সাক্ষাৎকার : ড. মো: খলিলুর রহমান

পানি হতে পারে বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক শক্তি

চলনবিল ও হাওরের পানি সংরক্ষণ ও রফতানির উদ্যোগ নিলে হাজার হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব।

কাওসার আজম
Printed Edition

বিএফআরআইর সাবেক মহাপরিচালক ড. মো: খলিলুর রহমান বলেছেন, পানি হতে পারে বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক শক্তি। তিনি বলেন, চলনবিল ও হাওরের পানি সংরক্ষণ ও রফতানির উদ্যোগ নিলে হাজার হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব। পাশাপাশি ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়িয়ে পরিবেশ ও পানিসম্পদ রক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

ড. মো: খলিলুর রহমান বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) সাবেক মহাপরিচালক। তিনি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (গবেষণা ও পরিকল্পনা) হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ময়মনসিংহের স্বাদুপানি কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, যশোর স্বাদুপানি উপকেন্দ্রের প্রধান, অ্যাকুয়া ড্রাগস প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এবং হালদা নদী উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সফলতার সাথে পালন করেছেন। অবসর গ্রহণের পর ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে তিনি কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) সিনিয়র স্পেশালিস্ট (ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াটিক রিসোর্সেস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৎস্যবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের (এফএও) ফেলোশিপ নিয়ে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব হাল থেকে দ্বিতীয় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

পাঙ্গাশ মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও চাষাবাদ প্রযুক্তি উদ্ভাবনের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৯৫ সালে রাষ্ট্রপতি পদকে ভূষিত হন। সম্প্রতি দেশের পানিসম্পদের সম্ভাবনা, টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং এ খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে দৈনিক নয়া দিগন্তের সাথে কথা বলেছেন তিনি।

নয়া দিগন্ত : বিশ্বজুড়ে নিরাপদ পানির সঙ্কট নিয়ে আপনি কিভাবে দেখছেন?

ড. মো: খলিলুর রহমান : পৃথিবীর প্রায় চার ভাগের তিন ভাগই পানি হলেও এর ৯৭ শতাংশেরও বেশি লবণাক্ত। ব্যবহারযোগ্য সুপেয় বা স্বাদু পানির পরিমাণ খুবই সীমিত। এই স্বাদু পানি পাওয়া যায় নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর, লেক, ভূগর্ভস্থ পানি, হিমবাহ এবং বৃষ্টির মাধ্যমে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে স্বাদু পানির সঙ্কট ক্রমেই বাড়ছে। ৩০-৪০ বছর আগে মানুষ বোতলজাত পানি কিনে খাওয়ার কথা ভাবত না। কিন্তু এখন সেটিই বাস্তবতা। কারণ নদীর পানি কমে যাচ্ছে, আবার অনেক নদীর পানিও দূষিত হয়ে পড়েছে। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও তুরাগের মতো নদীর পানি এখন এতটাই দূষিত যে তা পরিশোধন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

নয়া দিগন্ত : আপনি বলছেন, বাংলাদেশও পানি রফতানিকারক দেশে পরিণত হতে পারে। বিষয়টি কিভাবে সম্ভব?

ড. মো: খলিলুর রহমান : বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যেই স্বাদু পানি আমদানি করছে। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, ইরাক, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কাসহ প্যাসিফিক মহাসাগরীয় বহু দ্বীপরাষ্ট্রে নিরাপদ পানির বড় সঙ্কট রয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৪৪ থেকে ৪৮টি দেশে স্বাদু পানির ঘাটতি প্রকট।

বাংলাদেশে বর্ষাকালে হাওর, চলনবিল, যশোরের বাঁওড়সহ অসংখ্য জলাধারে বিপুল পরিমাণ স্বাদু পানি জমা হয়। বিশেষ করে সিলেট-ময়মনসিংহ বেসিনের সাত-আটটি জেলার হাওরাঞ্চলে যে পরিমাণ পানি থাকে, তা একটি বিশাল সম্পদ। এই পানি সংরক্ষণ করে বড় বড় ট্যাংকারে কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী পরিশোধনের মাধ্যমে বিদেশে রফতানি করা সম্ভব। আরব দেশগুলো যেমন অপরিশোধিত ও পরিশোধিত দুই ধরনের তেল রফতানি করে, তেমনি আমরাও প্রয়োজনে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত উভয়ভাবেই পানি রফতানির বিষয়টি বিবেচনা করতে পারি। এতে হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক আয় সম্ভব হবে এবং দেশের যুবসমাজের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

নয়া দিগন্ত : এই পানিসম্পদ কাজে লাগাতে কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন?

