ইসলামী ব্যাংকিং সম্প্রসারণ ও জাকাত ব্যবস্থাপনা জোরদারের দাবি

প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আলোচনা

প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে একদিনে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তবে সরকারকে ধীরে ধীরে ইসলামী ব্যাংকিং সম্প্রসারণে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসলামী অর্থায়ন ও ইসলামী ব্যাংকিং দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বাংলাদেশেও এ খাতকে আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

সংসদ প্রতিবেদক
Printed Edition

  • ইসলামী ব্যাংক কি সবার জন্য? প্রশ্ন গয়েশ্বরের
  • ইসলামী ব্যাংকে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে চাকরি করেছেন-শাহজাহান চৌধুরী
  • সরকারকে ধীরে ধীরে ইসলামী ব্যাংকিং সম্প্রসারণে ভূমিকা নিতে হবে-পার্থ

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় ইসলামী ব্যাংকিং সম্প্রসারণ, জাকাত ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং কল্যাণরাষ্ট্র গঠনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালীব রহমান পার্থ। তবে তার ইসলামী ব্যাংকিংবিষয়ক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংকে অমুসলিমদের চাকরির সুযোগ আছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সরকারি দলের সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকে ধর্মের ভিত্তিতে চাকরিতে কোনো বিধিনিষেধ রয়েছে কি না। পরে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন আন্দালীব রহমান পার্থ। বিষয়টির সংবেদনশীলতার কথা উল্লেখ করে মন্তব্য করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। পরে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীও দাঁড়িয়ে দাবি করেন, ইসলামী ব্যাংকে সব ধর্মের মানুষ চাকরি করেন এবং অতীতেও করেছেন।

গতকাল শনিবার বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের ১৬তম দিনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্যারিস্টার আন্দালীব রহমান পার্থ বলেন, এবারের বাজেট জনবান্ধব, জনকল্যাণমুখী এবং ন্যায়বিচার ও মানবিকতার প্রতিফলন। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে মালয়েশিয়া ও চীন সফরের জন্য অভিনন্দন জানিয়ে আশা প্রকাশ করেন।

বাজেটের বিভিন্ন ইতিবাচক দিক তুলে ধরে পার্থ বলেন, পারিবারিক কার্ডের আওতা বৃদ্ধি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়তা, রফতানি খাতের উন্নয়ন, স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের সহায়তা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের শুল্ক কমানো, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং ওষুধ শিল্পে প্রণোদনার মতো উদ্যোগ সরকারের জনগণমুখী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। তার ভাষায়, এই বাজেটের মূল বার্তা হলো- ‘আমরা জনগণের পাশে আছি।’ তিনি বলেন, একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র এবং জনগণের কল্যাণে নিবেদিত সরকারের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় পার্থক্য।

রাষ্ট্র পরিচালনায় ন্যায়বিচার ও মানবিকতার গুরুত্ব তুলে ধরে আন্দালিব পার্থ বলেন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা: প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের দু’টি মৌলিক ভিত্তি ছিল ন্যায়বিচার ও মানবিকতা। একটি কল্যাণরাষ্ট্রেরও একই আদর্শ অনুসরণ করা উচিত। তিনি বলেন, এতিম, নারী, অসহায় ও প্রতিবন্ধী মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করার সরকারের সদিচ্ছা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ যেন এই উদ্যোগে বরকত দান করেন এবং দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেন।

জাকাত ব্যবস্থাপনা আধুনিক ও কার্যকর করার প্রস্তাব দিয়ে পার্থ বলেন, দেশে প্রতি বছর কত জাকাত বিতরণ হয়, তার কোনো নির্ভুল পরিসংখ্যান নেই। প্রতিটি সংসদীয় আসনে জাকাত পাওয়ার উপযুক্ত মানুষের একটি জাতীয় ডাটাবেজ তৈরি করা হলে দেশ-বিদেশে অবস্থানরত দাতারা সহজেই প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে জাকাত পৌঁছে দিতে পারবেন। এ জন্য একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও মোবাইল অ্যাপ চালুর প্রস্তাব দেন তিনি। তার ভাষায়, অনেকেই জাকাত দিতে চান, কিন্তু কোথায় দেবেন তা জানেন না। সহজ প্রাপ্যতাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি জাকাত বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে একটি বিশেষায়িত টেলিভিশন চ্যানেল চালুরও প্রস্তাব দেন তিনি।

এরপর ব্যাংকিং খাতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে একদিনে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তবে সরকারকে ধীরে ধীরে ইসলামী ব্যাংকিং সম্প্রসারণে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসলামী অর্থায়ন ও ইসলামী ব্যাংকিং দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বাংলাদেশেও এ খাতকে আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

কিছু ইসলামী ব্যাংকে অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সমস্যা ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নয় বরং যারা ব্যাংক লুট করেছে তাদের মধ্যে। তার মতে, ইসলামী ব্যাংকিং সম্প্রসারণ দেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনবে এবং আল্লাহর রহমত বয়ে আনবে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অতীতের দুর্বলতার সমালোচনা করে পার্থ বলেন, আগের সরকারগুলোর সময় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতির কারণে রাজস্ব আদায় ব্যাহত হয়েছে। তখন জাতীয় উন্নয়নের পরিবর্তে পরিকল্পিত লুটপাটই ছিল মূল লক্ষ্য। তিনি দাবি করেন, বর্তমান সরকারের চার মাসের সময়ে বড় ধরনের কোনো ব্যাংক লুট বা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাংক দুর্নীতির ঘটনা ঘটেনি। তাই সরকারকে একটি কল্যাণরাষ্ট্র গড়ে তোলার সুযোগ দেয়া উচিত।

