ইরানের মোস্তফা আল বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকাস্থ প্রতিনিধি শাহবুদ্দীন মাশায়েকী রাদ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর ইরান তার প্রতিরোধ অব্যাহত রাখবে। তিনি বলেন, ইরানে খাবারের কোনো সঙ্কট নেই এবং যুদ্ধ মোকাবিলায় ইরান নিজেকে বেশ ভালোভাবেই প্রস্তুত করেছে। কার্যত ইরানের এ প্রস্তুতি চলছে গত ৪৭ বছর ধরে এবং বিশ্বে ইরান এমন একটি দেশ যার কম ঋণ আছে। খাদ্য ছাড়াও সামরিক শক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ইরানকে অনন্য এক সক্ষমতায় পৌঁছে দেয়ায় ১০ বছর পর্যন্ত ইরান যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে।
গতকাল শনিবার সকালে মিডিয়া কর্মীদের সাথে মতবিনিময়ে এসব কথা বলেন শাহবুদ্দীন মাশায়েকী রাদ। ১০৩টি দেশে মোস্তফা আল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম রয়েছে এবং ৭০টি দেশের শিক্ষার্থীরা ইরানের এ বিশ্ববিদ্যালয়টিতে পড়তে যায়। দেড়শ বাংলাদেশী ছাত্র এ বিশ্ববিদ্যালয়টিতে অধ্যয়ন করছে। মতবিনিময়কালে ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতি সম্পর্কে বক্তব্য রাখার পর মিডিয়া কর্মীদের বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর দেন শাহবুদ্দীন মাশায়েকী রাদ।
প্রশ্ন : ইরান কি শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে?
শাহবুদ্দীন রাদ : পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর আক্রান্ত ইরান কখনোই এমন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারত না। যুক্তরাষ্ট্র বছরে পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য ৯০ বিলিয়ন ডলার খরচ করে। সেখানে ইরানের সামরিক বাজেট হচ্ছে ১৫ বিলিয়ন ডলার। তা ছাড়া ইরানের কাছে এমন অস্ত্র রয়েছে যা পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। ইলেকট্রনিক ও প্লাজমা প্রযুক্তির অস্ত্র দিয়ে ইরান অনায়াসে যেকোনো বড় শহরের সমস্ত ডিভাইস অচল করে দিতে পারে, এমনকি কোনো দেশ পারমাণবিক অস্ত্রবাহী ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের দিকে ছুড়লে তা মাঝ আকাশ থেকে পুনরায় হামলার স্থানে ফেরত পাঠাতে পারে ইরান। সাবমেরিন ছাড়াও পানির নিচে এমন টর্পেডো মোতায়েন করেছে ইরান যা ইন্টারসেপ্ট করা যায় না। হরমুজের নিচে এ ধরনের অসংখ্য অস্ত্র ফেলে রেখেছে ইরান। যুদ্ধে প্রয়োজনে এসব ব্যবহার করা হবে।
প্রশ্ন : পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে এমন অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।
শাহবুদ্দীন রাদ : উত্তর কোরিয়ার কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকার পরও যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে হামলা না করে জাপানে একের পর এক অস্ত্র কারখানায় বিনিয়োগে বাধ্য করছে। তাইওয়ানকে ভুতের ভয় দেখাচ্ছে এবং ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বানাচ্ছে এমন অপপ্রচার চালিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সম্পদ লুটে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। বরং ইরান ভূগর্ভস্তরে ও পানির নিচে অনেক মিসাইল সিটি গড়ে তুলেছে যদি সেগুলো সপ্তাহে একটি করে উদ্বোধন করে তাহলে দুই বছর লাগবে। ইরান শত্রুর কাছে অস্পষ্ট থাকতে ভালোবাসে। বাইরে থেকে ইরানকে যেমন দেখেন এবং পশ্চিমা মিডিয়ায় যেভাবে অপপ্রচার চালানো হয় আদতে ইরান ভিন্ন এক দেশ। এই যুদ্ধের মধ্যেও ইরানে বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে, রেশনিংয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে, সন্তান হওয়ার পর মা অতিরিক্ত ভাতা পাচ্ছেন। খাদ্য বা অস্ত্রে কোনো ধরনের কমতি নেই। দু’টি পরাশক্তির সাথে সফলভাবে যুদ্ধ করছে ইরান। সঙ্কটতো নেই বরং ঐক্যবদ্ধ জনগণের সংহতিশীল ও সমৃদ্ধশালী এক দেশ ইরান। যুদ্ধে বিপর্যয় সৃষ্টি স্বাভাবিক কিন্তু পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছে।
