অশ্রুসজল বিদায় মডরিচের সান্ত্বনা রোনালদোর

Printed Edition
রিয়াল মাদ্রিদে ৬ বছর একসাথে খেলার পর এবার বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষ হিসেবে মডরিচের বিদায়ে রোনালদোর সান্ত্বনা  : ইন্টারনেট
রিয়াল মাদ্রিদে ৬ বছর একসাথে খেলার পর এবার বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষ হিসেবে মডরিচের বিদায়ে রোনালদোর সান্ত্বনা : ইন্টারনেট

ক্রীড়া প্রতিবেদক

টরন্টোর বিএমও ফিল্ডে তখন শেষ বাঁশি বেজে গেছে। দুই হাঁটুতে হাত রেখে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। ভিএআরের সিদ্ধান্তে শেষ মুহূর্তের সমতাসূচক গোল বাতিল হওয়ার পর কান্নায় ভেঙে পড়েছেন ক্রোয়েশিয়ার অধিনায়ক লুকা মডরিচ। কয়েক সেকেন্ড আগেও ক্ষীণ এক আশার আলো ছিল লুকা মডরিচের। বিশ্বকাপের মঞ্চে সম্ভাব্য শেষ ম্যাচের এমন নির্মম বিদায় কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না ৪০ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি। নিশ্চিত হয়ে যায় এক অনিবার্য সত্য-বিশ্বকাপের মঞ্চে শেষ হয়ে গেল আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডারের অধ্যায়! সেই সময়ই নিজের দলের উদযাপন ছেড়ে পুরনো বন্ধুর দিকে এগিয়ে যান ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। দীর্ঘদিনের সতীর্থকে জড়িয়ে ধরে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলতে দেখা যায় পর্তুগিজ অধিনায়ককে।

টরন্টোয় পর্তুগালের বিপক্ষে ২-১ গোলের নাটকীয় হারে বিদায় নেয় ক্রোয়েশিয়া। একই ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিলেন দুই কিংবদন্তি-লুকা মডরিচ ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। তবে একজনের যাত্রা চলতে থাকলেও অন্যজনের বিশ্বকাপের স্বপ্ন থেমে গেল আবেগঘন এক সন্ধ্যায়! ৪০ বছর বয়সেও মডরিচ দেখিয়ে দিলেন, বয়স কেবল একটি সংখ্যা। পুরো ম্যাচে ৬৬ বার বল স্পর্শ করেছেন, সফল করেছেন তিনটি ট্যাকেল এবং দ্বিতীয়ার্ধে প্রতিপক্ষের অর্ধে পাঠিয়েছেন দুটি বিপজ্জনক ক্রস। মাঝমাঠে বলের গতি নিয়ন্ত্রণ, খেলার ছন্দ বদলে দেয়া কিংবা সতীর্থদের এগিয়ে নেয়ার দায়িত্ব- সবই পালন করেছেন নিজের স্বাভাবিক দক্ষতায়। কিন্তু ব্যক্তিগত নৈপুণ্য দলকে আরেকটি বিশ্বকাপ ম্যাচ উপহার দিতে পারেননি।

ম্যাচ শেষে সাবেক রিয়াল মাদ্রিদ সতীর্থকে জড়িয়ে ধরেন রোনালদো। মাথায় হাত রেখে সান্ত¡না দেন, পরে আবার আলিঙ্গনে বিদায় জানান। দীর্ঘদিনের সতীর্থকে নিয়ে পর্তুগাল অধিনায়ক বলেন, ‘আমি লুকার সাথে অনেক বছর খেলেছি। ও ফুটবল ইতিহাসের কিংবদন্তি, এখনো। আমি তাকে বহুবার এ কথা বলেছি। সব কিছুর জন্য তোমাকে অভিনন্দন। তোমার ক্যারিয়ারের আগামী বছরগুলোর জন্য আমার অনেক অনেক শুভকামনা রইল।’

মডরিচের বিশ্বকাপ অধ্যায় সত্যিই শেষ কি না, সে প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারেননি ক্রোয়েশিয়া কোচ জ্বলাতকো দালিচও। তার কথায়, হয়তো এটিই মডরিচের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। তবে তিনি যোগ করেন, কেবল ঈশ্বরই জানেন আগামী চার বছরে কী হবে। দেশে ফিরে এ বিষয়ে মডরিচের সাথে আলোচনা করবেন বলেও জানান তিনি। তবে দালিচের কণ্ঠে সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে আক্ষেপ। তার মতে, মডরিচ আবারো দলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ছিলেন। এমন সমাপ্তি তিনি প্রাপ্য ছিলেন না। শেষ ম্যাচেও অধিনায়ক নিজের দৃঢ়তা, নেতৃত্ব ও সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন।

