দালালের খপ্পরে পড়েই বিদেশে যাচ্ছে শিক্ষিত যুবকরা

বৈধ পথে সরাসরি ইউরোপের দেশ ইতালি, অস্ট্রেলিয়াসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও দেশের একশ্রেণীর শিক্ষিত তরুণরাই বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে অবৈধ পথকেই বেছে নিতে পছন্দ করছেন, যাদের বেশির ভাগের শেষ পরিণতি হচ্ছে হয় উত্তাল সাগরে ডুবে মরা নতুবা কিডন্যাপারের হাতে জিম্মি হয়ে ওই সব দেশের ডিটেনশন ক্যাম্প/কারাগারে ধুঁকে ধুঁকে শেষ হওয়া। সাথে বাবা-মায়ের শেষ সম্বল জমিজমা বিক্রি আর জমানো টাকাগুলো খোয়ানো। এই ভয়ানক পথ থেকে তরুণদের ফেরাতে হলে সামাজিক সচেতনতা ঘরে ঘরে বাড়াতে হবে বলে মনে করেন অভিবাসন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

মনির হোসেন
Printed Edition

  • সাগরে ডুবে মরছে, অনেকের ঠাঁই হচ্ছে কারাগারে
  • সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

বৈধ পথে সরাসরি ইউরোপের দেশ ইতালি, অস্ট্রেলিয়াসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও দেশের একশ্রেণীর শিক্ষিত তরুণরাই বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে অবৈধ পথকেই বেছে নিতে পছন্দ করছেন, যাদের বেশির ভাগের শেষ পরিণতি হচ্ছে হয় উত্তাল সাগরে ডুবে মরা নতুবা কিডন্যাপারের হাতে জিম্মি হয়ে ওই সব দেশের ডিটেনশন ক্যাম্প/কারাগারে ধুঁকে ধুঁকে শেষ হওয়া। সাথে বাবা-মায়ের শেষ সম্বল জমিজমা বিক্রি আর জমানো টাকাগুলো খোয়ানো। এই ভয়ানক পথ থেকে তরুণদের ফেরাতে হলে সামাজিক সচেতনতা ঘরে ঘরে বাড়াতে হবে বলে মনে করেন অভিবাসন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

সর্বশেষ গত শনিবার পশ্চিম আফ্রিকার দেশ লিবিয়ার সীমান্তে সাগরপথে ইতালি যাওয়ার সময় উত্তাল ঢেউয়ে ট্রলার উল্টে অর্ধশত অভিবাসী ডুবে যায়।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, লিবিয়া থেকে ইউরোপ যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে তীব্র খাদ্য ও পানিসঙ্কটে ২২ অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকেই বাংলাদেশী বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গত শনিবার গ্রিক কোস্টগার্ড ২১ জন বাংলাদেশীসহ মোট ২৬ জনকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করেছে। উদ্ধারকৃতরা জানান, প্রচণ্ড শীতে ও খাবার না পেয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের লাশ পাচারকারীদের নির্দেশে সাগরে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছিল। এমন অমানবিক ঘটনা শুধু শনিবারই ঘটেছে তা কিন্তু নয়, হরহামেশাই ঘটছে ইতালিগামী ভূমধ্যসাগরে। ট্রলার-ডুবির ঘটনা যেমন ঘটছে তেমনি কোস্টগার্ড সদস্যরা প্রায়ই সাগর থেকে অভিবাসীদের জীবিতও উদ্ধার করছেন।

লিবিয়ার ত্রিপোলির বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে সাগরপথে বাংলাদেশীদের ইতালি না যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে প্রতিবেদন দেয়া এবং নানাভাবে জানানোর পরও দেশের একশ্র্রেণীর শিক্ষিত বেকার তরুণরা সেসব পরামর্শ কোনোভাবেই আমলে নিচ্ছে না। যার পরিণতি হচ্ছে তাদের সাগরে ডুবে মরা নয়তো লিবিয়ার ডিটেনশন সেন্টারে জিম্মি থাকা।

শিক্ষিত এবং কখনো অশিক্ষিত তরুণরাই মৃত্যুসহ নানা ঝুঁকি জেনেও কেন বিদেশমুখী হচ্ছে- এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট ও অভিবাসন বিশ্লেষকরা একেকজন এককভাবে মন্তব্য করছেন।

