মাদুরোকে অপহরণে ভেঙে পড়েছে নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে : জার্মানির প্রেসিডেন্ট
  • যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য দেশকে তাদের সাম্রাজ্য হিসেবে দেখছে : কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট

ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের ঘটনার মধ্য দিয়ে তথাকথিত ‘নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা’র অবসান ঘটেছে বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং এ ঘটনায় ইউরোপীয় মিত্রদের কার্যত নীরব ভূমিকা আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা আসলে পশ্চিমা শক্তিগুলোর তৈরি একটি ধারণা, যা আন্তর্জাতিক আইনের কঠোর বাধ্যবাধকতার বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। এই ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্য হলো- এর নিয়মগুলো বিশ্বের প্রায় সব দেশের জন্য প্রযোজ্য হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র পশ্চিমা দেশগুলোর ক্ষেত্রে তা কার্যত শিথিল। গত কয়েক দশকে রাশিয়া, ইসরাইল ও অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে এই দ্বৈত মানদণ্ড স্পষ্টভাবে দেখা গেছে।

ভেনিজুয়েলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বিপুল তেলসম্পদের দিকে নজর দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাবেক মনরো নীতিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করে যুক্তরাষ্ট্র এখন পশ্চিম গোলার্ধকে নিজেদের একচেটিয়া প্রভাববলয় হিসেবে দেখছে, যাকে বিশ্লেষকরা ‘ডনরো নীতি’ নামে অভিহিত করছেন। এই নীতির আওতায় ভেনিজুয়েলায় হস্তক্ষেপের পাশাপাশি ভবিষ্যতে কানাডা, মেক্সিকো এমনকি ডেনমার্কের অধীন গ্রিনল্যান্ডও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের কেন্দ্রে আসতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

এ দিকে ইউরোপীয় দেশগুলো এই নতুন বৈশ্বিক ক্ষমতার খেলায় ক্রমে প্রান্তিক হয়ে পড়ছে। আফ্রিকায় ফ্রান্সের প্রভাব হ্রাস এবং ব্রেক্সিট-পরবর্তী ব্রিটেনের সীমিত ভূমিকা ইউরোপের দুর্বল অবস্থানকে আরো স্পষ্ট করছে। ন্যাটো জোটও চাপে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, বিশেষ করে যদি যুক্তরাষ্ট্র কানাডা বা ডেনমার্কের মতো মিত্র দেশের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নেয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বব্যবস্থা এখন উনিশ ও বিংশ শতকের শুরুর দিকের মতো প্রভাববলয়ভিত্তিক রাজনীতির দিকে ফিরে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ায় বড় শক্তিগুলোর মধ্যে নতুন করে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে এবং ভবিষ্যতে একটি নতুন আন্তর্জাতিক সমঝোতা বা ‘আধুনিক ইয়াল্টা সম্মেলন’-এর প্রয়োজন দেখা দিতে পারে বলে মত দিয়েছেন পর্যবেক্ষকরা।

এদিকে রয়টার্স জানায়, জার্মানির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টাইনমায়ার যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিকে তীব্রভাবে সমালোচনা করেছেন। তার মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে গৃহীত নীতি বিশ্বব্যবস্থাকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে তবে পৃথিবী এমন এক অবস্থায় পৌঁছাবে যেখানে শক্তিশালী ও নিষ্ঠুর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ইচ্ছেমতো অঞ্চল ও দেশ দখল করে নেবে। স্টাইনমায়ার এই পরিস্থিতিকে ‘ডাকাতের আস্তানা’ বলে অভিহিত করেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিশ্বব্যবস্থা রক্ষায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

গত সপ্তাহে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার ঘটনাকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র এখন এমন আক্রমণের মুখে পড়ছে যা আগে কখনো দেখা যায়নি। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মনে করেন, বর্তমান সঙ্কট বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য বড় হুমকি।

যদিও জার্মানির প্রেসিডেন্টের ভূমিকা মূলত আনুষ্ঠানিক, তবুও তার বক্তব্যকে গুরুত্ব দেয়া হয়। কারণ তিনি রাজনৈতিক নেতাদের তুলনায় অনেক বেশি স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারেন। স্টাইনমায়ার উল্লেখ করেন, ক্রিমিয়া রাশিয়ার অন্তর্ভুক্তি এবং ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার হামলা বিশ্বব্যবস্থায় প্রথম বড় ভাঙন তৈরি করেছে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান আচরণ সেই ভাঙনের দ্বিতীয় অধ্যায়।

গত বুধবার এক সিম্পোজিয়ামে তিনি বলেন, “আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র, যে দেশটি একসময় এই বিশ্বব্যবস্থা গঠনে সহায়তা করেছিল। আজ সেই দেশই এমন নীতি নিচ্ছে যা বিশ্বকে অস্থিতিশীল করে তুলছে।’ তিনি আরো যোগ করেন, ‘এখন প্রশ্ন হলো- আমরা কি পৃথিবীকে ডাকাতদের হাতে ছেড়ে দেব, যেখানে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো অন্য দেশকে নিজেদের সম্পত্তি মনে করে?”

এ দিকে জার্মানির সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম এআরডি প্রকাশিত সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, ৭৬ শতাংশ নাগরিক মনে করেন যুক্তরাষ্ট্র আর জার্মানির নির্ভরযোগ্য সহযোগী নয়। ২০২৫ সালের জুনের তুলনায় এ হার তিন শতাংশ বেড়েছে। জরিপে আরো দেখা গেছে, মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রকে নির্ভরযোগ্য মনে করেন, যা এ পর্যন্ত চালানো জরিপগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।

অন্যদিকে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ জার্মান নাগরিক জানিয়েছেন, তারা ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের ওপর আস্থা রাখতে চান। একই জরিপে ৬৯ শতাংশ মানুষ ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্রগুলো এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর নির্ভর করতে পারছে না। সার্বিকভাবে, স্টাইনমায়ারের বক্তব্য এবং সাম্প্রতিক জরিপ একসাথে ইঙ্গিত করছে যে জার্মানিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থা দ্রুত কমে যাচ্ছে এবং ইউরোপীয় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

এদিকে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, আমেরিকা বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের বদলে তাদের সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি সতর্ক করে দেন যে কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের বাস্তব হুমকি এখনো শেষ হয়ে যায়নি। বিশেষ করে ভেনিজুয়েলায় মার্কিন হামলার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন কলম্বিয়াকেও সামরিক অভিযানের লক্ষ্যবস্তু করার ইঙ্গিত দিয়েছেন, তখন থেকেই দুই দেশের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।