- সারা দেশে পুকুর-খাল উন্নয়ন প্রকল্প
- বছরের প্রকল্পের সমাপ্তি নিয়ে শঙ্কা
পতিত আওয়ামী সরকারের আমলে নেয়া প্রকল্পগুলো আগের মতোই চলছে। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অগ্রগতি নেই। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে দুর্বলতার কারণে সারা দেশে পুকুর-খাল উন্নয়নে ছয় বছরের প্রকল্পটির বাড়ানোর সময়ের পৌনে আট বছরে অগ্রগতি মাত্র ৫৯ শতাংশ। যেখানে বর্ধিত সময়ের মাত্র এক বছর বাকি আছে। প্রকল্পের শুরুতে জমিসংক্রান্ত জটিলতা, লিজ, দখল ও ব্যক্তিমালিকানার পুকুর এবং খালের অপর্যাপ্ত প্রশস্ততা ইত্যাদি কারণে প্রকল্পটির গতি অনেকাংশই মন্থর। ২০২৩ সালের জুনে যে প্রকল্পটি সমাপ্ত হওয়ার কথা ছিল সেটি এখন ২০২৬ সালের জুনেও শেষ হবে কি না সংশয় পরিকল্পনা কমিশনের। সময় অতিক্রান্ত বিবেচনায় প্রকল্পটির অগ্রগতি অনেকাংশে পিছিয়ে আছে। অগ্রগতি বিবেচনায় অবশিষ্ট অনুমোদিত প্রকল্প মেয়াদে কাজ সম্পন্ন করা বেশ কঠিন হবে। আইএমইডির পক্ষে প্রকল্প যাচাই সংস্থা এমএস ডেভেলপমেন্ট এসোসিয়েট বলছে, এ ধরনের বড় প্রকল্প গ্রহণের আগে এলজিইডিকে পর্যাপ্ত প্রস্তুতিসহ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই গুরুত্বের সাথে করতে হবে। তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সমস্যাগুলো রোধ করা সম্ভব হবে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের সূত্র জানায়, পুকুর, দীঘি ও খাল খননের মাধ্যমে স্থানীয় যুবসমাজকে বিভিন্ন আয়বর্ধক কাজে যুক্ত করে বেকারত্ব দূরীকরণ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিই প্রকল্পের উদ্দেশ্য। সারা দেশের পুকুর দীঘি খালের জেলাওয়ারি তালিকা তৈরি করে তা খননের প্রাথমিক পরিকল্পনা করে বাস্তবায়নের জন্য ২০১৫ সালের ২৬ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগকে অনুরোধ জানানো হয়। এ ধারাবাহিকতায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) মাঠ পর্যায় থেকে সারা দেশের পুকুর, দীঘি-খালের প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করে। পরবর্তীতে এলজিইডির ইনট্রিগ্রেটেড ওয়াটার রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্ট ইউনিটের (আইডব্লিউআরএমইউ) মাধ্যমে সরেজমিন যাচাই-বাছাই করে খাল-দীঘি ও পুকুরগুলোর জেলাভিত্তিক তালিকা তৈরি করা হয়।
সে অনুযায়ী, এ প্রকল্পটি এক হাজার ৩৩৪ কোটি ৯৪ লাখ ৮৮ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে জুলাই ২০১৭ হতে জুন ২০২৩ পর্যন্ত বাস্তবায়নে ২০১৭ সালে একনেকে অনুমোদিত হয়। পরবর্তীতে মাটি খনন কাজে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে রিয়াল-টাইম ডাটা ট্রান্সমিশন ও ক্লাউড প্রযুক্তিসম্পন্ন ইন্টারনেট সাপোর্টেড (রবোটিক) টোটাল স্টেশন ও আর.টি.কে জিপিএস ইকুইপমেন্ট ক্রয়ে বিলম্ব, মেশিনের মাধ্যমে প্রি-ওয়ার্ক, পোস্ট-ওয়ার্ক জরিপ এবং ডাটা প্রসেসিং কাজে দক্ষ জনবল তৈরি, স্কিমসমূহের বাস্তবায়নযোগ্যতা যাচাই, প্রাক্কলন প্রস্তুতি ইত্যাদি কাজে কিছুটা বিলম্ব হওয়ায় প্রকল্প মন্থর হয়।