গতকাল রোববার ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রত্যক্ষদর্শীরা পরিচয় না জানিয়ে নয়া দিগন্তকে বলছেন, প্রতিদিন ট্যুরিস্ট ভিসার নামে কিছু মানুষ মালয়েশিয়া, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, সৌদি আরব ছাড়াও ইউরোপের দেশ ইতালির উদ্দেশে দুবাই হয়ে লিবিয়ার বেনগাজি যাচ্ছেন। বিমানবন্দরে এসব যুবকের চালচলন কথাবার্তা দেখে মনে হয়, এরা মোটামুটি শিক্ষিত পরিবার থেকেই এসেছে। এর মধ্যে কিছু থাকে সামান্য পড়াশোনা জানা। মূলত এরা সবাই বিদেশে থাকা তাদের আত্মীয়-স্বজনের ট্রাপে পড়েই অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বলে তাদের সাথে কথা বলে জানতে পারি। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, তারা দালালের প্ররোচনায় পড়েই অবৈধভাবে বিদেশে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে দেখছি, আমাদের এয়ারপোর্টে কর্তব্যরত ইমিগ্রেশন পুলিশেরও কিছু গাফিলতি আছে। তারা যদি একটু কঠোর হতেন তাহলে তরুণদের অবৈধ পথে বিদেশ যাত্রা কমে আসত। ইদানীং ইমিগ্রেশন কঠোর হচ্ছে, তবে সেটি ইমিগ্রেশন কাউন্টারগুলোতে নয়, আইএনএস গেট এলাকায়। অর্থাৎ উড়োজাহাজে ওঠার আগ মুহূর্তে। ওই সময় তারা সন্দেহজনক যাত্রীকে অফলোড করছেন।

গতকাল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী বলেন, যেসব শিক্ষিত তরুণ মৃত্যুঝুঁকি জেনেও ইউরোপ বা অন্যান্য দেশের পথে অবৈধভাবে পা বাড়াচ্ছে সেটি কোনোভাবে কাম্য নয়।

তিনি বলেন, তারা যদি অবৈধ পথে না গিয়ে বৈধ পথে বিদেশে যেত তাহলে তাদেরকে অকারণে সমুদ্রপথে ডুবে মরতে হতো না। এখন তো ইউরোপের অনেক দেশেই বৈধভাবে লোক যেতে পারে। তারা যদি টেকনিক্যালি কাজ জেনে বিদেশে যেত তাহলে ঝুঁকি ছাড়াই তারা লাখ লাখ টাকা কামাই করে পরিবারকে সচ্ছল করার সুযোগ ছিল। এখন একজন কর্মীকে জাপানে ভাষা শিখে যেতে সময় লাগে ৯ মাস। এর ফলে ওই কর্মী দেড় থেকে দুই হাজার ডলার কামাই করতে পারে। এখন সেই পথ বাদ দিয়ে তারা অবৈধ পথে গেলে পরিবারের ক্ষতি নয়, তাদের কারণে দেশের সম্মানও নষ্ট হচ্ছে। আবার অবৈধ লোক যাওয়ার কারণে ওই দেশগুলোতে আমাদের বৈধ শ্রমবাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এই অবৈধ পথ থেকে তাদের ফেরাতে হলে সরকারের তরফ থেকে করণীয় কী হতে পারে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শুধু সরকার কেন, আমাদের সবারই এ বিষয়ে করণীয় আছে। আমাদের মানসিক চিন্তা পরিবর্তনের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতাও রয়েছে। যাদের সন্তান এভাবে বিদেশে যাচ্ছে তাদের বাবা-মাকে বলতে হবে, এই অবৈধ পথে আপনার সন্তানকে বিদেশে পাঠালে তাদের জীবন হুমকিতে পড়বে।

অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আসলে ইউরোপের দেশ ইতালিতে সাগরপথে যারা যাচ্ছে তারা কিন্তু চিহ্নিত কয়েকটি এলাকার মানুষ। কোন এলাকা সেটি সবাই জানে। ওই সব জেলার কিছু মানুষ ঝুঁকি নিয়ে আগে পৌঁছে যাওয়ায় এখন তারাই বিদেশে থেকে আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে শিক্ষিত বেকার তরুণদের খুঁজে ওই পথে যেতে উৎসাহ দেখাচ্ছে। তাই এদের উৎসাহ কোন কোন দালাল দিচ্ছে আগে তাদের চিহ্নিত করতে হবে। আর এদের শনাক্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও জনশক্তি ব্যবসায়ীদেরও দায়িত্ব রয়েছে। এর জন্য বেশি বেশি প্রচারণার দরকার আছে।