‘ভাগ্যবান’ কক্সবাজার-৪ আসনে হবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই

মাঠে সক্রিয় রয়েছেন চার প্রার্থী

হুমায়ুন কবির জুশান, উখিয়া (কক্সবাজার)
Printed Edition

সংসদীয় আসন কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) দেশের রাজনীতিতে ‘ভাগ্যবান আসন’ হিসেবে পরিচিত। এ আসন থেকে যে দলের প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, পরবর্তীতে সেই দলই রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে- এমন নজির রয়েছে একাধিকবার। ১৯৮৬ সালে উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলা নিয়ে বর্তমান কক্সবাজার-৪ আসনটি গঠিত হয়। এর আগে রামু, উখিয়া ও টেকনাফ নিয়ে এটি ছিল চট্টগ্রাম-১৮ আসন। দীর্ঘ চার দশকের নির্বাচনী ইতিহাসে এই আসন তাই বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

জেলা নির্বাচন অফিসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, টেকনাফ উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে মোট ভোটার দুই লাখ দুই হাজার ৭৮১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ তিন হাজার ৬৯৮ জন এবং নারী ভোটার ৯৯ হাজার ৮০ জন। এখানে ভোটকেন্দ্র রয়েছে ৬১টি। অপর দিকে উখিয়া উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে মোট ভোটার এক লাখ ৭২ হাজার ৯৭৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৮৯ হাজার ১০৮ এবং নারী ৮৩ হাজার ৮৬৯ জন। উখিয়ায় ভোটকেন্দ্র রয়েছে ৫৪টি। সব মিলিয়ে উখিয়া-টেকনাফের ১১টি ইউনিয়নে মোট ভোটার তিন লাখ ৭৫ হাজার ৬৫৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ এক লাখ ৯২ হাজার ৮০৬ এবং নারী এক লাখ ৮২ হাজার ৮৫২ জন। মোট ভোটকেন্দ্র ১১৫টি। এ আসনের নির্বাচনী ইতিহাসও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী ৩৬ হাজার ৮৭২ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ আলী পান ৩৩ হাজার ১৭৬ ভোট। ওই নির্বাচনের পর সরকার গঠন করে বিএনপি। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনেও শাহজাহান চৌধুরী জয়ী হন। তবে একই বছরের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ আলী ৪৪ হাজার ৭০৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তখন সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। ২০০১ সালে আবারো বিএনপির শাহজাহান চৌধুরী ৮৯ হাজার ৭৪৭ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আব্দুর রহমান বদি বিপুল ভোটে জয়ী হন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে তার স্ত্রী শাহিনা আক্তার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ‘ভাগ্যবান’ আসনে চারজন প্রার্থী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। তারা হলেন- বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আলহাজ শাহজাহান চৌধুরী (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামের মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ নুর আহমেদ আনোয়ারী (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা নুরুল হক (হাতপাখা) এবং এনডিএম প্রার্থী সাইফুদ্দিন খালেদ সিংহ। প্রচারণায় উখিয়া-টেকনাফজুড়ে নির্বাচনী আমেজ স্পষ্ট।

রতœাপালং, রাজাপালং, হলদিয়াপালং, জালিয়াপালং ও পালংখালী ইউনিয়নের শতাধিক নারী ভোটারের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা এবার বিকল্প দেখতে আগ্রহী। সাংবাদিকদের করা এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭০ শতাংশ নারী ভোটার দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। অপর দিকে পুরুষ ভোটারদের প্রায় ৬৫ শতাংশ ধানের শীষের পক্ষে মত দিয়েছেন। মাঠের বাস্তবতায় মূল লড়াই বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে জামায়াত শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

নতুন ভোটারদের বড় একটি অংশ ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলছেন। একই সাথে সাধারণ ভোটারদের প্রত্যাশা- সহিংসতামুক্ত, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের ভোটার আবদুল মজিদ বলেন, ‘সীমান্ত এলাকার মানুষের নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান বড় সমস্যা। যে প্রার্থী এগুলো সমাধান করবে বলে আমরা বুঝতে পারব তাকেই ভোট দেবো।’ টেকনাফ পৌরসভার ভোটার রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব ফল দেখতে চাই।’ হোয়াইক্যং এলাকার তরুণ ভোটার হুমায়ুন আজাদ আকাশ বলেন, ‘মাদক ও বেকারত্ব এখানকার বড় সমস্যা। তরুণদের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেয়া দরকার।’ আরেক ভোটার কমরুদ্দিন বলেন, ‘ইয়াবামুক্ত উখিয়া-টেকনাফ এবং রোহিঙ্গা সমস্যার কার্যকর সমাধান করতে যিনি পারবেন আমরা এমন প্রার্থীকেই ভোট দেবো।’

এদিকে নির্বাচন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরাপত্তা জোরদারের প্রস্তুতি নিয়েছে। শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানানো হয়েছে।