বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক নারী-পুরুষ কর্মসংস্থানের আশায় বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। কিন্তু এই যাত্রা অনেকের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে পরিণত হচ্ছে দুঃস্বপ্নে। অভিযোগ রয়েছে, সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয়ের কয়েকগুণ বেশি অর্থ খরচ করে বিদেশে যেতে হচ্ছে বেশির ভাগ শ্রমিককে। ফলে বিদেশে গিয়ে কঠোর পরিশ্রম করেও অনেকে ২ থেকে ৩ বছর সময় নিচ্ছেন শুধু নিজের বিনিয়োগ করা পুঁজি ফেরত তুলতে। এর মধ্যে আবার অনেকেই নানা প্রতারণা ও জটিলতায় পড়ে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিদেশগামী শ্রমিকদের বড় একটি অংশ দালালচক্রের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে বিদেশে যাচ্ছেন। বিদেশে যাওয়ার পরও তাদের অনেকেই পড়ছেন আকামা বা ভিসা জটিলতা, নবায়ন সমস্যা, চুক্তি অনুযায়ী কাজ ও বেতন না পাওয়া, এমনকি আইনি ঝামেলার মতো নানা সঙ্কটে। এসব জটিলতা সামাল দিতে না পেরে অনেক শ্রমিক ‘কারণে-অকারণে’ স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়ে কারাগারেও যাচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব ক্ষেত্রে প্রবাসী বাংলাদেশীদের অনেকেই প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাচ্ছেন না দূতাবাস থেকে, ফলে তাদের কারাগারের ভেতরে মানবেতর জীবন কাটাতে হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত (দুবাই), জর্ডান ছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং ইউরোপের ইতালিসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমানো কর্মীদের বড় অংশই অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের শিকার হচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অতিরিক্ত ব্যয়ের পেছনে বড় কারণ হচ্ছে সিন্ডিকেট এবং দালালনির্ভর নিয়োগ প্রক্রিয়া।
অভিবাসন খাতের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা জানান, বিদেশে কর্মী পাঠাতে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সরাসরি সুযোগ সীমিত। ফলে দালালদের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, যা শেষ পর্যন্ত বাড়তি ব্যয়ের বোঝা চাপাচ্ছে শ্রমিকদের ওপর। এই পরিস্থিতিতে বিদেশে গিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেও অনেকে তাদের বিনিয়োগের টাকা তুলতে পারছেন না, যা তাদের মধ্যে হতাশা বাড়াচ্ছে।
ভুক্তভোগী শ্রমিক ও অভিবাসন সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিবেশী দেশ নেপাল, শ্রীলঙ্কা কিংবা ফিলিপাইন থেকে যে খরচে একজন কর্মী বিদেশে যেতে পারেন, একই দেশে যেতে বাংলাদেশী শ্রমিকদের কয়েকগুণ বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে। এ বৈষম্য নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলেও কার্যকর সমাধান দেখা যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, সিন্ডিকেটমুক্ত এবং স্বল্প ব্যয়ে কর্মী পাঠানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের মাধ্যমে যেসব শ্রমিক বিদেশে যাচ্ছেন, তাদের প্রকৃত ব্যয় কত হচ্ছে তা কঠোরভাবে মনিটরিং করা প্রয়োজন। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত খরচের চেয়ে বহু গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করেও শ্রমিকরা বিদেশে যাচ্ছেন।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং বায়রা সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সরকার বিভিন্ন দেশের জন্য নির্দিষ্ট অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করে দিয়েছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য এবং মালয়েশিয়ায় যেতে নির্ধারিত ব্যয় দেড় লাখ টাকার বেশি নয়। অথচ বাস্তবে এসব দেশে যেতে শ্রমিকদের চার থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। কুয়েতে যেতে লাগছে প্রায় ৯ লাখ টাকা। মালয়েশিয়ায় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে যেতে সর্বোচ্চ ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত লেগেছে। অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে একপর্যায়ে মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয়া বন্ধও করে দেয়।
