বিদ্যুৎখাতে ভর্তুকির পরিমাণ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার কয়েক দিনের মধ্যে একমাসের বিদ্যুতের ভর্তুকির অর্থবাবদ একহাজার ৭৪৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা ছাড় করতে হয়েছে। শুধু জানুয়ারি (২০২৬) মাসের ভর্তুকি বাবদই এ অর্থ প্রদান করা হয়েছে। পরিস্থিতিকে যেভাবে এগোচ্ছে তাতে চলতি অর্থবছরে বিদ্যুতের ভর্তুকি ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে অর্থ বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে কম মূল্যে বিদ্যুৎ বিক্রয়ের কারণে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের লোকসান মিটানোর লক্ষ্যে ভর্তুকি দেয়া অব্যাহত আছে। সে পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার (আইপিপি), রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট এবং ভারত থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য অপেক্ষা কমমূল্যে বাল্ক কনজিউমারসের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রয় করার ফলে ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের ট্যারিফ ঘাটতি বাবদ মোট দুই হাজার ৭৯১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা বিদ্যুৎ ভর্তুকি দাবি করা হয়েছে। কিন্তু অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে দাবিকৃত অর্থের বিপরীতে গত সপ্তাহে এক হাজার ৭৪৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা ছাড় করা হয়েছে।
এ দিকে, বিদ্যুৎ বিভাগের ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের ভর্তুকি চাহিদা পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট বিক্রয়মূল্য হতে বিপিডিবি কর্তৃক বিইআরসির ‘বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল’-এ প্রদত্ত ০.১৫ টাকা/ইউনিট বিয়োগ করে বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট বিক্রয়মূল্য হিসাব করা হয়েছে। ফলে ওই টাকাও ভর্তুকি চাহিদায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, যেহেতু অতীতে কখনো বিইআরসির ‘বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল’-এর টাকা অর্থ বিভাগ ভর্তুকি আকারে দেয়নি, সেহেতু পূর্বের একই ধারাবাহিকতায় ওই ০.১৫ টাকা/ইউনিট যোগ করে প্রতি ইউনিট বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে ভর্তুকির প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া পাওয়ার ইমপোর্ট ফ্রম ইন্ডিয়া থেকে বিদ্যুৎ আমদানির জন্য ইতোপূর্বে কখনো ভর্তুকি দেয়া হয়নি।
অর্থ বিভাগ থেকে বলা হয়েছে, ‘বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল’-এর জন্য কর্তনকৃত ০.১৫ টাকা/ইউনিট সমন্বয়পূর্বক এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি বাবদ দাবিকৃত ১৩৫.৬৯ কোটি টাকা ও সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রী/উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির অনুমোদন নেই এরূপ দু’টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ঘাটতি বাবদ দাবিকৃত ৮৫৩.১৭ কোটি টাকা বাদ দিয়ে জানুয়ারি/২০২৬ মাসের প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ এক হাজার ৭৪৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের জুলাই মাস থেকে ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত (২৩ মাস) সময়ের বিদ্যুৎ খাতের ক্রমপুঞ্জীভূত ট্যারিফ ঘাটতির ৫৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট বরাদ্দ থেকে পরিশোধ করা হয়েছে। এ ছাড়াও চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ‘বিদ্যুৎ ভর্তুকি’ খাতে ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
ওই বরাদ্দ হতে এ পর্যন্ত ছাড় করা হয়েছে ২০ হাজার ২৯৯ কোটি টাকা; ফলে অব্যয়িত রয়েছে (৩৬,০০০-২০,২৯৯)=১৫,৭০১ কোটি টাকা। এ পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের প্রকৃত ক্ষতি বাবদ এক হাজার ৭৪৩.৩২ কোটি টাকা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের অনুকূলে ভর্তুকি প্রদান করা হলো বলে অর্থ বিভাগ জানায়।
