আলোচনা সভায় বক্তারা
- র্যাব থেকে সামরিক বাহিনীর সদস্য প্রত্যাহার করতে হবে
- নির্বাচনের আগে পুলিশের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন
জনবান্ধব ও মানবিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে সংস্কারের বিকল্প নেই। এ জন্য প্রয়োজন আধুনিক ও গণমুখী আইন প্রণয়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, পেশাগত প্রশিক্ষণ ও মনোভাব পরিবর্তন, পুলিশকে অযাচিত রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা এবং র্যাব থেকে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের প্রত্যাহার করা।
গতকাল শনিবার বাংলাদেশ অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতি আয়োজিত ‘বাংলাদেশ পুলিশ সংস্কার : প্রেক্ষিত নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকরা এসব কথা বলেন। সম্প্রতি কয়েকটি থানায় হামলা ও আসামি ছিনতাইয়ের ঘটনা উল্লেখ করে তারা বলেন, আগামী নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হতে হলে পুলিশের মনোবল ফিরিয়ে আনা জরুরি।
সংগঠনের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি ড. এম আকবর আলীর সভাপতিত্বে এ গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি ড. মো: মতিয়ার রহমান। মুখ্য আলোচক ছিলেন দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক ড. মাহমুদুর রহমান।
সমিতির সহ-সভাপতি মো: আব্দুর রহমান খানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা। বৈঠকে অন্যদের মধ্যে অংশ নেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) ফজলে এলাহি আকবর, বিএনপির তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. কামরুল আহসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক ড. বোরহান উদ্দিন খান, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমেদ আবদুল কাদের, এনসিপির জারিফ রহমান, সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি ফরিদ আহম্মেদ, ঢাবির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক প্রফেসর শরিফুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মুহাম্মদ তারিকুল ইসলাম, সাবেক সচিব এস এম জহুরুল ইসলাম প্রমুখ।
মূল প্রবন্ধে ড. মতিয়ার রহমান বলেন, পুলিশ বাহিনীর বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ হলো, ঔপনিবেশিক আইন ও কাঠামো, মানবসম্পদ ও প্রযুক্তিগত ঘাটতি, দুর্নীতি ও জবাবদিহিতার অভাব এবং কর্মচাপ ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। তিনি বলেন, এ জন্য প্রয়োজন আধুনিক ও গণমুখী আইন প্রণয়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, পেশাগত প্রশিক্ষণ ও মনোভাব পরিবর্তন, পুলিশকে অযাচিত রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা, কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থার বাস্তবায়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার ও দক্ষতা বৃদ্ধি, সুশৃঙ্খল ও মানবিক হওয়া এবং সেবামুখী হওয়া।
বাহিনীর কাজের ওপর নিরপেক্ষভাবে নজরদারি নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন এখন সময়ের দাবি। এ কমিশনে সাবেক ও বর্তমান বিচারপতি, সরকারি কর্মকর্তা, মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক ও নারীসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধি থাকবেন।
তিনি আরো বলেন, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মানবাধিকারসম্মত এবং জনবান্ধব পুলিশবাহিনী গড়ার মধ্যে নিহিত রয়েছে একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও উন্নত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
মুখ্য আলোচক ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, পুলিশ সংস্কার করতে হলে পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে, পুলিশ সদস্যদের বেঁচে থাকার মতো সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে, পুলিশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে, পুলিশের প্রশিক্ষণ আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে হবে, র্যাব থেকে সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার করতে হবে। র্যাব প্রতিষ্ঠার বিষয়ে এক আলোচকের বক্তব্যের সূত্র ধরে একুশে পদকপ্রাপ্ত সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, র্যাব অনেক ভালো কাজ করেছে। কিন্তু র্যাবে সামরিক কর্মকর্তাদের ঢোকানো ছিল একটা ভুল। আমি আগেও বলেছি; এখনো বলছি, ভবিষ্যতেও বলে যাবো। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের র্যাবে ঢোকানোর ফলে দুটো বাহিনীর সর্বনাশ করেছেন। পুলিশেরও সর্বনাশ করেছেন, সামরিক বাহিনীরও সর্বনাশ করেছেন। সামরিক বাহিনী র্যাবে ঢুকে করাপ্টেড (দুর্নীতিপরায়ণ) হয়েছে, ক্রিমিনাল হয়েছে। ক্রিমিনাল হওয়ার কারণে নারায়ণগঞ্জের সাত খুন হয়েছে। লে. কর্নেল তারেক সাইদ-এর চরিত্র নষ্ট হয়েছে র্যাবে আসার কারণে। এ কারণে সামরিক বাহিনীও বিতর্কিত হয়েছে। সামরিক বাহিনীও রাজনীতিকরণ হয়েছে। পুলিশ বাহিনীর মধ্যে সামরিক বাহিনীকে ঢুকানো ছিল রং কনসেপ্ট। এই রিফর্মটুকু যদি করে যেতে পারেন, আপনাদেরকে দেশবাসী মনে রাখবে। এটা করতে সাত দিনের দরকার। পুলিশে এলিট ফোর্স লাগবে। কিন্তু এলিট ফোর্স অবশ্যই পুলিশ বাহিনী থেকে নিয়েই গঠন করতে হবে। আমার প্রস্তাব হলো, এই এলিট ফোর্স ট্রেনিংয়ের জন্য সেনাবাহিনীতে পাঠান। ট্রেনিং নিয়ে আসুক। কিন্তু সামরিক বাহিনীর লোকদের ঢুকিয়ে দুটো প্রতিষ্ঠানের সর্বনাশ করবেন না। এই সরকারের জন্য এটা ট্রিমেন্ডাস অপরচুনিটি (অসাধারণ সুযোগ)।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে পুলিশের অধঃপতন হয়েছে। আগামী নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হতে হলে পুলিশের মনোবল ফিরিয়ে আনতে হবে। তিনি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। শেখ হাসিনার সময় পুলিশে ‘চেইন অব কমান্ড’ ছিল না। জুলাই বিপ্লবের পূর্বে পুলিশ ছিল দানবীয়। আজ পুলিশ মনোবলহীন। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে হলে পুলিশের মনোবল ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নিতে হবে। এটাই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। নিজের রিমান্ডকালীন অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে মাহমুদুর রহমান বলেন, পুলিশ আজ যে ভাবমূর্তি সঙ্কটে পড়েছে এ জন্য কি পুলিশ দায়ী? তখন যারা ডিবিতে ছিলেন তারা হয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় অথবা অন্যান্য পর্যায়ের নেতা। জুলাই বিপ্লব এ জন্য অনিবার্য ছিল। এখন আমাদের টার্গেট হলো আরেকটা ফ্যাসিবাদ যেন আবার ফিরে না আসে সেই ব্যবস্থা করা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. বোরহান উদ্দিন বলেন, পুলিশের পদোন্নতি, পোস্টিংয়ের জন্য আলাদা আইন থাকা প্রয়োজন। কোনো সরকারই পুলিশ কমিশন করতে চাইবে না। পুলিশকে মিলিটারি ইকুইপমেন্ট ব্যবহার থেকে বেরিয়ে আসারও আহ্বান জানান তিনি।
ড. আহমেদ আবদুল কাদের বলেন, পুলিশকে কখনো ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থ রক্ষার জন্য ব্যবহার করা যাবে না। এ জন্য পুলিশের প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। পুলিশ সংস্কার কমিশনের সদস্য জারিফ রহমান বলেন, ঐকমত্য কমিশন থেকে পুলিশ সংস্কারকে বাদ দেয়া জুলাই আন্দোলনের সাথে এক ধরনের বেঈমানি।
বিচারপতি ফরিদ আহমেদ বলেন, বিগত সরকারের আমলে পুলিশের ভূমিকার কারণেই পুলিশ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। পুলিশ বাহিনীর সংস্কার আজ অনিবার্য। প্রফেসর কামরুল আহসান বলেন, পুলিশকে শুধু ব্যবহার করা হয়। পুলিশে অনেক ভালো মানুষ আছেন তারা পরিবর্তন চায়। পুলিশকে ভালো হওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, পুলিশের নিয়োগ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। পুলিশ সদস্যদের সম্মানজনক বেতন-ভাতাদি দিতে হবে। ঐকমত্য কমিশনে পুলিশ সংস্কার বিষয়ে আলোচনা করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন। আজিজুল বারী হেলাল বলেন, শেখ হাসিনা পুলিশকে গণশত্রুতে পরিণত করেছিল। তিনি পুলিশ সদস্যদের পদায়নের ক্ষেত্রে ফিট লিস্ট করার সুপারিশ করেন।
অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম বলেন, ঔপনিবেশিক আইন পরিবর্তনের মাধ্যমে পুলিশ সংস্কার করতে হবে। শুধু পুলিশ সংস্কার করলেই হবে না, প্রশাসনেও সংস্কার করতে হবে। অধ্যাপক মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, পুলিশের নিয়োগ ও পদোন্নতি হতে হবে মেধার ভিত্তিতে।
সভাপতির বক্তব্যে ড. এম আকবর আলী বলেন, ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনে নিয়ন্ত্রণের কথা বলা আছে। পুলিশের জনসম্পৃক্ততার কথা নেই। পুলিশকে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের আওতায় আনতে হবে। পুলিশের মনোবল বৃদ্ধির জন্য সবাইকে কাজ করতে হবে।