নিজ জেলা ভোলার উন্নয়নের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বিপুল প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদের কারণে ভোলাকে দেশের কৌশলগত অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা উচিত। তার দাবি, ভোলায় প্রায় ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস রয়েছে। এ সম্পদ যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে ভবিষ্যতে ভোলা বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। তিনি ভোলা বিমানবন্দর, আধুনিক হাসপাতাল, উন্নত সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রস্তাবিত ভোলা-বরিশাল সেতু দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। পাশাপাশি উন্নয়ন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা এবং দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পৃথক ভোলা উন্নয়ন কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন।

বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি বলেন, বাজেটকে দলীয় রাজনীতির দৃষ্টিতে না দেখে জাতীয় উন্নয়নের ইস্যু হিসেবে দেখা উচিত। সবাই সদিচ্ছা নিয়ে একসাথে কাজ করলে বাংলাদেশ আরো অনেক দূর এগিয়ে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

পার্থের বক্তব্যের পর আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বাজেটের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেন, এ বাজেটে সরকারের উন্নয়ন দর্শনের প্রতিফলন রয়েছে। তবে তিনি মনে করেন, দুর্নীতি দমন এবং কার্যকর বাস্তবায়নের ওপরই বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে। তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়ন, এনজিওর উচ্চ সুদের ঋণ নিয়ন্ত্রণ, স্বল্পমূল্যের বিড়ির কর পুনর্বিবেচনা, পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং মাদকবিরোধী অভিযান জোরদারের আহ্বান জানান।

নিজের বক্তব্যের একপর্যায়ে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় পার্থের ইসলামী ব্যাংকিং প্রসঙ্গ টেনে বলেন, তিনি ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন। এরপর তিনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, একসময় একজন হিন্দু ব্যক্তির জন্য একটি ইসলামী ব্যাংকে চাকরির সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু তাকে জানানো হয়েছিল, ওই ব্যক্তি হিন্দু হওয়ায় চাকরি দেয়া সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন রাখেন, যদি ইসলামী ব্যাংকে অমুসলিমরা চাকরি করতে না পারেন, তাহলে বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, মসজিদ বা মাদরাসায় ধর্মীয় বিধিনিষেধ থাকতে পারে, কিন্তু একটি ব্যাংক তো রাষ্ট্রের সবার জন্য উন্মুক্ত প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ সব ধর্মের মানুষের দেশ। তাই ইসলামিক ব্যাংক, ইসলামিক ইন্স্যুরেন্স বা ইসলামিক নামধারী অন্য প্রতিষ্ঠানে ধর্মের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য থাকা উচিত নয়। তিনি বলেন, তিনি বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করতে চান না বরং প্রয়োজন হলে পথ দেখাতেও চান। তার মতে, এই বাজেটের মধ্যে একটি দর্শন রয়েছে এবং সেই দর্শনের বাস্তবায়নই গুরুত্বপূর্ণ।

গয়েশ্বরের বক্তব্যের পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে ব্যারিস্টার আন্দালীব রহমান পার্থ বলেন, একটি সংবেদনশীল বিষয় উত্থাপিত হয়েছে এবং তার বক্তব্যের প্রসঙ্গ এসেছে। তাই ভুল বার্তা যেন না যায়, সে জন্য তিনি বিষয়টি পরিষ্কার করতে চান। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় কেন পার্থের কাছ থেকে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইছেন, সেটি তার বোধগম্য নয়। কারণ পার্থ ইসলামী ব্যাংকের কেউ নন।

জবাবে পার্থ বলেন, তিনি ইসলামী ব্যাংকিংয়ের নীতিগত বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ইসলামী ব্যাংকিং অমুসলিমদের মধ্যেও ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এমন কোনো ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা নেই। কোনো ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ যদি নিজস্ব নীতিমালা গ্রহণ করে, সে বিষয়ে তার নির্দিষ্ট ধারণা নেই। তবে তার বিশ্বাস, সাধারণ চাকরির ক্ষেত্রে যে কেউ ইসলামী ব্যাংকে কাজ করতে পারেন। তিনি আরো বলেন, পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক নীতিমালা রক্ষা করতে হয়। সে কারণে বোর্ডের ক্ষেত্রে ভিন্ন বিবেচনা থাকতে পারে। তবে সাধারণ চাকরিতে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বাধা থাকার কথা নয়। তিনি আবারো বলেন, ইসলামী ব্যাংকিং বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এবং অমুসলিমরাও এই ব্যবস্থাকে গ্রহণ করছেন।

এরপর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় পার্থকে ব্যক্তিগতভাবে রেফার করেননি। পার্থ ইসলামী ব্যাংকের বোর্ডের কেউ নন এবং ব্যাংকটির পরিচালনা সম্পর্কেও তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই। তিনি বলেন, সংসদে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সাম্প্রদায়িক স্পর্শকাতর একটি বিষয় উত্থাপিত হয়েছে। এ বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের কোনো সদস্য সংসদে উপস্থিত থাকলে তিনিই সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারতেন।

এ সময় জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বক্তব্য দেয়ার সুযোগ নিয়ে বলেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের সাথে তার দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে। তবে তিনি যে ঘটনার উল্লেখ করেছেন, সেটি কখন, কোথায় ও কোন পরিস্থিতিতে ঘটেছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দেয়া হয়নি। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ইসলামী ব্যাংকে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান- সব ধর্মাবলম্বী মানুষ চাকরি করেছেন এবং এখনো করছেন। তার নিজের নির্বাচনী এলাকাতেও বহু হিন্দু ইসলামী ব্যাংকে চাকরি করেছেন বলে তিনি সংসদে উল্লেখ করেন। গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বক্তব্যের এ অংশের সংশোধন হওয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।