আজ ম্যাচে স্বাভাবিক আবহ থাকবে তো!

Printed Edition

জসিম উদ্দিন রানা

বাংলাদেশ-পাকিস্তান সিরিজের তৃতীয় ম্যাচটি যেন মাঠে গড়ানোর আগেই উত্তাপ ছড়িয়েছে মাঠের বাইরে। দ্বিতীয় ম্যাচে অধিনায়ক মিরাজের করা রান আউটকে ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা। পাকিস্তানের ব্যাটার সালমান আলী আগা ক্রিজ ছাড়ার মুহূর্তে মিরাজ বল স্টাম্পে আঘাত করলে নিয়ম মেনেই আউট দেন আম্পায়ার। কিন্তু সেই ঘটনাকেই কেন্দ্র করে পাকিস্তান শিবিরে যেন ঝড় উঠেছে।

সাবেক ও বর্তমান পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা এটিকে স্পোর্টসম্যানশিপের প্রশ্ন টেনে এনে মিরাজকে আক্রমণ করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে সমালোচনার ঝড়। এমনকি ভারতের কয়েকজন ক্রিকেটারও আলোচনায় যোগ দিয়ে বিতর্ককে আরো উসকে দিয়েছেন। ফলে ক্রিকেটের একটি স্বাভাবিক আউট যেন আবেগ ও প্রতিক্রিয়ার বড় মঞ্চে পরিণত হয়েছে। তবে ক্রিকেটের ইতিহাস বলছে, উত্তেজনা আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা খেলাটিরই অংশ। নিয়মের ভেতরে থাকা কোনো সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে আবেগ তৈরি হওয়া নতুন কিছু নয়। বরং অনেক সময় এমন ঘটনাই ম্যাচের রঙ আরো গাঢ় করে দেয়।

আজকের ম্যাচটি তাই শুধু সিরিজ নির্ধারণী নয়, মানসিক শক্তিরও পরীক্ষা। স্বাগতিক বাংলাদেশ চাইবে মাঠের ক্রিকেট দিয়েই সব প্রশ্নের উত্তর দিতে। অন্য দিকে পাকিস্তান চাইবে বিতর্ককে শক্তিতে পরিণত করে সমুচিত জবাব দিতে। তবে বাস্তবতা হলো মাঠে যখন প্রথম বলটি ছোড়া হবে, তখন অতীতের সব আলোচনা ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যাবে। তখন সামাজিক মাধ্যমের ঝড় থাকবে না, কথা বলবে ব্যাট আর বল। সেই অর্থে আজকের ম্যাচে উত্তেজনা থাকবেই, কিন্তু সেটি প্রতিশোধের না হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নেয়, তবেই জিতবে ক্রিকেট। কারণ শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্যই হলো, সব বিতর্কের চূড়ান্ত জবাব খেলার মাঠেই দেয়া।

মিরাজের হাতে সালমানের রান আউট এখন ক্রিকেট দুনিয়ায় বড় বিতর্ক। কেউ বলছেন নিয়ম মেনেই হয়েছে আউট। আবার কেউ বলছেন, খেলাধুলার চেতনার জায়গা থেকে সিদ্ধান্তটা ভালো দেখায়নি। মুখ খুলেছেন পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটার বাসিত আলী। তার মতে, আইন অনুযায়ী সালমানের আউট হওয়াটা ঠিক ছিল। কিন্তু পুরো ঘটনার সময় কিছু বিষয় আরো ভালোভাবে সামলানো যেত। বাসিত আলী বলছেন, ক্রিকেটে স্পোর্টসম্যান স্পিরিট নিয়ে আগে থেকেও অনেক আলোচনা হয়েছে।