এদিকে, ভর্তুকি দেয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্ত জুড়ে দিয়েছে অর্থ বিভাগ। এ শর্তের মধ্যে রয়েছে (ক) ট্যারিফের বিষয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা/উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির অনুমোদন না থাকা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দ্রুত অনুমোদন গ্রহণ করতে হবে : সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত ছয়টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিপরীতে ইতোপূর্বে ছাড়কৃত ভর্তুকির সাথে বর্তমানে অনুমোদিত ট্যারিফ রেট অনুযায়ী প্রকৃত ভর্তুকি সমন্বয় করতে হবে এবং এ বিষয়টি বিদ্যুৎ বিভাগকে নিশ্চিত করতে হবে; অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকারি আর্থিক বিধি-বিধান ও নিয়মাচার যথাযথভাবে পরিপালন করতে হবে। এ অর্থ ভবিষ্যতে অডিটের মাধ্যমে নিরুপিত মোট প্রদেয় অর্থের সাথে সমন্বয় করতে হবে। ক্যাপাসিটি চার্জের পরিমাণ যৌক্তিকভাবে হ্রাস করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
লোকসানের তথ্য নিয়ে বিভ্রান্তি
বিদ্যুৎখাতের লোকসানের তথ্য নিয়ে নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) এক অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে। সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে বিপিডিবির লোকসান হয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল আট হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। একবছরে লোকসান বেড়েছে আট হাজার ২৫৭ কোটি টাকা।
অন্য দিকে, অর্থ বিভাগের গত ডিসেম্বরের প্রকাশিত অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২৫ বিপিডিবি’র লোকসান অনেক কম দেখা হয়েছে। বলা হয়েছে প্রতিষ্ঠান ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে লোকসান দিয়েছে আট হাজার ৮০৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর আগের বছর (২০২৩-২০২৪) সাময়িক হিসেবে লোকসান ধরা হয়েছে আট হাজার ৪৮৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা গত বৃহস্পতিবার নয়া দিগন্তকে জানান, অর্থনৈতিক সমীক্ষা যে তথ্য বা পরিসংখ্যানগুলো দেয়া থাকে তা মূলত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদফতর ও প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করা হয়। তারা যে সব তথ্য আমাদের কাছে পাঠায় সেগুলোই সমীক্ষা দেয়া হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে তথ্যে যাচাই-বাছাইয়ের কোনো সুযোগ নেই। তবে সংশোধনী থাকলে তা পরের অর্থবছরে দেয়া হয়।
আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর ভর করে উৎপাদন সক্ষমতা পাঁচ গুণের বেশি বাড়ানোর পর লোকসান দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০১০-১১ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো পিডিবির লোকসান এক হাজার কোটি টাকা ছাড়ায়। গত ১৭ বছর ধরে পিডিবি টানা লোকসানের মধ্যেই আছে বলে জানা গেছে।
লোকসানের ভারে ডুবছে বিপিডিবি!
এদিকে, আওয়ামী লীগের সময় বিদ্যুৎখাতের দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ে যাতে কেউ কথা না বলতে পারে তার জন্য একটি ‘বিশেষ আইন’ করা হয়। ‘বিশেষ বিধান’ আইনের আওতায় সম্পাদিত বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো দেশের স্বার্থে নয়, বরং ব্যক্তি বিশেষকে সুবিধা দেয়ার জন্য করা হয়েছিল। এর ফলে বিপিডিবি এখন দেউলিয়ার পথে এবং সামগ্রিক বিদ্যুৎ খাত ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ২৫ জানুয়ারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর অধীনে সম্পাদিত চুক্তিগুলো পর্যালোচনায় গঠিত জাতীয় কমিটির সংবাদ সম্মেলনে এ কথাগুলো বলা হয়।
কমিটির তাদের প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, ২০১৫ সালে পিডিবির লোকসান ছিল যেখানে মাত্র পাঁচ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, ২০২৫ সালে তা দশগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বর্তমানে পিডিবির প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনতে খরচ হয় ১২ টাকা ৩৫ পয়সা, কিন্তু তারা বিক্রি করছে মাত্র ছয় টাকা ৬৩ পয়সায়। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, পিডিবিকে কেবল টিকিয়ে রাখতেই বিদ্যুতের দাম অন্তত ৮৬ শতাংশ বাড়ানো প্রয়োজন।


