চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড ঘাটতির মুখে দাঁড়িয়েও আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য একটি উচ্চাভিলাষী ও বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে যাচ্ছে সরকার। অর্থ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন বাজেটে মোট রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা গিয়ে ঠেকছে ৭ লাখ কোটি টাকায়।
বিদ্যমান অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং এনবিআরের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার মধ্যে এই বিশাল টার্গেটকে ‘অবাস্তব ও প্রায় অসম্ভব’ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় এই লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত রাজস্ব কাঠামো : আগামী অর্থবছরের জন্য প্রাক্কলিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার বড় অংশই বরাবরের মতো এনবিআরের ওপর চাপানো হচ্ছে।
খসড়া কাঠামোটি নিচে দেয়া হলো :
রাজস্ব খাত -- ২০২৬-২৭ প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রা -- ২০২৩-২৬ সংশোধিত বাজেট (চলতি) ।
মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা -- ৭,০০,০০০ কোটি টাকা -- ৫,৯৩,০০০ কোটি টাকা
মোট কর রাজস্ব -- ৬,২৯,০০০ কোটি টাকা -- ৫,২৩,০০০ কোটি টাকা
ক) এনবিআর নিয়ন্ত্রিত কর -- ৬,০৪,০০০ কোটি টাকা -- ৫,০৩,০০০ কোটি টাকা
খ) এনবিআর-বহির্ভূত কর।-- ২৫,০০০ কোটি টাকা-- ২০,০০০ কোটি টাকা
২. কর-বহির্ভূত রাজস্ব -- ৬৬,০০০ কোটি টাকা -- ৬৫,০০০ কোটি টাকা
উৎস : অর্থ বিভাগ ও এনবিআর প্রাথমিক খসড়া।
প্রেক্ষাপট : চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। পরবর্তীতে সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৫ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা করা হয়। একইভাবে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
১০ মাসেই রাজস্ব ঘাটতি লাখ কোটি টাকা পার!
সরকার যখন ৭ লাখ কোটি টাকার নতুন স্বপ্ন দেখছে, তখন মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। এনবিআরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই (জুলাই-এপ্রিল) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা দেশের ইতিহাসে এযাবৎকালের সর্বোচ্চ ঘাটতি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থবছরের বাকি দুই মাসে (মে ও জুন) কর আদায়ে ঐতিহ্যগতভাবে কিছুটা গতি বাড়লেও, অর্থবছর শেষে প্রকৃত ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকার ওপরেই থাকবে।
প্রবৃদ্ধির মন্দা চিত্র : এনবিআরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, গত ১০ মাসে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০.৬০ শতাংশ। একক মাস হিসেবে সর্বশেষ এপ্রিল মাসে রাজস্ব আদায় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬.৭১ শতাংশ বেড়েছে। অথচ বিগত বছরগুলোতে স্বাভাবিক সময়ে মাসভিত্তিক গড় রাজস্ব প্রবৃদ্ধি থাকত প্রায় ১৪ শতাংশ। এই ধীরগতি প্রমাণ করে যে অর্থনীতিতে সঙ্কোচনমূলক প্রভাব স্পষ্ট।
এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রার যৌক্তিকতা ও ঝুঁকি নিয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগে’র (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন : ‘আগামী বাজেটে রাজস্ব আহরণই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাজেটের মূল সমস্যা হলো আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং দরকারি তহবিল কিভাবে সংগ্রহ হবে তা নিশ্চিত করা। বর্তমান সক্ষমতা ও কর কাঠামো দিয়ে এনবিআরের পক্ষে এই বিশাল লক্ষ্য অর্জন করা কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত নয়। সরকারের উচিত হবে সংখ্যার পেছনে না ছুটে, এনবিআরের সংস্কার ও বাস্তবায়নযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণে গুরুত্ব দেয়া।’
এনবিআরের কৌশল : প্রযুক্তির ওপর ভরসা
বিশাল লক্ষ্যমাত্রার চাপ মাথায় নিয়ে এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, করদাতাদের করসেবা সহজ করার পাশাপাশি রাজস্ব ফাঁকি রোধে আগামী অর্থবছরে ডিজিটাল ও অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রম ব্যাপক সম্প্রসারণ করা হবে। তাদের মূল কৌশলগুলো হলো : ই-রিটার্ন ও অনলাইন পেমেন্ট : করদাতাদের সশরীরে অফিসে আসার ঝামেলা কমাতে ই-রিটার্ন দাখিল এবং অনলাইন কর পরিশোধ ব্যবস্থা আরো বাধ্যতামূলক ও জনপ্রিয় করা হবে।
আইটিনির্ভর নজরদারি : তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর অডিট ও নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে কর ফাঁকি এবং কর এড়ানোর প্রবণতা কঠোরভাবে রোধ করা। কর জাল সম্প্রসারণ : নতুন করদাতা চিহ্নিত করতে বিভিন্ন ডাটাবেজ ব্যবহার করে ডিজিটাল স্ক্রিনিং করা।
কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া কি লক্ষ্য পূরণ সম্ভব?
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, করের হার বাড়িয়ে বা বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ দিয়ে এই ১৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা যাবে না। যতক্ষণ না পর্যন্ত কর প্রশাসনের মাঠপর্যায়ে অটোমেশন নিশ্চিত হচ্ছে এবং কর জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর জন্য বড় ধরনের পলিসি সংস্কার করা হচ্ছে, ততক্ষণ ৭ লাখ কোটি টাকার এই লক্ষ্যমাত্রা কেবল কাগজের হিসাব বা ‘বাজেট ব্যালেন্স’ করার একটি আনুষ্ঠানিক হাতিয়ার হিসেবেই থেকে যাবে।



