হাওরে ধানের ন্যায্য দাম পাচ্ছে না কৃষক

Printed Edition
সুনামগঞ্জের হাওড়ে বিক্রির অপেক্ষায় কৃষকের ধান : নয়া দিগন্ত
সুনামগঞ্জের হাওড়ে বিক্রির অপেক্ষায় কৃষকের ধান : নয়া দিগন্ত

তৌহিদ চৌধুরী প্রদীপ সুনামগঞ্জ

সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের কৃষকরা সারা বছরের কষ্টার্জিত বোরো ধান ন্যায্য দামে বিক্রি করতে পারছেন না। বিচ্ছিন্ন হাওরাঞ্চলের গ্রামগুলোতে আগের মতো ধান কেনার ক্রেতা না যাওয়ায় ঘরে মজুদ ধান নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ছেন তারা। প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ৯৫০ টাকায়। অথচ সরকারি সংগ্রহমূল্য নির্ধারিত রয়েছে প্রতি মণ এক হাজার ৪০০ টাকা।

সুনামগঞ্জের বোরো ফসল দেশের অর্থনীতি শক্তিশালীতে অনন্য ভূমিকা রাখলেও কৃষি ও কৃষকদের স্বার্থে তেমন কোন পদক্ষেপ নেয়নি বিগত সরকারের আমলে। সারা দেশে অধিকাংশ পন্যের দাম বাড়লেও কৃষকের হাড়ভাঙ্গা কষ্টে ফলানো ধান আশানুরূপ কোনো দামে বিক্রি করতে পারছেন না।

জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা, তাহিরপুর, মধ্যনগরসহ কয়েকটি উপজেলা ঘুরে কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরের তুলনায় এবার প্রতি মণ ধানের দাম ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা কম। এতে উৎপাদন খরচও উঠছে না অনেক কৃষকের। সার, বীজ, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় ধান উৎপাদনে ব্যয় আগের চেয়ে বেড়েছে।

হাওরাঞ্চলের কৃষকরা জানান, আগে ভৈরব, আশুগঞ্জ, কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা নৌকা নিয়ে গ্রামে গ্রামে যেতেন। স্থানীয় ক্রয়কেন্দ্র ও দালালদের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধান কিনতেন তারা। এবার সেই চিত্র নেই। ক্রেতার সঙ্কটে কম দামেও ধান বিক্রি করতে পারছে না কৃষক।

সুনামগঞ্জের কৃষকরা বছরে একটি মাত্র বোরো ফসলের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। হাওরে বছরের প্রায় ছয় মাস পানিবন্দী থাকতে হয়। শুকনো মৌসুমে কৃষিকাজই তাদের প্রধান আয়ের উৎস। ধান ঘরে তোলার পরপরই ঋণ পরিশোধ, পরিবারের খরচসহ নানা প্রয়োজন মেটাতে হয়। ফলে বাজারদর কম হলেও বাধ্য হয়েই ধান বিক্রি করতে হচ্ছে অনেককে।

জামালগঞ্জ উপজেলার শান্তিপুর গ্রামের কৃষক হাজী এনায়েত কবীর খান বলেন, গত বছর তার অনেক জমির পাকা ধান পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়েছে। যে ধান ঘরে তুলতে পেরেছেন, সেটিও ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে না পারায় সংসার চালাতেই কঠিন হয়ে পড়ছে। তার উপর রয়েছে ঋণ পরিশোধের তাগিদ।

কৃষক রফিক মিয়া বলেন, ‘গত বছর প্রতি মণ ধান এক হাজার ৩০০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি করেছি। এবার ৮০০-৯০০ টাকায়ও ক্রেতা পাওয়া যায় না। পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হলেও কৃষকের কষ্টের যেন শেষ নেই।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, ২০২৬ সালের বোরো মৌসুমে সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলার হাওরাঞ্চলে দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১২ লাখ ৩৩ হাজার ৫১৭ মেট্রিক টন। অনুকূল আবহাওয়া ও ভালো ফলনের কারণে উৎপাদন প্রায় ১৩ লাখ মেট্রিক টনের কাছাকাছিতে পৌঁছেছে। এর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। তবে কৃষকদের দাবি, বৈশাখের বৃষ্টিতে বিপুল পরিমাণ ধান পানিতে ডুবে নষ্ট হয়েছে। অবশিষ্ট ধান বিক্রি করেও তারা উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না।

এদিকে ধানের বাজারে দরপতন হলেও স্থানীয় চালের বাজারে এর তেমন প্রভাব নেই। চালকল মালিকদের দাবি, আগের মৌসুমে চালের অনেক মজুদ থাকায় বাজারে বিক্রি কমেছে। ফলে মিলাররাও ধান কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। এতে কৃষকরা আরো ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

কৃষকদের দাবি, বৈশাখে ইউনিয়নভিত্তিক সরকারি ধান ক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি কৃষি উপকরণে ভর্তুকি বাড়িয়ে উৎপাদন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।