বিশেষ সংবাদদাতা
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) বাংলাদেশে বিদেশী ঋণ প্রতিশ্রুতিতে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হালনাগাদ প্রতিবেদনে জানা গেছে, এ সময় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বাংলাদেশ প্রায় এক দশমিক ২১৯ বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতি পেয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩৩ শতাংশ বেশি।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বরে যেখানে বিদেশী ঋণ প্রতিশ্রুতি ছিল মাত্র ৫২২ দশমিক ৬৮ মিলিয়ন ডলার, চলতি অর্থবছরে তা বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। ইআরডি কর্মকর্তারা বলছেন, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসায় উন্নয়ন অংশীদারদের আস্থাও ধীরে ধীরে পুনর্গঠিত হচ্ছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব কাটানোর ইঙ্গিত : ইআরডি সূত্র জানায়, গত অর্থবছরে গণ-অভ্যুত্থান, সরকার পতন, প্রশাসনিক অচলাবস্থা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে এক ধরনের ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ (অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ) মনোভাব তৈরি হয়েছিল। ফলে নতুন প্রকল্প অনুমোদন ও ঋণচুক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
কিন্তু চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেয়ার গতি বাড়া, প্রকল্প পর্যালোচনায় স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে সক্রিয় কূটনৈতিক যোগাযোগের ফলে পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
ছাড় বাড়লেও ঋণ পরিশোধ প্রায় সমান : ইআরডি প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, জুলাই-নভেম্বর সময়ে উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশকে এক দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে। একই সময়ে বাংলাদেশকে এক দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার বিদেশী ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই চিত্রটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এতে বোঝা যাচ্ছে- নতুন ঋণ ছাড়ের প্রায় পুরো অংশই চলে যাচ্ছে পুরনো ঋণ পরিশোধে; নেট বৈদেশিক ঋণপ্রবাহ (ঘবঃ ঋড়ৎবরমহ খড়ধহ ওহভষড়)ি খুব সীমিত; বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ঋণের সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব কম।
ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের পাঁচ মাসে সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ১২২ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। তবে বিগত নভেম্বর মাসে কোনো প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি। সার্বিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে ৫৮ কোটি ডলার মিলেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছ থেকে। আর বিশ্বব্যাংকের কাছে প্রায় দুই কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। অন্যান্য দাতা সংস্থা ও দেশ ওই চার মাসে সাড়ে ৬২ কোটি ডলার দেবে বলে জানিয়েছে।
যদিও আলোচ্য সময়ে বড় কয়েকটি দেশ- ভারত, চীন, রাশিয়া ও জাপান কোনো ঋণের প্রতিশ্রুতি দেয়নি। তবে নতুন করে প্রতিশ্রুতি না দিলেও তারা আগে নেয়া ঋণের অর্থ ছাড় করেছে বলে ইআরডির পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকও (এআইআইবি) গত পাঁচ মাসে ঋণের কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
ঋণনির্ভর উন্নয়ন বনাম ঋণচক্রের ঝুঁকি : বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ঋণ প্রতিশ্রুতি ও ছাড় বাড়ার গতি আপাতদৃষ্টিতে স্বস্তির হলেও এর গুণগত দিক বিশ্লেষণ জরুরি। একজন উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ বলেন, যদি নতুন ঋণের বড় অংশ পুরনো ঋণ শোধেই চলে যায়, তাহলে আমরা কার্যত একটি ঋণচক্রে ঢুকে পড়ছি। এতে অবকাঠামো বা উৎপাদনমুখী খাতে প্রকৃত বিনিয়োগ বাড়ে না।
তিনি আরো বলেন, সুদহার বাড়া ও ডলার সঙ্কটের প্রেক্ষাপটে বিদেশী ঋণের শর্ত, গ্রেস পিরিয়ড এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কারা কত ঋণ ছাড় করেছে : অর্থবছরের পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) সবচেয়ে বেশি ঋণ ছাড় করেছে রাশিয়া। দেশটি পাঁচ মাসে দিয়েছে ৫৫ কোটি ডলার। এরপর আছে বিশ্বব্যাংক। এই সংস্থা দিয়েছে ৪৩ কোটি ডলার। আর এডিবি দিয়েছে সাড়ে ৩৩ কোটি ডলার। চীন ও ভারত ছাড় করেছে যথাক্রমে সাড়ে ১৯ কোটি ডলার ও ৯ কোটি ডলার। জাপান দিয়েছে সাড়ে ৮ কোটি ডলার।
ইআরডির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে খাদ্যসহায়তা বাবদ কোনো প্রতিশ্রুতি মেলেনি। কিন্তু এ সময়ে এক কোটি ডলার পাওয়া গেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল এক কোটি ৫০ লাখ ডলার।
প্রকল্প বিলম্ব রোধে আরোপ হচ্ছে ছয় শর্ত: এই প্রেক্ষাপটে সরকার বিদেশী অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর বিলম্ব ও অপচয় ঠেকাতে ছয়টি শর্ত আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে ইআরডি সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে- প্রকল্প অনুমোদনের আগে বাস্তবসম্মত ব্যয় ও সময় নির্ধারণ; ভূমি অধিগ্রহণ ও নকশা প্রস্তুতির আগেই ঋণচুক্তি না করা; প্রকল্প পরিচালকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা; ছাড়ের হার অনুযায়ী কর্মক্ষমতা মূল্যায়ন, মেয়াদ শেষে প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন এবং অকার্যকর প্রকল্প বাতিল বা পুনর্গঠন।
সরকার মনে করছে, এসব শর্ত কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বিদেশী ঋণের কার্যকারিতা বাড়বে এবং উন্নয়ন অংশীদারদের আস্থাও দীর্ঘমেয়াদে সুদৃঢ় হবে।
সামনে চ্যালেঞ্জ ও নীতিগত প্রশ্ন : বিদেশী ঋণ প্রতিশ্রুতির এই ঊর্ধ্বগতি অর্থনীতির জন্য স্বস্তির ইঙ্গিত দিলেও কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসছে- এই ঋণগুলো কি উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে? ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা বাড়াতে রফতানি ও রাজস্ব আয় কতটা শক্তিশালী হচ্ছে? নাকি বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ‘রোলওভার-নির্ভর’ ঋণ ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে?
বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশী ঋণ ব্যবস্থাপনায় এখন সবচেয়ে জরুরি হলো সংখ্যার চেয়ে গুণমানকে গুরুত্ব দেয়া। অন্যথায় ঋণ প্রতিশ্রুতির পরিসংখ্যান যতই উজ্জ্বল হোক, বাস্তব অর্থনীতিতে তার সুফল সীমিতই থেকে যাবে।
এ অবস্থায় ইআরডি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ফেব্রুয়ারিতে দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে নির্বাচিত একটি সরকার দায়িত্ব নেবেন। আশা করা যাচ্ছে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে দাতাদের কাছ থেকে আরো বেশি করে ঋণের প্রতিশ্রুতি মিলবে, সেই সাথে ঋণের ছাড়ও বাড়বে।



