- ভুক্তভোগী পরিবারের মানববন্ধন
- আত্মসাৎ করা অর্থ ফেরত দাবি
প্রতারণা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে শ্রী হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস ওরফে তাওহীদ ইসলামকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। ময়মনসিংহ জেলা যুগ্ম দায়রা জজ (অর্থ ও ঋণ) আদালত গত মঙ্গলবার এ আদেশ দেন। এ দিকে বুধবার ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাবের সামনে ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়রা মানববন্ধন করে। তারা হরিদাসের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, আত্মসাৎ করা অর্থ ফেরত এবং তার সহযোগীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
সরকারি কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট মো: আনোয়ার আজিজ টুটুল জানান, ঢাকা জেলার একটি মামলায় গ্রেফতারের পর ফুলবাড়িয়া থানার দায়ের করা প্রতারণা মামলায় তাকে আদালতে হাজির করা হয়। কোতোয়ালি সিআর মামলা নং-১৪৯১/২০১২ (এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারা) থেকে উদ্ভূত ৩২১৮/২০২৩ নম্বর মামলায় তার এক বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
গত ১২ জুলাই রাতে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী থেকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের একটি মামলায় তাকে গ্রেফতার করে। সিআইডির দাবি, তার ব্যাংক হিসাব ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে প্রায় ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। চার দিনের রিমান্ড শেষে ১৬ জুলাই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর মধ্যরামচন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা হরিদাস ২০১০ সালে ভারত থেকে ফিরে রাজধানীর উত্তরায় পুরনো এয়ার কন্ডিশনার (এসি) কেনাবেচা ও মেরামতের কাজ শুরু করেন। পরে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ‘তাওহীদ ইসলাম’ নাম ব্যবহার শুরু করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। পরবর্তীতে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় বসবাস শুরুর পর প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন।
তার বিরুদ্ধে সরকারি ঘর, নলকূপ, চাকরি, বদলি ও টেন্ডার পাইয়ে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে নিজের সম্পাদিত ছবি ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতেন তিনি। ২০২২ সালে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও র্যাবের যৌথ অভিযানে গ্রেফতার হলেও পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান।
ফুলবাড়িয়ার বালিয়ান এলাকায় নির্মিত তার বিলাসবহুল একটি রিসোর্ট নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি খাসজমি ও খালের অংশ দখল করে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপনাটি নির্মাণ করা হয়। পরে সেটির নাম বদলে ‘প্যারিস সুইমিংপুল এন্টারটেইনমেন্ট পার্ক’ রাখা হয়। চলতি বছরের জুনে গাইবান্ধায় ৮১ ফুট উচ্চতার রামমূর্তি নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে তিনি আবারো আলোচনায় আসেন। পরে স্থানীয় মন্দির কর্তৃপক্ষ নির্মাণকাজ স্থগিত করে।
বুধবারের মানববন্ধন শেষে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারের কাছে একটি স্মারকলিপিও দেয়া হয়। এতে পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- হরিদাসের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা, আত্মসাৎ করা অর্থ দ্রুত ফেরত ও ক্ষতিপূরণ প্রদান, প্রতারণা ও ষড়যন্ত্রে জড়িত সহযোগীদের বিচারের আওতায় আনা, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করে প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ দেয়া।
স্মারকলিপিতে অভিযোগ করা হয়, তিনি নিজেকে শেখ হাসিনার পরিবারের ‘প্রটোকল অফিসার’ পরিচয় দিয়ে সরকারি চাকরি, বদলি, উন্নয়ন প্রকল্প ও টেন্ডার পাইয়ে দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ফুলবাড়িয়া উপজেলার শতাধিক পরিবারের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। অভিযোগে আরো বলা হয়, প্রতারণাকে বিশ্বাসযোগ্য করতে তিনি সম্পাদিত ছবি ব্যবহার করতেন।
ভুক্তভোগী আবুল কালাম দাবি করেন, ছেলেকে চাকরি দেয়ার আশ্বাস দিয়ে তার কাছ থেকে ১৩ লাখ টাকা নেয়া হয়। পরে বিভিন্ন প্রকল্পের নামে আরো অর্থ নেয়ায় তিনি প্রায় ৩৫ লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়েন এবং পাওনা শোধ করতে নিজের জমিও বিক্রি করতে হয়েছে। আরেক ভুক্তভোগী সফিকুল ইসলাম বলেন, তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে ১৪ লাখ ৫২ হাজার টাকার রড, সিমেন্ট, স্যানিটারি সামগ্রী ও ৩৬টি মোটর পাম্প নেয়া হলেও এখনো কোনো অর্থ পরিশোধ করা হয়নি।
মানবাধিকারকর্মী গোলাম মোরশেদ খানের দাবি, প্রতারণার তথ্য প্রকাশ করায় তাকে অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। রাজি না হওয়ায় তিনি হোয়াটসঅ্যাপে হত্যার হুমকি পান এবং পরে হামলারও শিকার হন।
এদিকে সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট হরিদাসের নামে-বেনামে থাকা ব্যাংক হিসাব, এমএফএস লেনদেন, জমি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ফুলবাড়িয়ার রিসোর্টে বিনিয়োগ এবং সম্পদের বৈধতার উৎস তদন্ত করছে। একই সাথে তার আর্থিক লেনদেনের সাথে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রতিবেদনে উল্লিখিত প্রতারণা, অর্থপাচার, জমি দখল ও অন্যান্য অভিযোগের কয়েকটি বর্তমানে তদন্তাধীন বা বিচারাধীন। এসব অভিযোগের বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায় এখনো হয়নি।