প্রশ্ন : কিন্তু যুদ্ধের কারণে সবদেশই তো জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়েছে।
শাহবুদ্দীন রাদ : বিশ্বের কাছে ইরানের অবস্থান স্পষ্ট। ইরান কখনো যুদ্ধ চায়নি বা হামলাকারী দেশ নয়। আলোচনার টেবিলে বসার পরও ইরান আক্রান্ত হয়েছে। বিশ্ববাসীও এখন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভরসা রাখতে পারছে না। কারণ বিভিন্ন দেশের ওপর যুদ্ধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের পেট্রল পাম্পগুলো তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন দেখলে সহজেই তা বুঝা যায়। বাংলাদেশের চেয়ে অন্যান্য দেশের অবস্থা আরো খারাপ। বাংলাদেশের জনগণ বা বিশ্বের অন্য কেউ বলছে না যে, এ যুদ্ধের জন্য ইরান দায়ী। এ হামলা থেকে স্কুলের ১৬৮ জন নিরীহ শিক্ষার্থী রেহাই পায়নি।
প্রশ্ন : যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা করছে ইরান।
শাহবুদ্দীন রাদ : ইরান আগে থেকেই সতর্ক করেছে মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশের ঘাঁটি থেকে ইরানে হামলা করা হয়েছে সেগুলোতে পাল্টা হামলা করা হবে। আমরা ৪৭ বছর ধরে দেশগুলোকে বুঝাতে চেয়েছি তোমরা আমাদের ভাই। ইরানে হামলায় যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলকে ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দিও না। কিন্তু তারা বুঝেনি। এতদিন ভ্রাতৃত্বসম আচরণ তারা বুঝে নাই, তারা শক্তির ভাষা বুঝে। অনেক আগেই হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়া দরকার ছিল। বহুবার আমরা বলেছি আমাদের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদেশগুলোকে এত সহযোগিতা কোরো না। তারপরও মধ্যপ্রাচ্যে ২৪টি মার্কিন ঘাঁটি গড়ে উঠেছে। সেখান থেকে ইরানের ওপর হামলা করা হয়েছে। আয়তনের খুবই ছোট একটি দেশ বাহরাইন যুক্তরাষ্ট্রকে ৩ মিলিয়ন বর্গমিটার জমি দিয়েছে মার্কিন ঘাঁটি তৈরিতে। সে ঘাঁটি তৈরির জন্য কাতার ১২ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে। এগুলো এখন পরিত্যক্ত। মার্কিন সেনারা হোটেল থেকে শুরু করে মসজিদে পর্যন্ত আশ্রয় নিয়েছে। আর এসব তথ্য ওসব দেশের জনগণই আমাদের দিয়েছে।
প্রশ্ন : তাহলে যুদ্ধ কি চলতেই থাকবে?
শাহবুদ্দীন রাদ : ইরান বারবার আলোচনায় বসেছে। আমিরাতের কারণে লিবিয়া, সুদান, ইয়েমেন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এমনকি সৌদি আরবের সাথে দেশটির সংঘর্ষ হয়েছে। কার্যত আমিরাত মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি ক্ষুদ্র ইসরাইলে পরিণত হয়েছে। ওপেক থেকে আমিরাত বের হয়ে একাই দৈনিক সাড়ে ৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করে তেলের দরপতন করতে চেয়েছিল। কিন্তু তেলের দর কমেনি। ১২০ ডলার মূল্যে তেল বিক্রি কাগজে কলমে হলেও লেনদেন হচ্ছে আরো বেশি দরে। ওপেক না থাকলেও ইরান তেলকে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। হরমুজ এখন ট্রাম্প কার্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এবং ইরান তা নিয়ন্ত্রণ করছে। একমাত্র ইরানকে পাঁচ ভাগে বিভক্ত বা নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব হলেই হরমুজের নিয়ন্ত্রণ অন্য কোনো দেশের হাতে চলে যাবে। হরমুজ ছাড়াও বাব আল মান্দেব ইরানের আয়ত্তের মধ্যে। বাব আল মান্দেব দিয়ে সৌদি আরব সাড়ে ৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রফতানি করছে। ওই প্রণালী বন্ধ করলে তেলের দর ব্যারেল প্রতি ২০০ থেকে ৪০০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এ ছাড়া সুয়েজ খালের আশেপাশের চ্যানেল অনিরাপদ করে দিলেও পরিস্থিতি আরো বিপন্ন হবে। আরামকোর তেল উৎপাদন ব্যবস্থাও ইরানের নাগালে। কিন্তু ইরান প্রজ্ঞা দেখিয়ে এ যুদ্ধে সহনশীল মনোভাবের পরিচয় দিচ্ছে। আর যুক্তরাষ্ট্র একটি সভ্যতা একেবারে ধ্বংস করে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে।
প্রশ্ন : পাকিস্তানের মধ্যস্ততায় যুদ্ধবিরতি তাহলে স্থায়ী হচ্ছে না?