তার কথায়, ‘স্পোর্টসম্যান স্পিরিট নিয়ে অনেক কথা হয়েছে, যেমন সাকিব এবং অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউসের ঘটনা। একবার শচিন টেন্ডুলকার শোয়েব আখতারের সাথে ধাক্কা লেগে রান আউট হয়েছিল, তখন পাকিস্তান বলেছিল সিদ্ধান্ত ঠিক আছে। সালমান যেভাবে আউট হয়েছে তা ক্রিকেটের আইন অনুযায়ী ঠিক ছিল। কিন্তু সে যখন বলটি বোলারের দিকে এগিয়ে দিতে যাচ্ছিল, তৃতীয় আম্পায়ারের কাছে পাঠানোর আগে অধিনায়ককে জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল যে এটি স্পোর্টসম্যান স্পিরিটের পরিপন্থী, তিনি আপিল প্রত্যাহার করবেন কি না। অধিনায়ক যদি আউটের আবেদন তুলে নিতেন, তাহলে ঘটনাটি এত বড় বিতর্কে গড়াত না। তখন সেটিকে খেলাধুলার চেতনার একটি উদাহরণ হিসেবেই দেখা যেত।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই রান আউট নিয়ে হাজার হাজার মন্তব্য হয়েছে। অনেকেই বলছেন এটি পুরোপুরি বৈধ আউট। আবার অনেকে বলছেন, ক্রিকেটের সৌন্দর্য এমন সিদ্ধান্তে নষ্ট হয়। বাসিত আলীর মতে, দলের ভেতর থেকেও বিষয়টি সামাল দেয়া যেত। দলের অন্য খেলোয়াড়রা হয়ত মিরাজকে বোঝাতে পারত। এটি তো আইসিসি ইভেন্ট নয়, দ্বিপক্ষীয় সিরিজ। রাগ সবারই হয়। কিন্তু রাগ নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। রাগ থেকে অনেক ভুল হয়ে যায়। হেলমেট ছুড়ে ফেলে দেয়াটা আমার খারাপ লেগেছে।

শাস্তি পেলেন সালমান আগা

ব্যক্তিগত ৬৪ রানে আউট হয়ে সাজঘরে ফেরার সময় গ্লাভস ও হেলমেট ছুড়ে মারেন সালমান। এ ছাড়া চেহারায়ও ছিল স্পষ্ট বিরক্তি। এ ঘটনায় ম্যাচ রেফারি তাকে তিরস্কার করার পাশাপাশি একটি ডিমেরিট পয়েন্ট দিয়েছেন। সালমান অবশ্য মানছেন, মিরাজের রান আউট করা উচিত হয়নি। স্পোর্টসম্যান স্পিরিট সবার আগে থাকবে, যে পরিস্থিতিই হোক না কেন। সে যা করেছে তা আইনে আছে। তার জায়গায় সে সঠিক। যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, আমি হলে এখানে ভিন্ন কিছু করতাম। আমি স্পোর্টসম্যান স্পিরিটকেই প্রাধান্য দিতাম।

এখানে চ্যারিটি খেলতে আসিনি

সালমান আউট হওয়ার পর বেশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান। মিরাজের সাথে তার কিছু কথা কাটাকাটিও হয়। সেই সময় অন্য ক্রিকেটাররাও সেখানে জড়ো হন। সালমান যখন ড্রেসিং রুমে ফিরছিলেন, তখনো তাকে কিছু বলতে দেখা যায়। ঠিক তখনই লিটন কুমার দাসকে বেশ তেড়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে তার দিকে এগিয়ে যান। সেই মুহূর্তে পাকিস্তানের ব্যাটার মোহাম্মদ রিজওয়ান এগিয়ে এসে লিটনকে থামানোর চেষ্টা করেন। ম্যাচ শেষে লিটন বলেন, প্রথমত, এখানে কেউ চ্যারিটি লিগ খেলতে আসেনি, এটা আন্তর্জাতিক ম্যাচ। যেহেতু আইনে আছে আউট, আমি তো এখানে কোনো অ্যাঙ্গল থেকেই দেখি না স্পোর্টসম্যানশিপ নষ্ট হওয়া বা অন্য কোনো কিছু।’

বাংলাদেশকে বিশ্বাস করা ক্রাইম

মিরাজের এই রানআউটের প্রসঙ্গে টেনে বাংলাদেশকে খোঁচা দিয়েছেন ভারতের সাবেক খেলোয়াড় অজয়। এক্সে ভারতের সাবেক ক্রিকেটার লিখেছেন, ‘অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুসের টাইমআউট থেকে সালমান আগার বিতর্কিত রানআউট, মনে হচ্ছে বাংলাদেশকে বিশ্বাস করা একটা ক্রাইম। তাদের বিপক্ষে খেলতে হলে সব দলকে অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।’