ড. মো: খলিলুর রহমান : শিল্প মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য ও রফতানি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যদি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে, তাহলে বাংলাদেশ স্বাদু পানিকে একটি অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করতে পারবে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চল পর্যন্ত উন্নত সড়ক যোগাযোগ গড়ে উঠেছে। সেখানে পানি সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ট্যাংকারজাত ও রফতানির অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। বর্ষার এই আল্লাহপ্রদত্ত পানিকে আমরা যদি যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারি, তাহলে এটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন খাত হতে পারে।

নয়া দিগন্ত : আপনি বারবার ভূগর্ভস্থ পানির পরিবর্তে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের কথা বলছেন, কেন?

ড. মো: খলিলুর রহমান : আমাদের দেশের প্রায় সব শহরই নদীকেন্দ্রিক হলেও আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। এতে পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের পরিবেশগত ও ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে ভূমিধস বা মাটির নিচে দেবে যাওয়ার আশঙ্কাও বাড়তে পারে। আমাদের উচিত নদীর পানি পরিশোধন করে ব্যবহার করা। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলোতে আংশিকভাবে এটি করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে আরো ব্যাপকভাবে সারফেস ওয়াটার বা ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের দিকে যেতে হবে।

নয়া দিগন্ত : খাল পুনঃখনন ও নদীর পানি ব্যবহারের বিষয়ে আপনার প্রস্তাব কী?

ড. মো: খলিলুর রহমান : আগে ঢাকা-আরিচা সড়কের দুই পাশে অসংখ্য খাল ছিল। এখন অনেকগুলোই দখল হয়ে গেছে। এগুলো দখলমুক্ত করে পুনঃখনন করা এবং পদ্মা নদী থেকে সারা বছর পানি সরবরাহ করা গেলে ওই এলাকায় সেচ, মাছ চাষ ও বনায়ন একসাথে করা সম্ভব। একইভাবে চাঁদপুর থেকে কুমিল্লা অঞ্চলের বহু খাল একসময় পানিপূর্ণ ছিল। আমি চাঁদপুরে কর্মরত থাকার সময় নিজে তা দেখেছি। এখন অনেক খাল দখল হয়ে গেছে। এগুলো পুনঃখনন করে মেঘনা নদী থেকে সারা বছর পানি সরবরাহ করা গেলে কৃষি উৎপাদন, মাছ চাষ ও বনায়নে বিপ্লব ঘটবে।

নয়া দিগন্ত : দেশের বিভিন্ন শহরের পানি ব্যবস্থাপনায় কী পরিবর্তন আনা উচিত বলে মনে করেন?

ড. মো: খলিলুর রহমান : ঢাকার জন্য যমুনা, পদ্মা ও শীতলক্ষ্যার পানি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে শুষ্ক মৌসুমে শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গার পানি দূষিত হয়ে যাওয়ায় তা পরিশোধন করা কঠিন। চট্টগ্রামে হালদা নদী থেকে পানি নেয়া হয়, কিন্তু হালদাকে রক্ষা করতে বিকল্প উৎসও খুঁজতে হবে। খুলনায় রূপসা নদী, সিলেটে সুরমা, ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্র, রাজশাহীতে পদ্মা, চাঁপাইনবাবগঞ্জে মহানন্দা এবং দিনাজপুর অঞ্চলে তিস্তার পানি পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে সারফেস ওয়াটারের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা।

নয়া দিগন্ত : এতে দেশের কী ধরনের সুফল মিলবে?

ড. মো: খলিলুর রহমান : এতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হবে, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে, কৃষি উৎপাদন বাড়বে, বিশেষ করে ধান উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। মাছ উৎপাদন, বনায়ন এবং জীববৈচিত্র্যও সমৃদ্ধ হবে। একই সাথে পানি রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং দেশের তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। আমার বিশ্বাস, পরিকল্পিতভাবে কাজ করলে পানি বাংলাদেশের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হতে পারে।