জানা গেছে, তখন ব্যয় ৪২২ কোটি ৫২ লাখ ৪৯ হাজার টাকা বা ৩১.৬৫ শতাংশ বাড়িয়ে এক হাজার ৭৫৭ কোটি ৪৭ লাখ ৩৭ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে জুলাই ২০১৭ হতে জুন ২০২৪ পর্যন্ত বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করে ১ম সংশোধন করা হয়। প্রকল্পের ডিপিপি ও ১ম সংশোধিত আরডিপিপিতে অনুমোদিত পুকুর ও খালের তালিকার মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক পুকুর ও খাস খালসমূহে জমিসংক্রান্ত জটিলতা, লিজ, দখল ও ব্যক্তিমালিকানার পুকুর এবং খালের অপর্যাপ্ত প্রশস্ততা ইত্যাদি কারণে অধিকাংশই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি ওই বর্ধিত সময়েও। ফলে গত ২০২৪ সালের জানুয়ারির শেষে খরচ ১৬২ কোটি ৫৯ লাখ ৩৭ হাজার টাকা বা ৯.২৫ শতাংশ কমিয়ে এক হাজার ৫৯৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকায় নির্ধারণ করা হয়। আর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। ফলে মেয়াদ ৯ বছরে উন্নীত হয়।
আইএমইডির তথ্য বলছে, প্রকল্পের কাজ ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি ৩৩.৬৫ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি মাত্র ৫০ শতাংশ। আর এলজিইডির তথ্য বলছে, চলতি বছরের ৪ মে পর্যন্ত প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি প্রায় পৌনে আট বছরে ব্যয় হয়েছে ৬৯২ কোটি ৬৫ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। যার বিপরীতে বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ৫৯ শতাংশ।
সার্বিক অগ্রগতিতে দেখা যায়, প্রকল্পের আওতাভুক্ত মোট বাস্তবায়নযোগ্য স্কিমের সংখ্যা তিন হাজার ৪৬৬টিসহ (পুকুর ও খাল) এবং ব্যয় ১৩১৪.৯৭ কোটি টাকা। প্রকল্পের ডিপিপি অনুযায়ী পণ্যসংক্রান্ত সাব-প্যাকেজসহ মোট ২৪টি প্যাকেজ রয়েছে। কিন্তু প্যাকেজগুলো ক্রয় পরিকল্পনায় ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করা হয়নি। পূর্ত কাজ (খাল ও পুকুর) খননসংক্রান্ত আটটি প্যাকেজের আওতায় ২২টি স্কিমে এক হাজার ৬০৯টি সিরিয়াল নাম্বার আকারে প্যাকেজ প্রদর্শিত আছে। এ প্যাকেজগুলোরও ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়নি। প্রকল্পের অধীনে রাজস্ব অংশে এ পর্যন্ত একটি মাত্র নিরীক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। জেলা পর্যায়ে মূলধন অংশে পূর্ত কাজের নিরীক্ষা কার্যক্রম প্রতি অর্থবছর সম্পন্ন হলেও প্রকল্প অফিসে কোনো নিরীক্ষা প্রতিবেদন সংরক্ষণ করা হয়নি। পরিকল্পনা কমিশনের পরিপত্র অনুযায়ী প্রকল্প পরিচালনার জন্য প্রতি তিন মাস অন্তর পিআইসি ও পিএসসি সভা আয়োজনের বিধান রয়েছে; সেটিও সঠিকভাবে হয়নি।
সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষক সংস্থা জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্বলতা যেসব রয়েছে তার মধ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে পর্যাপ্ত প্রয়োজনীয় তথ্যের সন্নিবেশ ঘটেনি।
আইএমইডির সংস্থা এমএস ডেভেলপমেন্ট এসোসিয়েট কর্মকর্তারা প্রকল্পটি সম্পর্কে জানান, প্রকল্পের ৯ বছর মেয়াদের মধ্যে প্রায় সাড়ে ছয় বছরে আর্থিক অগ্রগতি ৩৩.৬৫ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ৫০ শতাংশ ছিল, যা আশানুরূপ নয়। উদ্ধৃত সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের মাধ্যমে অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে হবে। তারা বলছেন, ভোলা জেলার চরফ্যাসন উপজেলায় আজুরহাট খালের উভয়পাড়ের স্লোপ অতিরিক্ত ভাড়া হওয়ায় এবং খননকৃত মাটির লেভেলিং ড্রেসিং না করার কারণে মাটি খালে পড়ে খালের পাড়ে বসবাসরত মানুষের ঘরবাড়ি ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। অতিদ্রুত খালের খননকৃত মাটি নির্দিষ্ট স্লোপ রেখে লেভেলিং ড্রেসিং করতে হবে। অধিকাংশ খননকৃত খালে দেখা যায়, খালের শোল্ডারে অতিরিক্ত মাটি রাখা হয়েছে। উক্ত শোল্ডারে মাটি নির্দিষ্ট স্লোপে লেভেলিং/ড্রেসিং করে দিতে হবে।



