টিআইবির নিন্দা ও উদ্বেগ

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পাল্টাপ্রশ্ন ‘শ্যুট দ্য মেসেঞ্জার’ প্রবণতা

দ্বৈত নাগরিকত্বধারী পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর নিয়োগ অসাংবিধানিক : ড. ইফতেখার

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

টেকনোক্র্যাট কোটায় দ্বৈত নাগরিকত্বধারীর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ সংবিধানসম্মত নয়। এ বিষয়ে স্বচ্ছতার সাথে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা না করে পদ গ্রহণও প্রশ্নবিদ্ধ। অথচ জনস্বার্থে পেশাগত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে সংবাদকর্মীরা যখন এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করেছেন, প্রতিমন্ত্রী তার সরাসরি উত্তর না দিয়ে পাল্টাপ্রশ্ন করেছেন। সংশ্লিষ্ট তথ্য জানতে চাওয়াকে তিনি যেভাবে ক্ষোভ ও বিদ্বেষমূলকভাবে চ্যালেঞ্জ করেছেন, তাকে পতিত কর্তৃত্ববাদী আমলের মতো ‘শুট দ্য মেসেঞ্জার’ চর্চার দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করে নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। একই সাথে মুক্ত গণমাধ্যম, স্বাধীন সাংবাদিকতা, বাক-স্বাধীনতা ও জনগণের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার খর্ব করার এমন আত্মঘাতী প্রয়াস পরিহারের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির স্বার্থে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর নিয়োগকে কেন্দ্র করে চলমান বিতর্কের মূল বিষয়-দ্বৈত নাগরিকত্ব সম্পর্কে নিজের অবস্থান সুস্পষ্ট করারও আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বিদেশী নাগরিকত্ব রয়েছে, এমনকি সংশ্লিষ্ট দেশের সক্রিয় রাজনীতির সাথে তার সম্পৃক্ততার তথ্য বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রকাশিত হয়েছে। বিষয়টি উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, টেকনোক্র্যাট কোটায় দ্বৈত নাগরিকত্বধারীর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ অসাংবিধানিক। সংবিধানের ৫৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্য নন-এমন ব্যক্তিকে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের ক্ষেত্রে তাকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হতে হবে। অন্য দিকে ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জনকারী বা সেই রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকারকারী ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্য। একই সাথে ৬৬(২ক) অনুচ্ছেদে দ্বৈত নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে বিদেশী নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টিও সুস্পষ্ট। ফলে দ্বৈত নাগরিকত্ব বহাল থাকা অবস্থায় টেকনোক্র্যাট কোটায় তার নিয়োগ সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। এ বিষয়ে স্বচ্ছতার সাথে নিজের অবস্থান প্রকাশ না করে প্রতিমন্ত্রীর পদ গ্রহণের মাধ্যমে তিনি নিজেকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। অথচ বিষয়টি সম্পর্কে সঠিক তথ্য জনস্বার্থে প্রকাশের লক্ষ্যে সংবাদকর্মীরা যখন সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করেছেন, তখন প্রতিমন্ত্রী তার সরাসরি উত্তর দেননি। বরং তিনি ‘কে নিউজ করছে’ এবং ‘কার এত জ্বালা’ বলে পাল্টা প্রশ্ন করেছেন। যা পতিত কর্তৃত্ববাদী আমলের ‘শুট দ্য মেসেঞ্জার’ চর্চারই প্রতিফলন। সংবাদটিকে করেছে বা কে প্রশ্ন তুলেছে, তা এখানে মূল বিষয় নয়। মূল প্রশ্ন হলো, প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় তার বিদেশী নাগরিকত্ব বহাল ছিল কি না। এমন একটি সুস্পষ্ট সাংবিধানিক ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেয়া তার দায়িত্ব।

