সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু
সরকারের এখন সবচেয়ে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। ধারাবাহিকভাবে এই প্রতিষ্ঠান প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করে চলেছে। গত ১১ বছরে বিপিসি নিট মুনাফা করেছে ৫৬ হাজার ৫২৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এই মুনাফার মূল কারণ বিদেশ থেকে কম দামে জ্বালানি তেল আমদানি করে দেশের বাজারে তা বেশি দামে বিক্রি করা। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ক্রমান্বয়ে কমছে। টানা এক বছরের বেশি সময় ধরে বিশ্ববাজারে অশোধিত জ্বালানি তেল ব্যারেল প্রতি ৫৮-৬০ ডলারের মধ্যে ঘোরাফেরা বরছে। কিন্তু সেই কবে থেকে ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলার হিসাব করে সরকার স্থানীয় বাজারে তেলের দাম ঠিক করে রেখেছে। এই অবস্থায় মূল্য সমন্বয় করে তেলের দাম কমানোর পরিবর্তে বাড়ানো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) হিসাব কষে এর আগে বলেছে, বিপিসি ইচ্ছে করলে লিটার প্রতি তেলের দাম কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ টাকা কমাতে পারে; কিন্তু কে শোনে কার কথা!
গত ৩০ নভেম্বর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রতি লিটার তেলের দাম দুই টাকা বাড়িয়ে দেয়। চলতি ডিসেম্বর মাসের ১ তারিখ থেকে নতুন মূল্য কার্যকর হয়েছে। এর ফলে ডিজেলের দাম ১০২ টাকার পরিবর্তে ১০৪ টাকা, পেট্রলের দাম প্রতি লিটার ১১৮ থেকে বাড়িয়ে ১২০ ও অকটেন ১২২ থেকে বাড়িয়ে ১২৪ টাকা করা হয়েছে। কেরোসিনের দাম প্রতি লিটার ১১৪ থেকে বাড়িয়ে ১১৬ টাকা করা হয়।
আন্তর্জাতিক বাজারে ডিসেম্বর মাসজুড়ে ব্যারেল প্রতি ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য গড়ে ৬০ ডলারের মধ্যে ছিল। গত ৫২ সপ্তাহে ব্রেন্ট ক্রুডের সর্বনিম্ন মূল্য ছিল ৫৮ দশমিক ৪০ ডলার এবং সর্বোচ্চ ছিল ৮২ দশমিক ৬৩ ডলার। পাশাপাশি ডব্লিøউটিআই ক্রুডের মূল্য গত এক মাসে সর্বনিম্ন ৫৮ ডলার ৩৩ সেন্টে নেমে আসে। মূলত চলতি বছরের মাঝামাঝি থেকে তেলের মূল্য কমতে থাকে। সর্বশেষ গতকাল শনিবার ক্রুড অয়েলের মূল্য ব্যারেল প্রতি ৫৮ থেকে ৫৯ ডলারের ঘরে ছিল। বছরজুড়েই তেলের দাম ৫৮-৬০ ডলারের মধ্যেই ছিল।
এ দিকে অর্থমন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত ‘অর্থনৈতিক সমীক্ষা’ ২০২৪ ও ২০২৫ বিশ্লেষণ করে তেল বিক্রি করে বিপিসি নিট মুনাফার একটি চিত্র পাওয়া গেছে। ১১ বছরের এই পরিংখ্যানে দেখা যায়, এক বছর বাদে বাকি বছরগুলোতে তেল বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানটি হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে।
অর্থনৈতিক সমীক্ষায় পরিসংখ্যান দিয়ে দেখানো হয়েছে, ২০১৪-২০১৫ অর্থবছর থেকে বিপিসি তেল বেচে মুনাফা করা শুরু করে। সে বছর মুনাফার পরিমাণ ছিল চার হাজার ১২৬ কোটি আট লাখ। এর পরের অর্থবছর ২০১৫-২০১৬ সালে মুনাফা করেছে ৯ হাজার ৪০ কোটি সাত লাখ টাকা। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে মুনাফা আট হাজার ৬৫৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ২০১৭-২০১৮ সালে পাঁচ হাজার ৬৪৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। ২০১৮-২০১৯ সালে চার হাজার ৭৬৮ কোটি ৪২ লাখ টাকা। ২০১৯-২০২০ সালে পাঁচ হাজার ৬৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। ২০২০-২০২১ মুনাফা করেছে সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৫৫৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এরপর ২০২১-২০২২ অর্থবছরে শুধু বিপিসি কোনো মুনাফার মুখ দেখেনি। সেই বছর প্রতিষ্ঠানটির লোকসান গুনতে হয়েছে এক হাজার ৯৮৩ কোটি তিন লাখ টাকা। এই লোকসানের জন্য বিপিসির অপরিকল্পিত কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নকে দায়ী করা হয়েছে।
এরপর ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে বিপিসি আবারো মুনাফার ধারায় ফিরে আসে। সেই অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি মুনাফার পরিমাণ ছিল পাঁচ হাজার ৬৫৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে মুনাফা হয় তিন হাজার ৯৪৩ কোটি ২৯ লাখ টাকা এবং সর্বশেষ গত অর্থবছরে অর্থাৎ ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে বিপিসি মুনাফা করে দুই হাজার ৫০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।
জানা গেছে, ২১-২২ অর্থবছরে বিপিসি উন্নয়নের প্রকল্পের নামে কিছু অবকাঠামো নির্মাণ করেছে, যাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ হয়। এর মধ্যে একটি হচ্ছে পদ্মা অয়েলের নামে ঢাকার শাহবাগে ৩৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ১২তলা ভবন নির্মাণ। এটি একটি আবাসিক ভবন হবে। একই সাথে চট্টগ্রামেও এ ধরনের বাণিজ্যক ও আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এই প্রকল্পগুলো হাতে নেয়ার বিষয়ে তখন অনেকে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। লোকসানের পেছনে এই কারণগুলোকে অনেকে দায়ী করেছেন।
উল্লেখ্য, দেশে প্রতি বছর জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৭০ লাখ টন। এর আবার ৭৩ শতাংশ ডিজেল দ্বারা পূরণ করা হয়। ডিজেলের প্রায় পুরোটাই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। তবে অকটেনের চাহিদার অর্ধেকের বেশি এবং পেট্রলের পুরোটাই দেশে উৎপাদিত হয়। তাই দেশে উৎপাদিত এই দুই পণ্যের দাম বাড়ানোকে অনেকে অযৌক্তিক এবং অন্যায় বলেছেন।