বিশ্বকাপে মডরিচের অবদান পরিসংখ্যান দিয়ে পুরোপুরি বোঝানো কঠিন। তার নেতৃত্বেই ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে ক্রোয়েশিয়া। সেই আসরে জিতে নেন ব্যালন ডি’অর। ২০২২ সালে দলকে এনে দেন তৃতীয় স্থান। এবারের আসর ছিল তার পঞ্চম বিশ্বকাপ, যেখানে চারটি ম্যাচেই শুরু থেকে খেলেছেন তিনি। ক্লাব ফুটবলেও মডরিচের ক্যারিয়ার সমান উজ্জ্বল। ডায়নামো জাগরেব, টটেনহাম হটস্পার, রিয়াল মাদ্রিদ এবং সর্বশেষ এসি মিলানে খেলেছেন। ২৩ মৌসুমের পেশাদার ক্যারিয়ারে জিতেছেন ছয়টি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, চারটি লা লিগাসহ অসংখ্য শিরোপা। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় পরিচয় শিরোপায় নয়, বরং মাঠে খেলার সৌন্দর্যকে আরো নিখুঁত করে তোলা।

মডরিচের সেই গুণের প্রশংসা করেছেন প্রতিপক্ষ কোচ রবার্তো মার্তিনেজও, ‘আপনি এমন একজন খেলোয়াড়ের কথা বলছেন, যে লম্বা ক্যারিয়ার পার করেছে এবং এখনো চিন্তা করার ক্ষমতা সম্পন্ন একজন তরুণের মতো খেলে। এমন খেলোয়াড়ের কথা খুব কমই বলা হয়, যে বল পায়ে রেখেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আমার মনে হয়, মডরিচ এর একটি চমৎকার উদাহরণ। খেলার গতিপ্রকৃতির ওপর নির্ভর করে সে নিজের ছন্দ খুঁজে নেয় এবং সঠিক সিদ্ধান্তটি নেয়।

মদরিচের বিশ্বকাপ যাত্রা হয়তো এখানেই শেষ। কিন্তু বিশ্ব ফুটবলে তার রেখে যাওয়া ছাপ, মাঝমাঠে তার শিল্পীর মতো খেলা, নেতৃত্বের অনন্য উদাহরণ এবং একটি ছোট দেশকে বিশ্ব ফুটবলের শক্তিতে পরিণত করার গল্প কখনো শেষ হবে না। টরেন্টোর সেই শেষ বাঁশি তাই শুধু একটি ম্যাচের সমাপ্তি নয়, ফুটবলের এক স্বর্ণালি অধ্যায়ের পর্দা নামার মুহূর্তও!

রোনালদো জানান, সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর সেই সোনালি দিনের সঙ্গীকে সান্ত¡না দিতেই তিনি ছুটে গিয়েছিলেন। ম্যাচ শেষে গণমাধ্যমে তিনি বলেন, আমাদের বয়সও প্রায় কাছাকাছি। এই বয়সেও সে যেভাবে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফুটবল খেলছে, সেটা সত্যিই অসাধারণ। সে ফুটবল ইতিহাসের একজন জীবন্ত কিংবদন্তি। আমি তাকে জড়িয়ে ধরে শুধু বলেছি, তুমি ক্যারিয়ারে যা অর্জন করেছ, তার জন্য অভিনন্দন। তোমার সাথে আবার দেখা হওয়াটা আমার জন্য আনন্দের। বন্ধু, তোমার আগামী দিনগুলোর জন্য অনেক শুভকামনা।

২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে ছয় বছর একসঙ্গে খেলেছেন রোনালদো ও মডরিচ। এই সময়ে চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপাসসহ লা লিগা ও কোপা দেল রের একাধিক ট্রফি জিতেছেন তারা। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সফল জুটির একজন ছিলেন এই দুই তারকা। কিন্তু টরন্টোর রাতে বিশ্বকাপের নির্মম বাস্তবতায় দু’জনের পথ আলাদা হয়ে গেল। একজনের স্বপ্ন বেঁচে রইল, অন্যজনের শেষ হলো চোখের জলে।