অন্য দিকে, সিঙ্গাপুরে যেতে একজন শ্রমিককে প্রায় ১৪ লাখ টাকা, জাপানে যেতে কমপক্ষে ১২ লাখ টাকা এবং ইতালিতে যেতে ১৭ থেকে ১৮ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। এই বিপুল অর্থের জোগান দিতে অনেকেই ঋণ নিচ্ছেন, জমি বিক্রি করছেন বা ধারদেনা করছেন। কিন্তু বিদেশে গিয়ে প্রতারণার শিকার হলে সেই ঋণের বোঝা তাদের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী সঙ্কট তৈরি করছে।
এ দিকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রতিদিনই সৌদি আরব, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতারিত হয়ে খালি হাতে দেশে ফিরছেন অনেক শ্রমিক। দেশে ফিরেই কেউ ক্ষোভে পাসপোর্ট ছিড়ে ফেলছেন, কেউ আবার বিদেশে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তাদের অভিযোগ- বিদেশে গিয়ে প্রত্যাশিত কাজ পাননি, বেতন পাননি, এমনকি আইনি সহায়তাও পাননি।
সৌদি আরব থেকে সম্প্রতি দেশে ফেরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক শ্রমিক বলেন, “পাঁচ লাখ ৩০ হাজার টাকা খরচ করে গিয়েছিলাম। দালাল একমাস রাখার পর আকামা না দিয়ে রাস্তায় ছেড়ে দেয়। পাঁচ মাস ঘুরে কাজ করেছি, কিন্তু এক টাকাও বাড়িতে পাঠাতে পারিনি। পরে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে জেল খেটে দেশে ফিরেছি।”
মালয়েশিয়া থেকে ফেরত আসা এক যুবক জানান, দালালের মাধ্যমে বিদেশে গিয়ে নানা জটিলতায় পড়ে অবশেষে ট্রাভেল পাসে দেশে ফিরতে হয়েছে তাকে।
ফেরত আসা শ্রমিকদের অনেকে জানান, ৫-৬ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে গিয়েও ২-৩ বছর কাজ করে পুঁজি তুলতে পারছেন না। এর মধ্যে অনেকেই নানা সমস্যায় পড়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন। তাদের মতে, সরকারের উচিত স্বল্প ব্যয়ে বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং দালালচক্র নির্মূল করা।
অভিবাসন খাতের একাধিক ব্যবসায়ীও একই মত পোষণ করেছেন। তাদের ভাষ্য, শ্রমবাজার ধ্বংস করছে দু’টি প্রধান শক্তি-সিন্ডিকেট এবং গ্রামভিত্তিক দালালচক্র। এই দুই পক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে অভিবাসন ব্যয় কমানো সম্ভব নয়।
বিদেশে অবস্থানরত এক অভিবাসন ব্যবসায়ী জানান, নেপাল থেকে এখনো স্বল্প খরচে মালয়েশিয়ায় কর্মী যাচ্ছে, অথচ বাংলাদেশ থেকে একই দেশে যেতে কয়েকগুণ বেশি ব্যয় হচ্ছে। তিনি বলেন, “এই বৈষম্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের দাবি, নতুন সরকারের উচিত দালালনির্ভরতা কমিয়ে স্বচ্ছ ও সমন্বিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর ব্যবস্থা করা। অন্যথায় এই খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো কঠিন হবে।
অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের একটি অংশ দুই দেশের কিছু অসাধু কর্মকর্তার মধ্যেও বণ্টিত হয়। যদিও এ বিষয়ে নির্দিষ্টভাবে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না, তবে সংশ্লিষ্ট মহলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিবাসন ব্যয় কমানো, দালালচক্র নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং বিদেশে প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা জোরদার করা না গেলে এই সঙ্কট আরো গভীর হবে। আর এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে দেশের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষকেই।