শাহবুদ্দীন রাদ : আলোচনার পর আলোচনার টেবিলে বসছে ইরান। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র একতরফা এমন সব শর্ত ঘোষণা করছে যা গ্রহণযোগ্য নয়। যে কারণে পাকিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে খালি হাতে ফেরত যেতে হয়েছে। ইরান যুদ্ধের ফলাফল আল্লাহর কাছ থেকে আশা করে; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তা আশা করে অপপ্রচার চালিয়ে। হলিউড স্টাইলে ট্রাম্প বিশ্বে প্রচার চালিয়ে আবেদন সৃষ্টি করতে চান। দুর্বল দেশ চিলি, কিউবা, ভেনেজুয়েলার ওপর হুমকি দিয়ে প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে অপহরণ করে তেল সম্পদ লুটে নিতে অনেক বড় পরিকল্পনা নিয়ে আগালেও ইরান সে পরিকল্পনায় গুড়েবালি দিয়েছে। ইরানকে পরাস্ত করতে পারলে, হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চীন সফরে গিয়ে ট্রাম্প কার্ড দেখাতে চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কারণ চীনকেও ইরানের তেলের ওপর নির্ভর করতে হয়। যুদ্ধে যে বিজয়ী হয় সে কখনো একপক্ষীয়ভাবে যুদ্ধবিরতি চায় না। এক সপ্তাহ পর ফের নতুন শর্ত দেয় না। আবার বলে না; ইরান আমাদের শর্ত মেনে নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ট্রাম্পের হাতছাড়া হয়ে গেছে। যুদ্ধে ট্রাম্পের দম্ভ চূর্ণ হয়ে গেছে। হরমুজের ২০০ মাইল দূরে এসে মার্কিন জাহাজগুলো ফিরে যাচ্ছে। হরমুজের আশেপাশের পাহাড় থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালালে, ওমান সাগরে পেতে রাখা মাইন বা পানির নিচে অদৃশ্য সব অস্ত্র ওঁৎ পেতে আছে। ট্রাম্প প্যান্টের বেল্ট শক্ত করে বাঁধতে পারলে ইউক্রেন পরিস্থিতির সৃষ্টি হত না। চোরাবালিতে আটকা পড়েছে ইউক্রেন। ট্রাম্প চেয়েছিলেন স্বল্প সময়ে ব্যাপকভাবে হামলা চালিয়ে ইরানকে ধ্বংস করে যুক্তরাষ্ট্রকে বিজয়ী ঘোষণা করে টুইট করবেন। মার্কিন কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া যুদ্ধ শুরু করলে তা ৬০ দিনের মধ্যে শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ বা জয়ী হয়েছেন এমন বলার চেষ্টা করছেন। কারণ তাকে এখন ৩০ দিনের মধ্যে মার্কিন সেনা ফিরিয়ে নিতে হবে।
প্রশ্ন : চীন ও রাশিয়া কি এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে?
শাহবুদ্দীন রাদ : যুদ্ধ আরো বিস্তৃত হলে এ ধরনের শঙ্কা রয়েছে। কারণ তখন যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পশ্চিম ও প্রাচ্যে দুই পক্ষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। ফলে চীন ও রাশিয়া তাদের অস্তিত্বের কারণে এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হবে। ন্যাটোর পরামর্শ ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা করেছে। এর আগে কসোভো ও ইরাক যুদ্ধে আন্তর্জাতিক জোট তৈরি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। কসোভো ও ইরাক যুদ্ধে ইউরোপ অংশ নিয়েছিল স্বার্থের কারণে; কিন্তু ইরানে সে ধরনের স্বার্থ নেই বলে ইউরোপ এ যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে না।



