নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের আট লক্ষাধিক ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারের জাতীয় ভিত্তিক বৃহত্তম পেশাজীবী সংগঠন ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের (আইডিইবি) সাংগঠনিক অচলাবস্থা নিয়ে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। সংগঠনটির নেতৃত্ব পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় ডিগ্রি ইঞ্জিনিয়ারদের প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা প্রকাশ করে এ সঙ্কট নিরসনে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আইডিইবির মতো বিপুলসংখ্যক ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারের প্রতিনিধিত্বকারী একটি পেশাজীবী সংগঠনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ায় ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার ও সাংগঠনিক স্বাতন্ত্র্য প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শুধু আইডিইবির সাংগঠনিক কার্যক্রমই ব্যাহত হবে না, দেশের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থীদের পেশাগত স্বার্থও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জানা যায়, গত ৩০ জুন ২০২৬ আইডিইবির অন্তর্বর্তীকালীন কেন্দ্রীয় কমিটি সমাজসেবা অধিদফতর কর্তৃক অনুমোদনের মেয়াদ শেষ হয়। পরে সমাজসেবা অধিদফতরের মাধ্যমে কমিটির মেয়াদ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বৃদ্ধির একটি আদেশ জারি হলেও মাত্র তিন দিনের মধ্যে তা বাতিল করা হয়। এতে সংগঠনটির সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয় এবং আইডিইবি কার্যত নেতৃত্বের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।
এ দিকে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ার দায়িত্ব যাদের ওপর ন্যস্ত হয়েছে, তাদের পেশাগত পরিচয় ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ততা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে একজন ডিগ্রি ইঞ্জিনিয়ার এবং ডিগ্রি ইঞ্জিনিয়ারভিত্তিক একটি পেশাজীবী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। অন্য দিকে সমাজসেবা অধিদফতরের নিয়ন্ত্রক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা ডা: এ জেড এম জাহিদ হোসেনের প্রকৃচির সাথে সম্পৃক্ততা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে আইডিইবির নেতৃত্ব পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় স্বার্থের সঙ্ঘাতের সম্ভাবনা রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, বিষয়টি কোনো ব্যক্তি বা পেশাজীবী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নয় বরং আইডিইবির সাংগঠনিক স্বাধীনতা, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের প্রতিনিধিত্ব এবং সংগঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার প্রশ্ন।
সংশ্লিষ্টরা আরো বলেন, আইডিইবি শুধু একটি পেশাজীবী সংগঠন নয়; দেশের বিপুলসংখ্যক ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারের পেশাগত অধিকার, মর্যাদা, শিক্ষা, পদোন্নতি, কর্মক্ষেত্র ও ন্যায্য অংশীদারত্বের সাথে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সরাসরি সম্পৃক্ত। ফলে এর নেতৃত্ব নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের মতামত ও অংশগ্রহণ উপেক্ষিত হলে তা দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে।
এ অবস্থায় আইডিইবির সাংগঠনিক অচলাবস্থা মোকাবেলা এবং ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের বৃহত্তর স্বার্থ রক্ষায় প্রকৌশলী মো: কবীর হোসেনসহ কয়েকজন নেতা নিয়মিত সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, সঙ্কটের স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন একটি বৈধ, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণভিত্তিক নেতৃত্ব।
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ায় যদি অন্য কোনো পেশাজীবী গোষ্ঠীর প্রভাব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের স্বার্থ ও মতামতের ওপর প্রাধান্য পায়, তাহলে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, পদোন্নতি, পদবিন্যাস, পেশাগত মর্যাদা ও কর্মক্ষেত্রে অধিকার নিয়ে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে যে অসন্তোষ রয়েছে, সাংগঠনিক নেতৃত্বের প্রশ্নে নতুন করে অনাস্থা সৃষ্টি হলে তা বড় ধরনের আন্দোলনে রূপ নিতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, আট লক্ষাধিক ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার ও কয়েক লক্ষ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি সংগঠনকে দীর্ঘদিন নেতৃত্বশূন্য বা সাংগঠনিকভাবে দুর্বল অবস্থায় রাখা হলে পরিস্থিতি রাজপথের আন্দোলনের দিকে গড়াতে পারে। এতে শুধু আইডিইবি নয়, দেশের প্রকৌশল কর্মাঙ্গন ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাঙ্গনেও অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাদের মতে, এমন আন্দোলন সৃষ্টি হলে এর রাজনৈতিক অভিঘাতও সরকারের ওপর পড়তে পারে। বিশেষ করে জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ^াসী বিপুলসংখ্যক ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হলে দীর্ঘমেয়াদে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের একটি বড় অংশকে বিএনপি সরকারের সাথে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফলে বিষয়টি কেবল একটি পেশাজীবী সংগঠনের অভ্যন্তরীণ সঙ্কট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের নেতৃবৃন্দ মনে করেন, ডিগ্রি ইঞ্জিনিয়ার ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার উভয়েই দেশের প্রকৌশল পরিবারের অপরিহার্য অংশ। দেশের উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে উভয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রত্যেক পেশাজীবী গোষ্ঠীর নিজস্ব প্রতিনিধিত্ব, সাংগঠনিক স্বাতন্ত্র্য এবং অধিকারও সমানভাবে সংরক্ষিত হওয়া প্রয়োজন।
তাদের বক্তব্য, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের বৃহত্তম সংগঠন আইডিইবির নেতৃত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের মতামত ও অংশগ্রহণই সর্বাগ্রে নিশ্চিত করতে হবে। কোনো বাইরের পেশাজীবী গোষ্ঠীর প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ আইডিইবির সাংগঠনিক কাঠামোকে দুর্বল করতে পারে- এমন কোনো পরিস্থিতি গ্রহণযোগ্য নয়।
এ কারণে আইডিইবির বর্তমান সাংগঠনিক সঙ্কট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সংশ্লিষ্টরা।



