
পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, রক্ত ও জৈব বর্জ্য ড্রেনে জমে থাকলে তা মশা-মাছির বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে। এতে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন পানিবাহিত ও পরিবেশবাহিত রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে।
নদী রক্ষা আন্দোলনের কর্মীদের মতে, কোরবানির সময় রক্ত ও বর্জ্য সরাসরি ড্রেনে না ফেলে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে অপসারণ করা উচিত। পাশাপাশি আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কঠোর নজরদারির মাধ্যমে এ ধরনের দূষণ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী বুড়িগঙ্গাকে রক্ষা করতে হলে উৎসবকেন্দ্রিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি, বিজ্ঞানভিত্তিক ও কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায় নদীটির পরিবেশগত সঙ্কট আরো গভীর হতে পারে।