টিআইবির ড. জামান বলেন, রক্তক্ষয়ী জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জবাবদিহিমূলক সুশাসনের প্রত্যাশায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এ ধরনের বিষয়ে প্রশ্ন করার এবং জনগণের তথ্য জানার অধিকার আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায়সহ বিভিন্ন অবস্থান থেকেও স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার বার বার ব্যক্ত করা হয়েছে। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় পদে থাকা কোনো ব্যক্তি তথ্যভিত্তিক ও সরাসরি জবাব দেবেন- এমনটাই প্রত্যাশিত। সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক ও আইনগত প্রশ্নের উত্তর এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণ প্রকাশের মাধ্যমে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বরং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারতেন। তা না করে তার দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে প্রতিবেদনকারী গণমাধ্যম ও প্রশ্ন উত্থাপনকারী সংবাদকর্মীদের প্রতি ক্ষোভ ও বিদ্বেষমূলক পাল্টা প্রশ্ন একজন প্রতিমন্ত্রীর জন্য শোভনীয় নয়; বরং অনৈতিক ও উদ্বেগজনক। বিষয়টি সরকারের জন্যও বিব্রতকর। এমন প্রতিক্রিয়া মুক্ত গণমাধ্যম, বাক-স্বাধীনতা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী। একজন দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় পদধারীর কাছ থেকে বৈধ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রশ্নের জবাবে এ ধরনের আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া শুধু সংশ্লিষ্ট সংবাদকর্মীদের ওপর অযৌক্তিক ও অযাচিত চাপ সৃষ্টি করে না, স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্যও হুমকিস্বরূপ। এতে ক্ষমতাসীন বা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের অস্বস্তিকর বিষয়ে প্রশ্ন করাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। সংবাদকর্মীদের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা ‘চিলিং ইফেক্ট’ সৃষ্টির আশঙ্কাও বাড়ে। সর্বোপরি এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনগণের তথ্য জানার অধিকার।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘বিষয়টি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রীয় পদকে কেন্দ্র করে। তাই এর আন্তর্জাতিক মাত্রা এবং বাংলাদেশের জন্য অনাকাক্সিক্ষত ও বিব্রতকর বিতর্কের ঝুঁকিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এ পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে অবিলম্বে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সঠিক ও প্রামাণ্য তথ্য প্রকাশ ও তার নিয়োগের সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্নে যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরি। সাংবিধানিক ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে প্রশ্নকারী সংবাদমাধ্যমকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করা মুক্ত গণমাধ্যম ও জনগণের তথ্য জানার অধিকার খর্ব করার সামিল।’

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সরকারের অন্য কোনো মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা সমমর্যাদার দায়িত্বশীল ব্যক্তির দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্ন থাকলে, স্বচ্ছতা ও সাংবিধানিক জবাবদিহির স্বার্থে তাদের ক্ষেত্রেও একইভাবে অবস্থান ও প্রামাণ্য তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।

ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ছেড়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, শপথে আইনি ব্যত্যয় ঘটেনি : আইনমন্ত্রী

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির তার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন এবং তার শপথ গ্রহণে কোনো আইনি ব্যত্যয় ঘটেনি বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান। তিনি জানান, সরকার সংবিধান মেনেই সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। সংবিধানের আওতায় ‘ডিমিং ক্লজ’ (ধরে নেয়া নীতি) অনুযায়ী টেকনোক্র্যাট কোটায় শপথ গ্রহণের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনি শর্ত কার্যকর ধরা হয়েছে। মঙ্গলবার সচিবালয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

তবে আইনি বিশ্লেষকদের মতে, সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বিদেশী নাগরিকত্ব অর্জন বা আনুগত্য স্বীকার করলে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য হন। আর ৫৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মন্ত্রীদের ক্ষেত্রেও সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেক্ষেত্রে দাফতরিক প্রমাণের বাইরে কেবল ‘ডিমিং ক্লজ’-এর ধারণায় এই বাধ্যবাধকতা অতিক্রান্ত হয় কি না, তা নিয়ে আদালতের ব্যাখ্যার সুযোগ থেকে যায়।

অনুষ্ঠানে মানবাধিকার প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মিথ্যা মামলা, গুম ও ক্রসফায়ারের সংস্কৃতি বন্ধ করে সরকার আইনের শাসন নিশ্চিত করতে কাজ করছে। নতুন সরকার গঠনের পর পুলিশ বাদি হয়ে কোনো মিথ্যা মামলা দায়ের করেনি বলেও তার দাবি। তিনি আরো জানান, অসচ্ছল মানুষদের আইনি সাহায্য দিতে সরকারি সেবা প্রসারিত করা হচ্ছে।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা

অনুষ্ঠানে আইনি সহায়তা, সামাজিক সুরক্ষা, নারী-শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ‘বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদফতর’, ‘সমাজসেবা অধিদফতর’ এবং ‘মহিলা বিষয়ক অধিদফতর’-এর মধ্যে এই চুক্তি সই হয়।

এই চুক্তির আওতায় সমন্বিত রেফারেল ও কেস ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। এর মাধ্যমে কোনো সেবাগ্রহীতার প্রয়োজনীয় সুবিধা একটি প্রতিষ্ঠানে না থাকলে তাকে অন্য প্রতিষ্ঠানে রেফার করা হবে এবং পরবর্তীতে তার অগ্রগতি তদারকি করা হবে। বিশেষ করে নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই সেবা পাবেন।

এ ছাড়া জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করতে জাতীয় আইনি সহায়তা অধিদফতরের ১৬৬৯৯, সমাজসেবা অধিদফতরের ১০৯৮ এবং মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের ১০৯ হেল্পলাইনের মধ্যে আন্তঃসংযোগ গড়ে তোলা হবে। চুক্তিটি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ‘ত্রিপক্ষীয় স্টিয়ারিং কমিটি’ এবং জেলা পর্যায়ে ‘জেলা সমন্বয় কমিটি’ কাজ করবে।